হুজুরের কাছে কি বেশি নিতে পারে? মাত্র শতকরা চল্লিশ টাকা।
কিন্তু আইনে যে মাত্র বারো টাকা বলে।
এবারে সরকার এমন একটি স্মিতহাস বিকশিত করে, যার ভাষ্য করতে গেলে মহাভারত লিখতে হয়। সে হাসিতে একসঙ্গে আইনের প্রতি আনুগত্য ও অবিশ্বাস; কোম্পানির প্রতি অশ্রদ্ধা ও হুজুরের প্রতি নির্ভরশীলতা, হুজুরের কল্যাণ ও পাওনাদারের আসন্ন তাগিদের স্মৃতি প্রকাশিত হয়।
তবে হুজুর চক্রবর্তীকে ডেকে পাঠাই?
সুদূর মাতৃভূমিব দুর্লভ স্মৃতি মনের মধ্যে একবার চেখে নিয়ে প্রচণ্ড একটা দীর্ঘনিশ্বাস চেপে হুজুর বলে—আচ্ছা তাই হক।
আব দা, ব্রাণ্ডি!
গ্রীষ্মের দুপুরে নির্জলা ব্রাণ্ডিতে লিভার পাকে পাকুক, তমসুক পেকে না উঠলেই আপাতত হুজুর খুশি।
হুজুর!
বড়সাহেব মনে মনে ভাবে, বন্দী। মোটের উপর–ঋণে, রক্ষিতায়, জারজ সন্তানে, দুরারোগ্য ব্যাধি ও অকালমৃত্যুতে বিজিত কলকাতা বিজয়ী মিঃ জনকে সম্পূর্ণ কবলিত করে ফেলেছিল। ক্লাইভ-বর্ণিত শয়তানের শহরের এই হচ্ছে প্রকৃত রূপ। তেমন করে খুঁটিয়ে দেখলে দেখা যাবে যে, শয়তানও একবারে কৃপার অযোগ্য নয়।
২.০১-৫ আগুনের ফুলকি
বজরা ভেসে চলে, দুদিকের তীরে তীরে নূতন নূতন দৃশ্য উদঘাটিত হয়—সকাল বিকাল মধ্যাহ্ন। রাত্রি আসে আকাশের তারা আর পৃথিবীর দীপ সাজিয়ে; মাঠে মাঠে। বেজে ওঠে শিবাধ্বনি, কখনও বা বাঘের গর্জন।
দুখানা বজরা ভাগীরথী বয়ে উজানে ভেসে চলে, সঙ্গে ছোট আর একখানা পানসি। বজরা দুখানার মধ্যে একখানা বড়, একখানা ছোট। বড়খানায় সপরিবারে কেরী। ছোটখানায় রাম বসু, পার্বতী ব্রাহ্মণ, জন দুই খানসামা, বাবুর্চি; ঘোট পানসিখানায় রসুই হয়, খাদ্য ও পানীয় জল থাকে। রাম বসু ও পার্বতীর রান্নার ব্যবস্থা স্বতন্ত্র; বজরার। এক কামরায় পার্বতীচরণ রাঁধে, দুজনে খায়। রাম বসুর হাতের অন্ন পার্বতী খাবে না। জর্জ উডনী খরচের কার্পণ্য করে নি, সপরিবার কেরীর সুখস্বাচ্ছন্দ্য বিধানের জন্য যথাসাধ্য করেছে; কৃতজ্ঞ কেরী বলে যথাসাধ্যের বেশি; সে বলে, এত করবার না ছিল প্রয়োজন, ছিল তার নিজের সাধ্য।
সকাল বেলায় ব্রেকফাস্টের পবে রাম বসু আসে কেরীর বজরায়, সুসজ্জিত কামরায় দুজনে বসে বাইবেল তরজমার তোড়জোড় করে। বাইবেলের নিগুঢ় রহস্য কেরী কর্তৃক বিবৃত হয, মন দিয়ে শোনে রাম বসু। পাশের কামরায় অর্ধোম্মাদ কেরী-পত্নী আপন মনে বকে চলে; তার পবের কামরায় আয়া সুর করে ছড়া আউড়ে ঘুম পাড়াতে চেষ্টা করে জ্যাভেজকে,-ফেলিক্স আর পিটাব ছাদের উপরে বসে থাকে, না হয় তাদের কৌতূহলের অন্ত, না হয় তাদের তৃপ্তি।
কেরী বলে, মুন্সী, কাজ করবার এমন অবাধ ক্ষেত্র আমাদের দেশে নেই। সেখানে গদ্য পদ্য দুটোই সমৃদ্ধ, নৃতন কিছু করা কঠিন। তোমাদের দেশে সুযোগ প্রচুর।
রাম বসু মনে মনে ভাবে, এ যদি সুযোগ হয়, তবে দুর্যোগ না জানি কি। প্রকাশ্যে বলে, ডাঃ কেরী, বাংলা সাহিত্যে গদ্য নেই বটে, তবে পদ্যের সমৃদ্ধি কম নয়।
কেরী বলে, আপাতত প্রয়োজন আমাদের গদ্যে।
কিন্তু না আছে বাংলা ভাষার অভিধান, না আছে ব্যাকরণ, গদ্য গড়ে উঠবে কি ভাবে?
অসুবিধাটা কি? ব্যাকরণ লিখব, অভিধান সঙ্কলন করব, তার পরে এ দুয়ের সাহায্যে মুখের ভাষার উপরে বনিয়াদ খাড়া করে গদ্যের ইমারত গেঁথে তুলব। কঠিনটা কি? এই পথেই সব দেশের গদ্য তৈরি হয়ে উঠেছে।
কাজের সুগমতা স্মরণ করে রাম বসু শিউরে ওঠে।
কেরী বলে চলে, প্রথমে ইংরেজী আর ফারসী থেকে অনুবাদ করে গদ্যের আড় ভাঙতে হবে, তার পর আসবে মৌলিক রচনা।
রাম বসু বলে, খুব ভাল হবে।
হবেই তো, উৎসাহিত হয়ে বলে ওঠে কেরী, তার পরে হিন্দী ভাষায়, ওড়িয়া ভাষায় এবং অন্যান্য ভারতীয় ভাষায় গদ্য সৃষ্টি করবার ভার নেব—আর নিশ্চয় জোনো। প্রভুর আশীর্বাদে সাফল্যলাভ করব। কেন না তাঁর মহিমা তাঁর বাণী প্রচারের জন্যই তো এত পরিশ্রম, এত অধ্যবসায়।
রাম বসু স্বীকার করে—অবশ্যই সাফল্যলাভ হবে, নতুবা তিনি এমন যোগাযোগ ঘটাতেন না।
নিশ্চয়, নিশ্চয়, বলে কেরী বাইবেল খুলে বসে বলে, “সেন্ট ম্যাথিউ’ পরিচ্ছেদটি আজ তোমাকে বুঝিয়ে দিই।
কেরী বোঝায়, অসীম তার উৎসাহ। খুব সম্ভব রাম বসু বোঝে, কেন না অগাধ তার নীরবতা।
অবশেষে পরিশ্রান্ত কেরী শুধায়, মুন্সী, বুঝলে? রাম বসু বলে, ডাঃ কেরী, পাণ্ডিত্য ও প্রভুর কৃপা অসাধ্য সাধন করতে পারে, বুঝে উপায় কি?
বেলা এগারোটা বাজে। বোটের জানালা দিয়ে গাঁয়ের ঘাট দেখা যায়। দেখা যায় আদুড় গায়ে মানাথী নরনারী, ছেলেরা জলে সাঁতার কাটছে, এক পাশে নৌকোর ভিড়।
কেরীর মানসিক গতিবিধির অস্ফুট পদধ্বনি বাক্যে প্রকাশিত হয়—আহা, কবে এরা প্রভুর গোষ্ঠে এসে সমবেত হবে!
রাম বসু মনে মনে বলে—তাহলে তোমাকে শেষ বিচারের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করে থাকতে হবে, তার আগে নয়। পারবে কি?
উইলিয়াম কেরী ও রামরাম বসুর মত ভিন্নপ্রকৃতির দুটি লোক কখনও কদাচিৎ মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। দুজন দুই জগতের, দুই যুগের লোক। ঘটনাচক্রের বিচিত্র আবর্তনে দুইজনে এসে একখণ্ড ভূমিতে পাশাপাশি উপস্থাপিত হয়েছে, মিল এইটুকু মাত্র—দুটি মনশ্চেতনার মধ্যে অনন্ত ব্যবধান।
কেরী খ্ৰীষ্টীয় মধ্যযুগের অধিবাসী, কালভ্রষ্ট হয়ে অষ্টাদশ শতকে অবতীর্ণ। রাম বসু নূতন জগতের মানুষ, স্থানভ্রষ্ট হয়ে বাংলা দেশে আবির্ভূত। কেরীর বিশ্বাস, ধর্ম যাবতীয় সমস্যার সমাধানে সক্ষম। যে জাহাজের সে যাত্রী, তার নাম ধর্ম, তার কাঁটা কম্পাস নীতি, তার ধ্রুবতারা খ্ৰীষ্টীয় ভক্তি; যে দুর্নিরীক্ষ্য উপকূলের অভিমুখে জাহাজের গতি, তার নাম খ্রীষ্টীয় ভক্তিজগৎ।
