এই সময়টাকে বলা চলে কলকাতার ট্যাভার্ন বা সরাইখানার যুগ। শহরের সবচেয়ে নামজাদা হারমনিক ট্যাভার্ন লালবাজারে। এখানে শ্বেতাঙ্গ-মহলের হোমরা-চোমরাদের মিলিত হওয়ার আসর। খোদ ওযারেন হেস্টিংস পৃষ্ঠপোষক, মিসেস ওয়ারেন হেস্টিংসের সঙ্গে প্রসাদপ্রার্থীরা এখানে সাক্ষাৎ করত। ওয়ারেন হেস্টিংস এদেশ ত্যাগ করার পরে বন্ধ হয়ে যায় হারমনিক ট্যাভার্ন। ভ্যানসিটার্ট রো-তে লন্ডন ট্যাভার্ন, সেন্ট জন গির্জার কাছে নিউ ট্যাভার্ন, ৪৫নং কসাইটোলাতে ইউনিয়ন ট্যাভার্ন, বৈঠকখানায় ব্রেড অ্যান্ড চীজ বাংলো, ১নং ডেকার্স লেনে পা ট্যাভার্ন-উৎকৃষ্ট তপসি মাছ ভাজা খাওয়ার লোভে যেখানে খদ্দেরের ভিড় জমত, আর ছিল ক্রাউন অ্যাংকর ট্যাভার্ন নূতন কেল্লার কাছে, যেখানে ২৪ ঘণ্টার চার্জ লাগত চার গিনি।
অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে শ্বেতাঙ্গ-কলকাতা অত্যন্ত দুর্মূল্য স্থান ছিল। ফিলিপ ফ্রান্সিস একটি বাড়ির ভাড়া দিত বছরে বারোশো পাউণ্ড। মধ্যবিত্ত গৃহিণী মিসেস কে দিত দুশো পাউণ্ড, হিকি নামে এক আইন-ব্যবসায়ীকে হাজার পাউন্ড খরচ করতে হয়েছিল গৃহসজ্জার জন্যে।
১৭৯৩ সালে এক পাউঙ চায়ের দাম ছিল সাড়ে চার টাকা, এক ডজন সৃতি মোজা প্রায় ন পাউণ্ড, একদিনের গাড়িভাড়া দু-গিনি, এক রাত্রির জন্যে পিয়ানোেভাড়া ত্রিশ টাকা, আপেল টাকায় আটটা, আঙুর চার টাকা সের, সোডাওয়াটার ভজন দশ টাকা; ধোবী খরচ-পুরুষের কাপড় শতকরা তিন টাকা, মেয়েদের কাপড় সাড়ে চার টাকা; চুল-ছাঁটাই ও কেশ-বিন্যাস বারো টাকা। থিয়েটারের টিকিটের মূল্য অনুরুপ চড়া চৌরঙ্গী থিয়েটার বক্স সীট বারো সিকা টাকা, পিট ছয় সিক্কা টাকা; ১৫নং সার্কুলার রোডের থিয়েটারে একটা আসন এক মোহর।
এখানেই শেষ নয়। এত খরচ করেও সাহেব-সুবোরা টাকার টানাটানি অনুভব করত না। ফিলিপ ফ্রান্সিস একরাতের জুয়োখেলায় জিতেছিল কুড়ি হাজার পাউন্ড, বারওয়েল হেরেছিল চল্লিশ হাজার পাউণ্ড। এমন হার-জিত নিত্য চলত।
তাক লেগে যায় যখন ভাবি এই দরিদ্র দেশে হঠাৎ আলাদিনের প্রদীপ আবিষ্কৃত হল কি-ভাবে। সেভাবেই আবিষ্কার হক, আলাদিনের প্রদীপের সোনার-ফসল-বাহী শ্বেতাঙ্গগণ যখন স্বদেশে ফিরে যেত, প্রকট ঘৃণায় আর প্রচ্ছন্ন ঈর্ষায় সকলে তাদের বলত Nabob, কি না-নবাব। শ্বেতাঙ্গ নবাব ইতিহাসের এক বিচিত্র জীব। তো নবাবের আদি ও শ্রেষ্ঠ লর্ড ক্লাইভ কলকাতা সম্বন্ধে বলতে বাধ্য হয়েছে—চরাচরের নিকৃষ্টতম স্থান; দুনীতি, লাম্পট্য, বিবেকহীনতা শ্বেতাঙ্গ-মহলকে গভীরভাবে পেয়ে বসেছে আর তার কৃপায় সকলে অল্পকালের মধ্যে ধারণাতীত অর্থগৃধু, অমিতব্যয়ী ও বিত্তশালী হয়ে উঠেছে।
মোট কথা, অষ্টাদশ শতকের কলকাতা কামিনী কাঞ্চনের শ্রীক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। আবহাওয়া যেমন ছোট-বড় নির্বিশেষে সকলকে প্রভাবিত করে এ বিষয়েও সেই নিয়ম খাটে। প্রথমে সর্বশ্রেষ্ঠের কথাই নেওয়া যাক। ক্লাইভ যখন গভর্নর, বিলাত থেকে কাউন্সিলের নূতন সদস্য এসে পৌঁছলে, দলে ভেড়ানোর উদ্দেশ্যে সোজাসুজি ক্লাইভ জিজ্ঞাসা করত, বলি কত টাকা চাও?
ওয়ারেন হেস্টিংসের পদ্ধতিটাও ছিল প্রায় একই রকম তবে টাকার পরিমাণ সদস্যের মর্জির উপর না ছেড়ে দিয়ে জনপ্রতি লক্ষ পাউন্ড পর্যন্ত খরচ করতে রাজী ছিল গভর্নর জেনারেল।
ক্লাইভ ও হেস্টিংসের আচরণ এক রকম হলেও, এমন দুটি ভিন্ন জাতের মানুষ কম দৃষ্ট হয়। ক্লাইভ ষোড়শ শতকের ইংরেজ বোম্বেটেগণের সুযোগ্য উত্তরপুরুষ-দুর্ধর্ষ, দুঃসাহসী, ন্যায়নীতিজ্ঞানশূন্য, অসাধারণ কর্মকুশল ও দেশপ্রেমিক। আর ইউরোপীয় ইতিহাসে যে-ভাবসমষ্টিকে অষ্টাদশ-শতকীয় বৈশিষ্ট বলা হয়, ওয়ারেন হেস্টিংসের চরিত্রে তার বিচিত্র ছায়াতাপ পড়েছিল; সে ছিল পূর্ণভাবে অষ্টাদশ শতকের সন্তান। জ্ঞানের সঙ্গে কর্মের যে অদ্ভুত সংমিশ্রণে অষ্টাদশ শতকের শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি ভলতেয়ার-চরিত্র গঠিত, তারই একটি ক্ষুদ্রতর প্রতিকৃতি যেন ওয়ারেন হেস্টিংস! সামান্য কুঠিয়ালের পদ থেকে নবজিত সাম্রাজ্যের ক্ষত্ৰপপ্রধানের পদপ্রাপ্তি কুলকৌলীন্যহীন ব্যক্তির পক্ষে সেকালে সামান্য কৃতিত্ব নয়। এই একটি বাক্যে তার অসাধারণ কর্মকুশলতার পরিচয়। আবার জ্ঞানের প্রতি তার প্রবল আকর্ষণ অষ্টাদশ শতকের বিশুদ্ধ জ্ঞানস্পৃহাকে প্রকাশ করে। প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্য ও ফারসী সাহিত্যের শ্রেষ্ঠত্ব যারা প্রথম স্বীকার করেছিল তাদের মধ্যে হেস্টিংসের নাম অগ্রগণ্য; নিজের খরচে গীতার প্রথম ইংরেজী অনুবাদ ছাপিয়ে দিয়েছিল যে-ব্যক্তি, আর যাই হক ক্লাইভের মত সে গোয়ার ছিল না। লাটিন ও ফারসী সাহিত্যে ছিল তার অসামান্য দখল; লাটিনে এপিগ্রাম রচনায় বা ফারসীতে রুবাই তৈরিতে সেকালে এদেশে তার জুড়ি ছিল না।
এডমন্ড বার্কের প্রচণ্ড বাগিতার হাতুড়ির প্রত্যাঘাত করার ক্ষমতা তার ছিল না, কিন্তু অক্ষম রোষে এপিগ্রামের ছোবল মারতে বাধা কি?
Oft have I wondered that on Irish ground
No poisonous reptiles ever yet were found:
Revealed the secret stands, of Nature’s work,
She saved the venom to create a Burke!
মিতাহারী, মিতাচারী হেস্টিংস পালকির ডাক বসিয়ে চলেছে কাশী; কুরুপাণ্ডবের বীরত্ব কাহিনীর আকর্ষণে মন উধাও; কাশীতে নেমে চেৎ সিংকে এক গুতো দিয়ে কয়েক লক্ষ টাকা পকেটস্থ করে আবার ফিরল পালকি; এবার হয়তো শাহনামার যুদ্ধ বিবরণ। পথে পড়ল এক দেশীয় রাজ্য; হুমকির হুঙ্কারে কতকগুলো জহরৎ এসে ভর্তি হল আর এক পকেটে; আবার চলল পালকি, এবারে একমনে ফারসী বয়েৎ রচনার পালা; দুদিকে হিন্দুস্থানের ধূসর রৌদ্রদীপ্ত দিগন্ত, মাঝখানে হস্পাহমা তালে চলেছে পালকি, যার মধ্যে প্রশস্তললাট, কৃশমুখমণ্ডল, ক্ষীণদেহ, অষ্টাদশ-শতকের ব্যক্তিত্ব বিরাজমান। এসব কথা খুব বেশি বদল-সদল না করে ভলতেয়ার সম্বন্ধেও অনায়াসে লেখা যেতে পারত। ক্লাইভ ও হেস্টিংস গায়ে গায়ে সংলগ্ন হওয়া সত্ত্বেও দুজনের মুখ ছিল দুদিকে; ক্লাইভ অতীত আর হেস্টিংস ভবিষ্যৎ।
