শ্বেতাঙ্গ-সমাজে যারা প্রবীণ তাদের স্মৃতি অনেক দূর যায়। প্রত্যক্ষ বা অচিরলব্ধ জনশ্রতিযোগে তারা জানে, মাত্র সত্তর বছর আগে ঘনবর্ষণ প্লাবিত শ্রাবণের এক অপরারে খান দুই জাহাজ সুতানুটির ঘাটে এসে ভিড়েছিল। জব চার্নক দলবল নিয়ে ডাঙায় নেমে দেখে যে, আগের বারে তারা যে ঘরবাড়ী তৈরি করেছিল তার চিহ্নমাত্র নেই, না আছে চাল না আছে চুলো। তবু না থেকে উপায় নেই, কারণ ফেরবার পথ রুদ্ধ করে বিরাজমান হুগলির ফৌজদারের অসন্তোষ। জব চার্নক রয়েই গেল। তার পরের ইতিহাস সর্পিল, কুটিল, সংশয় ও সাহসে জড়িত।
বছর পঁচিশ পরে সুতানুটির দক্ষিণে কলকাতা গ্রামে গড়ে ওঠে কোম্পানির কেল্লা। অবশ্য বাদশার অনুমতি নিতে হয়েছিল, ব্যাধি চিকিৎসা নিরাময় প্রভৃতির সঙ্গে সে অনুমতির ইতিহাস জড়িত। কত সন্তর্পণে পদক্ষেপ, কত স্কুতি-বিনম্র ভঙ্গীতে সম্ভাষণ, কত অকাতরে নীরব নির্যাতন বহন। সেদিনকার প্রসাদপ্রার্থীরা আজ প্রসাদ-বিতরণে উদ্যত, সম্মুখে প্রসারিতকর স্বয়ং নবাব-অচিরে বাদশাকেও ভর্তি হতে হবে নবাবের দলে। প্রবীণ শ্বেতাঙ্গগণ তুলনায় দেখত এই দুই যুগের হবি। কিন্তু বেশি লোকের দেখবার সুযোগ ঘটত না, আবহাওয়া ও ভয়াবহ ব্যাধির কল্যাণে পঞ্চাশ না পার হতেই অধিকাংশকেই সাধনোচিত ধামে প্রস্থান করতে হত।
কলকাতার দক্ষিণে গঙ্গার ধারে গ্রাম গোবিন্দপুর। সেখানে গড়া শুরু হল নূতন কেল্লা, বিলাত থেকে এল কারিগর। নৃতন কেল্লার উত্তরে চাঁদপাল ঘাট আর কাঁচাগুড়ি ঘাট বরাবর ফুলের গাছ ও ছায়া-তরুতে সাজিয়ে পত্তন হল এসপ্লানেডের। এতদিন যারা লালদিঘির হাওয়া খেয়ে ক্ষুধাবৃদ্ধি করত এবারে তারা এল নৃতন বাগ-বাগিচার প্রশস্ততর ক্ষেত্রে। এসপ্লানেডের উত্তরে পাশাপাশি কাউন্সিল হাউস আর গভর্নরের কুঠি। রনো কেল্লা রইল অকেজো পড়ে, কতক ঘর মালগুদাম, কতক ঘর খালি, একটা বড় ঘর কিছুদিনের জন্য আসর যোগাল রবিবাসরীয় উপাসনার। এমন অদ্ভুত ব্যবস্থা ভক্তির
অভাবে নয়, অভাব অর্থের। লালদিঘির উত্তর-পশ্চিম কোণে অবস্থিত সেন্ট অ্যাস গির্জা সিরাজদ্দৌলার আক্রমণে ভগ্ন, নূতন গির্জা গড়বার অর্থ কই-কাজেই। এত যে বাড়িঘর পথ হচ্ছে, তবে গির্জা গড়বার পয়সা হয় না কেন? গির্জার প্রয়োজন একাহমাত্র, কাজেই অগ্রাধিকার ও-সব বস্তুর।
কেল্লার পশ্চিমে গঙ্গাগর্ভ খানিকটা ভরাট করে নিয়ে বের করা হল নূতন রাস্তা। কেল্লার দক্ষিণে হাসপাতাল, হাসপাতালের পাশে কলকাতায় প্রাচীনতম খ্রীষ্টীয় গোরস্থান, কোম্পানির-শহর-প্রতিষ্ঠাতা জব চার্নকের সমাধি তাকে দিয়েছে প্রাচীনত্বের আভিজাত্য। এবারে হাসপাতাল উঠে চলে গেল ডিহি-ভবানীপুরে, কলকাতার তিন-চার মাইল দক্ষিণে—আর নূতন গোরস্থানের পত্তন হল শহরের পূর্ব-দক্ষিণ প্রান্তে, সুন্দরবনের মধ্যে। সেই সুবাদে চৌরঙ্গী রোড থেকে গোরস্থানে যাওয়ার রাস্তার নাম হল বেরিয়াল গ্রাউন্ড রোড। পরবর্তী কাল মানুষের সুনিশ্চিতপরিণামসূচী কর্ণকটু রাস্তাটার নাম বদলে রাখল পার্ক স্ট্রীট-এক সময়ে সার এলিজা ইম্পের Deer Park বা মৃগদাব ছিল কাছাকাছি। তখনকার দিনে এ জায়গাটা শহর থেকে অতিশয় দূরে গণ্য হওয়ায় বিশেষ রাহা-খরচ দিতে হয় পাদ্রীকে যখন সে যেত সমাধি-সত্তারের জন্য। পুরনো গোরস্থানের পশ্চিম অংশের খানিকটা নূতন রাস্তা-ভূক্ত হয়ে গেল। বাকিটা পড়ে থাকল, পরে উঠবে এখানে সেন্ট জন্স চার্চ।
লালদিঘির উত্তর দিক বরাবর একটানা তেতলা এক বাড়ি গড়ে উঠল ১৭৮০ সাল তক। এ বাড়ির তৈরির ও পরবর্তীকালের ইতিহাস বড় বিচিত্র। Lyon নামে একজন ইংরেজকে জমির পাট্টা দেওয়া হয় ১৭৭৬ সালে। পরে ওয়ারেন হেস্টিংসের কাউন্সিলের অন্যতম সদস্য বারওয়েল বাড়িটা কিনে নিয়ে গভর্নমেন্টকে দেয় ভাড়া। কিন্তু সার ফিলিপ ফ্রান্সিসের মতে বাড়িটা গোড়া থেকেই বারওয়েলের, বর্তমান Lyon’s Range-এর Lyon ছিল বারওয়েলের বেনামদার। বাড়িটাতে উনিশ প্রস্থ suite বা কক্ষাদি ছিল, ভাড়া প্রতি প্রস্থ মাসিক দুই শত টাকা।
এর আগে কোম্পানির Writerগণ (পরবর্তী পরিভাষায় Civil Service চাকুরে) শহরে বাসা খুঁজে নিয়ে বাস করত, বাসা ভাড়া পেত সরকার থেকে। ১৭৮৫ থেকে সিদ্ধান্ত হল যে তিনশো টাকার কম বেতনের Writerগণ দু-দুটি ঘরের এক প্রস্থ বাসস্থান পাবে এই বাড়িতে, আর সেই সঙ্গে একশো টাকা ভাতা।
বাড়িটার এইরকম ব্যবহার চলল দীর্ঘকাল। তার পরে একসময়ে এর নীচের তলায় বসল প্রসিদ্ধ ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ, তখনও উপরতলায় থাকত পড়য়া Writer গণ। তার পরে আবার পালাবদল হল। writerগণ আবার নিজ নিজ বাসস্থান খুঁজে নেবার স্বাধীনতা পেল। বাড়িটা কিছুদিন খালি পড়ে থাকল, আবও কিছুদিন সওদাগরী অফিস হয়ে ভাড়া খাটাল, তার পরে আবার এল ফিরে সরকারী হাতে। অবশেষে পরিবর্ধিত পরিমার্জিত ও গম্বুজসমন্বিত হয়ে পরিণত হল বেঙ্গল সেক্রেটারিয়েটে। এখনও সেই ব্যবহার চলছে।
লালদিঘির দক্ষিণে একফালি জমি, গভর্নরের দেহরক্ষী সৈন্যদের প্যারাড় করবার জায়গা, প্রয়োজনকালে শ্বেতাঙ্গ স্বেচ্ছাসেবক সৈন্যরাও এখানে প্যারাড় করত। আর পুব দিকের প্রথম সারে বেঙ্গল ক্লাবের প্রকাণ্ড বাড়ি, দ্বিতীয় সারে ও মিশন চার্চের গির্জা। লালদিঘি বা ট্যাঙ্ক স্কোয়ারের ভিতরে উত্তর-পূর্ব কোণে ছিল বিশাল এক তেঁতুলগাছ, যত রাজ্যের পাখীর বাসা গাছটায। ১৭৩৭ সালের মহাঝটিকায় গাছটা উপড়ে পড়ে যায় উত্তরদিকের পথ বন্ধ করে। পার্কের বাইরে উত্তর-পুর্ব কোণে আদালত, যেখানে বিচার হয়েছিল নন্দকুমারের। সেই বাড়িটাই টাউনহল রূপে ব্যবহৃত হত—শেতাঙ্গদের নাচগান খানাপিনার আসর। লালবাজার স্ট্রীটের, বিদেশী নাবিক খালাশী মাল্লাদের ফ্ল্যাগ স্ট্রীটের দক্ষিণে শহরের প্রাচীনতম জেলখানা-এখানেই থাকতে হয়েছিল নন্দকুমারকে। পরে জেলখানা উঠে যায় ময়দানে দক্ষিণতম অংশে–এই হল হরিণবাড়ির জেল। এরই পশ্চিমে টালির নালার কাছে ফাঁসি হল নন্দকুমারের। কসাইটোলা স্ট্রীট পার হয়ে লালবাজার স্ট্রীটের পুব দিকের বাড়তি রাস্তাটা ‘দি অ্যাভিনিউ’–দুপাশে গড়ে উঠল শৌখিন সমাজের বাসস্থল। কসাইটোলা, রাধাবাজার আর চীনাবাজারের শ্রেষ্ঠ বিপণি ঠাসা ভর্তি থাকত দেশী বিদেশী পণ্যে।
