টমাস আবার শুধায়—কিন্তু যাবে কোথায়? সবই যে অনিশ্চিত।
এক বছর আগেও কি নিশ্চিত ছিল যে, কলকাতায় আসতে হবে আমাকে।
তার পর দুই পায়ের উপর সুপ্রতিষ্ঠিতভাবে দাঁড়িয়ে কেরী বলল, ব্রাদার টমাস, আর তর্ক নয়, আমি সিদ্ধান্তে এসেছি, অবিলম্বে আমাদের নিরুদ্দেশ যাত্রা করতে হবে। যাও তুমি গিয়ে গোছগাছ কর গে–আর মুন্সীকে বল আমার সঙ্গে যেন একবার দেখা করে।
ভগবানের কৃপাতেই হক আর ঘটনাচক্রের আবর্তনেই হক শেষ পর্যন্ত কেরীদের ঠিক নিরুদ্দেশের মুখে যাত্রা করতে হল না।
জর্জ উডনী নামে ধর্মপ্রাণ এক ব্যবসায়ী ছিল। বাংলাদেশের নানাস্থানে তার নীল ও রেশমের কুঠি ছিল। এইসব কুঠির কাজ তদারক করে ঘুরে বেড়াতে হত তাকে। কলকাতায় ফিরে এসে উড়নী খবর পেল যে ডাঃ কেরী ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে এসেছে আর কলকাতাতেই আছে। উডনী এসে কেরীর সঙ্গে পরিচয় করে নিল, কেরীর উদ্দেশ্যের প্রতি সহৃদয় সমর্থন জানাল। তার পরে যখন শুনল যে কলকাতা পরিত্যাগ করে পীবঙ্গের কোনস্থানে বসতে কেরী সঙ্কল্পিত, তখন তার উৎসাহ আরও বেড়ে গেল। মালদহ জেলার মদনাবাটিতে এবং দিনাজপুর জেলার মহীপালদিঘিতে উডনীর নীলকুঠি ছিল। তার প্রস্তাবে কেরী মদনাবাটির ও টমাস মহীপালদিঘির নীলকুঠির নেজারি পদ গ্রহণ করতে সম্মত হল।
উডনী বলল বেশ ভাল হয়, আমার কাজও হবে, তোমাদের কাজও হবে, ম্যানেজারের দায়িত্ব অল্প, ধর্ম-প্রচারে বাধা হবে না। আর তা ছাড়া, ও দুটো জায়গার মধ্যে ব্যবধান মাত্র ১০/১২ মাইলের, কাজেই তোমাদের দেখাসাক্ষাৎও চলতে পারবে।
টমাস উডনীর কাছে বেতনের কিছু টাকা আগাম চেয়ে নিয়ে মহাজনের দেনা শোধ করে যাত্রার জন্যে প্রস্তুত হতে লাগল।
কলকাতা ছেড়ে মদনাবাটি যেতে হবে, তাও আবার অবিলম্বে, শুনে রাম বসু উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল। কিন্তু বসুজা সেই শ্রেণীর লোক, হাল ভাঙলেও যারা হাল ছাড়ে না, আর প্রতিকূল বাতাসকে অনুকূলে আনতে হলে কিভাবে পাল খাটাতে হয় সে কৌশল জানে।
পাদ্রীদের সঙ্গে স্বামীকে বিদেশে যেতে হবে শুনে অন্নদা ঝঙ্কার দিয়ে উঠল, বলল, তবে আর কি, এবারে খিরিস্তানগুলোর সঙ্গে মিলে ধিঙ্গিপনা কর গে, বারণ করবার আর কেউ রইল না।
বসুজা বলল, নরুর মা, ধিঙ্গিপনা কাকে বলে জানি নে, জানি কেরী সাহেবকে, একবার পড়া শুরু করলে দুই প্রহরের কমে হাড়ে না, ধিঙ্গিপনা করবার ফুরসৎ কোথায়?
সেখানে গিয়ে কি করবে না করবে তা তো আর দেখতে যাব না। পারতাম চোখ-জোড়া সঙ্গে পাঠাতে!
তুমি সঙ্গে না গেলেও ন্যাড়ার চোখ-জোড়া তো সঙ্গেই যাচ্ছে—সে চোখ তো এখন তোমারই চোখ।
অনেক বিবেচনার পরে অন্নদা ন্যাড়াকে আনিয়ে নিয়েছে। অন্নদার চোখে ন্যাডার অনেক গুণ; ন্যাড়া খায় কম, খাটে বেশি আর মন রাখা কথা বলতে তার জুড়ি নেই।
ন্যাডাকে স্বগৃহে ভর্তি করবার আগে উভয়ের মধ্যে নিম্নোক্তরূপ প্রশ্নোত্তর ঘটেছিল।
হারে ন্যাড়া, তোরা তো কায়স্থ, কি বলিস?
তুমিই তো বললে দিদিঠাকরুন, আমি কি আর অন্য কথা বলতে পারি।
এবারে গলা একটু খাটো করে জিজ্ঞাসা করল—হ্যাঁরে, অখাদ্য খাস নি তো?
কি যে বল দিদিঠাকরুন, অখাদ্যের দাম অনেক বেশি, আমার ভোগে জুটবে কেন?
তবে কি খেয়েছিস?
ডাল ভাত আর গঙ্গাজল।
গঙ্গাজল!
অন্নদা বিস্মিত হয়। বলিস কি রে!
গঙ্গাতীরে গঙ্গাজল ছাড়া আর কি জুটবে?
তবে ওতেই সব শুদ্ধ হয়ে গিয়েছে, কি বলিস?
অশুদ্ধ হল কোথায় যে শুদ্ধ হবে!
খুশি হয়ে অন্নদা বলে, বস দেখি এখানে।
তার পরে এক কলসী গঙ্গাজল এনে ন্যাড়ার মাথায় ঢেলে দিয়ে বলেনে, এবারে গা মুছে এই শুকনো কাপড়-জামা পর।
এইভাবে সংক্ষেপে অথচ পরিপূর্ণরূপে খ্রীষ্টানগৃহবাসের পাপ সংস্কার করে ন্যাড়াকে ঘরে তোলে মনস্বিনী অন্নদা।
জাতি-নাশ সহজ বলেই তার সংশোধনের পথ সুগম।
এখন ন্যাড়া কর্মকুশলতায় ও মধুর বাক্যপ্রয়োগ-গুণে অন্নদার প্রিয় এবং নির্ভরস্থল। পুত্র নরু নেড়ুদা বলতে পাগল।
প্রবাসী স্বামীর তত্ত্বাবধান সম্বন্ধে ন্যাড়াকে রীতিমত তালিম দিতে লেগে গেল অন্নদা।
ন্যাড়া বলত–কায়েৎ দাদার জন্যে তুমি ভেবো নি দিদিঠাকরুন। কায়েৎ দাদা অভিধাটি সে টুশকির কাছে শিখেছিল।
কেরী-পরিবারের যাত্রার যাবতীয় ব্যবস্থা করে দিয়ে উডনী টমাসকে নিয়ে রওনা হয়ে গেল।
পাঁচ-সাত দিন পরেই সপরিবারে কেরী রাম বস, পার্বতী ব্রাহ্মণ ও ন্যাড়াকে নিয়ে নৌকাযোগে মদনাবাটির উদ্দেশে যাত্রা করল।
.
১.২০ একটি অবান্তর পরিচ্ছেদ
তবে বাদ না দেওয়াই ভাল
পলাশীর যুদ্ধের পরে নবাবভীতি দূর হওয়ায় কলকাতার শ্বেতাঙ্গ পাড়া পুব দিকে দক্ষিণ দিকে পেখম মেলে দিতে শুরু করল। এতকাল চির-অভাবগ্রস্ত নবাব ও তার উজীর-নাজিরদের ভয়ে সঙ্কুচিতকলাপ হয়ে যে সমাজ বাস করছিল এখন আর তাদের সে ভয়ের কারণ রইল না; যখন-তখন যে-কোন উপলক্ষে কলাপের চন্দ্ৰকগুলো ভিন্ন করে নিতে পারত যে পুরুষ বাহু তা এখন নিবীর্য, কোম্পানি মুখে অন্ন তুলে দিলে তবে তার আহার সম্পন্ন হয়। অতএব আর সঙ্কোচের কারণ কি।
এতাবকাল লালদিঘিকে কেন্দ্র করে শ্বেতাঙ্গ শহর নানা দুদেবের মধ্যে কোন রকমে মাটি আঁকড়ে পড়েছিল। গঙ্গার উপরেই কেল্লা, কেল্লার নীচেই ঘাট, ঘাটে জাহাজ, প্রয়োজনকালে পালাবার অসুবিধা নেই। সিরাজদ্দৌলার কলকাতা আক্রমণের সময়ে এইভাবে এই পথে কোম্পানির লোকজন পালিয়ে ফলতায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। যারা পালায় নি, লড়াই করেছিল, তারা হেরেছিল। এ রকম ঘটনা এখন পুনরাবর্তনের অতীত। এতদিন কলকাতা ছিল মুর্শিদাবাদের আশ্রিত, এখন থেকে মুর্শিদাবাদ হল কলকাতার আশ্রিত। অবশ্য দিল্লীতে মুঘল বাদশা এখনও বিরাজমান, কিন্তু কলকাতা থেকে দিল্লীর দূরত্ব যে গ্রহান্তরের দূরত্ব। অতএব নির্ভয়ে চারদিকে হাত পা ছড়িয়ে দাও। হাতে যদি কিছু মূল্যবান ঠেকে সংগ্রহ কর, পায়ে যদি কিছু বাধা বলে মনে হয় পদাঘাত কর। হাত-পা ছড়াবার অনেক সুবিধা।
