কেটি!
হ্যান্ডব্যাগ খুলতে বেরুল একখানা চিঠি, দুবোয়া লিখছে কেটিকে।
মেরিডিথ পড়ে দিল রিংলারকে, বলল, পড়ে দেখ, মানুষ কত নৃশংস হতে পারে! রিংলার পড়ে সংক্ষেপে মন্তব্য করল, হৃদয়হীন পাষণ্ড।
চিঠিখানা পড়তে পড়তে লিজার চোখ ছলছল করে উঠল, বুঝল কেটির প্রতি সে অবিচার করেছিল, বুঝল যে ভুলের কথা জানত না সে, আরও বুঝল যে কোন উপায়ে জনকে নিহত ও কেটিকে পরিত্যাগ করবার অভিপ্রায়েই নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে কলকাতায় এসেছিল সে, দুবোয়া। দুবোয়া লিখছে–
Mon chére, প্রিয় আমার,
তোমার ভূতপূর্ব প্রণয়ীর এক ছটাক রক্তপাতে এখানকার বেরসিক ইংরেজগুলো বড়ই ক্ষেপে উঠেছে। অথচ দেখ ঠিক এই মুহূর্তে আমার সুন্দর ফরাসী দেশে সাম্য মৈত্রী স্বাধীনতার নামে হাজার হাজার টন রক্তপাত চলছে, এমন কি সাধারণের লাল রক্তপাতে সন্তুষ্ট না হয়ে সেখানকার লোকে রাজা-রানীর নীল রক্তপাত ঘটিয়েছে। অথচ এখানে কত প্রভেদ! ইংরেজগুলো বড়ই রক্ষণশীল, তারা নিজেদের রক্ত রক্ষা করতে চায়—যদিচ সুবিধা পেলেই আমার দেহে কতটা রক্ত আছে পরীক্ষা করে দেখবে নিশ্চয়। এ রকম ক্ষেত্রে কর্তব্য সম্বন্ধে মঁ ভলতেয়ারের নির্দেশ সুস্পষ্ট—তিনি বলেছেন, বীরত্বের চেয়ে বিচারের মূল্য বেশি। অতএব আমি এখান থেকেই সুন্দরবনে যাত্রা করলাম। তোমাকে কার কাছে রেখে গেলাম? কেন, রইল তোমার ভূতপূর্ব প্রণয়ী এবং খুব সম্ভব ভাবী স্বামী। দু-চার দিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে উঠে লোকটা বাড়ি যাবে তখন আর কি, তোমরা দুজনে সুন্দরবনে, ‘ফরেস্ট অব বিউটিফুল উইমেন’ নামে অরণ্যে স্বাধীন মুগ্ধ কপোত-কপোতীর মত আনন্দের কুজন করে উড়ে বেডিও। যখন সেই লোকটা তোমাকে বাহুবন্ধনে বদ্ধ করে বিশ্রদ্ধ সুরে ডাকবে কিট কেট কেটি, তখন তার দক্ষিণ বাহুমূলে মৎকৃত ক্ষতচিহ্ন দেখে আশা করি আমাকে মনে পড়বে আর সেখানে চুম্বন করবে দু একবার, সে চুম্বনের স্পর্শ পৌঁছবে আমার নাকের ডগায়—যেটি ছিল তোমার খুব প্রিয় স্থান। তুমি হয়তো জিজ্ঞাসা করবে যে, কেন তোমাকে ছেড়ে গেলাম? এসব গুরুতর বিষয়ের উত্তর মহাজনবাক্যে দেওয়াই সমীচীন-তাই আমাদের সাহিত্যের অন্যতম মহাজন রশফুকোর ভাষায় বলি—এক খনিতে বুদ্ধিমান ব্যক্তি বেশিদিন নামে না। যদিচ এ-ও নিশ্চয় জানি এমন মণিরত্নে পূর্ণ খনি বেশি দিন খালি থাকবে না, তোমার ভূতপূর্ব প্রণয়ী— তোমার ভাবী স্বামী সাগ্রহে সেখানে অবতরণ করে নিজেকে ধন্য মনে করবে। কাজেই তোমাকে বেঘোরে ফেলে যাচ্ছি এমন অপবাদ নিশ্চয় দেবে না, নিশ্চয় মনে করবে না যে, আমি হৃদয়হীন। অতএব বিদায়, mon chere, বিদায়! চোখের জলে চারিদিক ঝাপসা হয়ে গিয়েছে তাই আর কলম চলছে না, বলবার কথার কি শেষ আছে— অহো, হো। ইতি–
তোমার চিরকালের দুবো।
চিঠি পড়ে তিনজনে অনেকক্ষণ নির্বাক হয়ে বসে রইল। প্রথম কথা বলল লিজা। সে বলল—এই চিঠির পরে কেটি যা করেছে তা ছাড়া করবার আর ছিল কি? আহা, বেচারাকে আমি ভুল বুঝেছিলাম।
মেরিডিথ বলল—এখন ওঠ, পরবর্তী ব্যবস্থার আয়োজন করা যাক।
তাই বটে। সংসারের রথ এক মুহূর্তও নিশ্চল থাকে না, চরম দুঃখ ও পরম আনন্দকে সমান উপেক্ষা করে তার রথচক্র নিত্য ঘর্ঘরিত। হয়তো ঠিক সেইজন্যই মানুষের জীবনধারণ সম্ভব হয়, নতুবা হয়তো মুহূর্তের সুখ-দুঃখই চিরন্তন হয়ে বিরাজ, জীবন পড়ত অচল হয়ে। জীবনের যাবতীয় সুখ-দুঃখের সমষ্টির চেয়েও যে জীবনটা অনেক বড়, অনেক বেশি গুরুভার, এই সত্যটির উপলব্ধিতেই হয়তো জীবনের চরিতার্থতা।
পর পর কয়দিনের অতর্কিত আঘাতে স্বভাবত অস্থিরমতি মিসেস কেরী উন্মাদবৎ হয়ে গেল। একাকী ঘণ্টার পর ঘণ্টা সে নীরবে বসে থাকত,তার পর হঠাৎ ফুকরে উঠতটাইগার, টাইগার! আর তার পরেই চৌকি, পালঙ্ক, টেবিল প্রভৃতির নীচে উঁকি মেরে দেখত বাঘ লুকিয়ে আছে কি না। স্মিথ পরিবারের পক্ষে সে হয়ে উঠল প্রকাণ্ড একটি সমস্যা।
ডুএলের সংবাদ পাওয়ার পরে ডাঃ কেরী গম্ভীর হয়ে পড়েছিল, তার পর দুবোয়ার পলায়ন ও কেটির মৃত্যুতে সেই গাম্ভীর্য তাকে আত্মজিজ্ঞাসায় নিরত করল। এ কয়দিন কেরী নিতান্ত গতানুগতিক দু-চারটি কথা বলা ছাড়া কারও সঙ্গে বড় বাক্যালাপ করে নি, এমন কি টমাসও তার কাছে ভিড়তে সাহস পেত না। কেটির মৃত্যুর তিন দিন পরে একদিন সকালে টমাসকে সে বলল, ব্রাদার টমাস, কলকাতায় আমাদের বাস করা চলবে না।
এমন আশঙ্কা টমাসের মনে কখনও আসে নি, তাই আকাশ থেকে পড়ার বিস্ময়ে শুধাল—তার মানে! তবে কি দেশে ফিরে যাবে?
দেশে ফেরবার জন্যে এত খরচ করে এতদূরে আসি নি।
টমাস আবার শুধায়–তবে?
বাংলাদেশের অন্যত্র কোথাও গিয়ে বসতে হবে।
কিন্তু এখানে নয় কেন?
কেন যে নয় সেটা আমার চেয়ে তোমার জানার কথা বেশি। এ শহর সডম ও গমরার চেয়েও গুরুতর পাপে পূর্ণ, চিকিৎসার অতীত এর অবস্থা।
টমাস কলকাতা ছাড়তে রাজী নয়, তাই সে উল্টো জেবা করে বলল-কিন্তু সেই জন্যেই তো এখানে ধর্মপ্রচারের আবশ্যকতা বেশি।
হতে পারে, কিন্তু সে আমার মত লোকের সাধ্যাতীত, কোন প্রেবিত পুরুষ যদি আসেন তিনি চেষ্টা করবেন।
তার পরে বার দুই পায়চারি করে—গভীর চিন্তার সময়ে পায়চারি করা কেরীর স্বভাব-সে বলল, এখন বুঝতে পারছি ‘ইভের মত লোককেও কেন স্বীকার করতে হয়েছিল যে, কলকাতা শয়তানের শহব।
