পরদিন খুব ভোরে, তখনও কেউ জাগে নি, জন দুবোয়া মেরিডিথ ও রিংলার পদব্রজে গিয়ে উপস্থিত হল বির্জিতলার দিঘিটার ধারে। চারিদিক নিঃশব্দ, নির্জন। তারা দিঘির ধারে একটা পরিষ্কার জায়গা বেছে নিয়ে দাঁড়াল। মেরিডিথ ও রিংলার বারো ধাপ ব্যবধান চিহ্নিত করে নিয়ে দুবোয়া ও জনকে দাঁড় করিয়ে দিল।
দুবোয়া করমর্দন করবার উদ্দেশে হাত বাড়িয়ে দিল, জন প্রত্যাখ্যান করল।
দুবোয়া হেসে বলল, আশা করি, রুই হও নি, এ কেবল সামাজিক প্রথা রক্ষা।
জন কোন উত্তর দিল না।
মেরিডিথ দুজনকে সতর্ক করে দিল—মেরিডিথ হাতের রুমাল নিক্ষেপ করে সঙ্কেত জানাল।
জন পিস্তল ছুঁডলগুলি দুবোয়ার কান ঘেঁষে বেরিয়ে গেল।
গুলি এল কোত্থেকে, জনের মনে এই রহস্যময় প্রশ্নের মীমাংসা হওয়ার আগেই রিংলারের রুমাল-সংকেতে দুবোয়া গুলি ছুঁড়ল। গুলি জনের দক্ষিণ বাহু ভেদ করে বিদ্ধ হল, সে নীরবে মাটিতে পড়ে গেল। বিদ্যুৎ-চকিতে তার মনে রাতের স্বপ্নটা খেলে গেল আর সেই সঙ্গে মনে পড়ল, ‘জন, তোমাকে আমি ভালবাসি।’
তিনজনে ছুটে গিয়ে শুধাল—আঘাত কি গুরুতর?
উত্তর না পেয়ে নত হয়ে বসে দেখল জন মূর্ছিত।
তখন তারা তিনজনে জনকে তুলে নিয়ে নিকটবর্তী প্রেসিডেন্সি হাসপাতালের দিকে চলল।
দুবোয়া ক্রমাগত বলতে লাগল—আমি অত্যন্ত দুঃখিত, আমি অত্যন্ত দুঃখিত।
ওটা তার মনের কথা নয় সন্দেহ করে মেরিডিথ বলল, এখন দয়া করে চুপ করবে কি?
নিরুপায় দুবোয়া দুই কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে বলে উঠল যেমন তোমার অভিরুচি।
.
১.১৯ শয়তানের শহর
দুবোয়া-স্মিথ ডুএলের সংবাদ প্রচারিত হওয়ামাত্র কলকাতার শ্বেতাঙ্গ-সমাজে অপ্রত্যাশিত আলোডন দেখা দিল। সকলেরই মুখে এক কথা—এ অত্যন্ত গর্হিত, এ অত্যন্ত বাড়াবাড়ি, কোথায় গেল সেই ফরাসী শয়তানটা! তখনকার দিনে শ্বেতাঙ্গ-সমাজে এমন ডুএল আকছার ঘটত, কেউ কিছু মনে করত না, এমন কি ওয়ারেন হেস্টিংস ও সার ফিলিপ ফ্রান্সিসের মধ্যে ডুএল ঘটবার পরে ব্যাপারটা একটা ফ্যাশনের জলুস লাভ করেছিল। এ হেন অবস্থায় এ এলে এমন অপ্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া ঘটবার আসল কারণ তখন ইউরোপে ফরাসী দেশ ও ইংলণ্ডে যুদ্ধ বেধে গেছে—সে যুদ্ধও আবার ফরাসী বিপ্লবের ইডিওলজি-ঘটিত। কাজেই কলকাতার শ্বেতাঙ্গ-সমাজের ঘনীভূত ফরাসী বিদ্বেষ-ফরাসী জাতির ঐ একটিমাত্র প্রতিনিধির উপর গিয়ে পড়ল। ইংরেজে ইংরেজে ডুএল, হাঁ, তার অর্থ বোঝা যায়, কিন্তু ইংরেজ ফরাসীতে, তাতে কিনা আবার ঐ শয়তানটা হল বিজয়ী! সকলে সন্ধানে নিযুক্ত হল কোথায় গেল সেই ফরাসী শয়তানটা!
দুবোয়া শয়তান ঠিক না হতেও পারে কিন্তু প্রেসিডেন্সি হাসপাতালে পৌঁছেই বুঝে নিয়েছিল যে আবহাওয়া প্রতিকূল, ইংরেজ ডাক্তার রোগী প্রভৃতি সকলেরই সুর চড়া। সে বুঝল যে, এখন পলায়নটাই আত্মরক্ষার প্রশস্ততম পথ, সে মনে মনে আলোচনা করে দেখল, এ বিষয়ে ভলতেয়ারের নির্দেশ অত্যন্ত সুস্পষ্ট। কাজেই সে কেটির উদ্দেশে একখানা চিঠি পাঠিয়ে দিয়ে হাসপাতাল থেকেই সুন্দরবনে যাত্রা করল।
স্মিথ আহত হয়েছে সংবাদ বাড়িতে পৌঁছনো মাত্র লিজা পিতাকে নিয়ে হাসপাতালে রওনা হল, এমন যে ঘটতে পারে সে আগেই জানত।
নিরপরাধ কেটি সমবেদনা জানাতে এলে লিজা সংক্ষেপে বলল, খুকি আর কি, কিছু জান না! যাও।
সংক্ষিপ্ত উক্তির সঙ্গে নিক্ষিপ্ত হল ঘৃণা ও ধিক্কারপূর্ণ কটাক্ষ।
হতভম্ব, মর্মাহত কেটি গিয়ে ঘরে দরজা দিল।
গাড়িতে যেতে যেতে লিজা বলল, এ সমস্ত দুর্দৈবের মূলে ঐ বুড়ি শয়তান মাগীর আব্দার!
জর্জ বলল—সে যাই হক, এমন দুঃসময়ে অযথা ক্রোধে বিদ্বেষে মনকে আর অধিক বিচলিত করে তুলো না।
তুলব না? কেন তুলব না? ও বেটীর আব্দারেই তো নিমন্ত্রণ করতে হল ওর ডিয়ার ব্রাদার-ইন-ল’কে। আর তুমি বলছ রাগ করব না?
জর্জ বলল—আসল কথা কি জান, মিসেস কেরী ঠিক সুস্থমস্তিষ্ক ব্যক্তি নয়।
আর আমার মস্তিষ্কটাই খুব সুস্থ আছে, না? এই বলে সে কান্নায় ভেঙে পড়ল।
জর্জ নীরবে তার মাথায় হাত বুলোত লাগল।
জনের আঘাত গুরুতর নয়, ক্রমে সুস্থ হয়ে উঠতে লাগল এবং দিনসাতেকের মধ্যেই হাসপাতাল ত্যাগ করে বাড়িতে ফিরে এল।
কিন্তু রক্তজিহ্ব পিস্তল তার বলি না নিয়ে ফিরল না, আর সে বলিটাও কিনা শেষে সংগ্রহ করল নিতান্ত মর্মান্তিকভাবে।
কেটি ও দুবোয়ার কি হল কেউ খোঁজ করে নি, খোঁজ করবার মত মনের অবস্থা কারও ছিল না—আর খোঁজ করবার ভার তো একমাত্র লিজার উপরে, বাড়ির গিন্নি সে। সে দিবারাত্রি জনকে নিয়ে ব্যস্ত, হাসপাতালেই থাকত, কখনও কখনও এক আধ ঘণ্টার জন্য মাত্র বাড়িতে আসত। দুবোয়া ও কেটিকে না দেখে বাড়ির সবাই ধরে নিয়েছিল যে, ওরা কোন এক সুযোগে সকলের অলক্ষ্যে পালিয়ে গিয়েছে।
এমন সময়ে, ডুএলের তিনদিন পরে, ক্ষণিকের জন্য বাড়ি ফিরে লিজা যখন রিংলার ও মেরিডিথের সঙ্গে চা পান করছিল-চাকরে এসে খবর দিল যে, নঈ তলাও-এ একটা মৃতদেহ ভাসছে। কৌতূহলী হয়ে তারা চলল বেরিয়াল গ্রাউন্ড রোড ও চৌরঙ্গী রোডের মোড়ে সদ্যখনিত পুকুরটার দিকে। পুকুরের ধারে পৌঁছে দেখল-হা মৃতদেহই বটে, আর সেটা স্ত্রীলোকের। তিনজনের মনে একই সঙ্গে একই সন্দেহের বিদ্যুৎ চমক মেরে গেল। তার পরে পশ্চিম দিকের নলখাগড়া ঝোপের আড়াল থেকে একটা হ্যান্ডব্যাগ হাতে করে চাকরটা এসে দাঁড়াল।
