সেকালে কলকাতার শ্বেতাঙ্গ সমাজের বৈঠকে একজনের ফরসীর নল অপর জন কতৃক লঘন সামাজিক অশিষ্টাচারের চরম বলে গণ্য হত—এর একমাত্র প্রতিকার ছিল লঙ্ঘিত-নল ও লঙ্ঘনকারীর মধ্যে ডুএল। এমন এল সেকালে অনেক ঘটত। বর্তমান ক্ষেত্রে সেই আশঙ্কাই দেখা দিয়েছিল।
ডিনার শেষ হলে অধিকাংশ নিমন্ত্রিত ব্যক্তি চলে গেল, রইল কেবল মেরিডিথ ও রিংলার। তারা এই পরিবারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, খুব সম্ভব তারা লিজার মধ্যে মধুচক্রের সন্ধান পেয়েছিল। আর রইল কেটি ও দুবোয়া। মিসেস কেরীর নির্বাতিশয্যে তাদের দু-চার দিন থাকবার জন্যে অনুরোধ করতে বাধ্য হয়েছিল জর্জ স্মিথ।
তখনকার কলকাতায় ডিনারের পরে শ্বেতাঙ্গ সমাজ ঘণ্টা দুয়েকের জন্য ঘুমিয়ে নিত, তখন শ্বেতাঙ্গ পাড়ায় বিরাজ করত মধ্যাহ্নে মধ্যরাত্রির নীরবতা।
সকলে যখন বিশ্রামে মগ্ন, দুবোয়া জনকে নিয়ে এসে দাঁড়াল বাগানের বাদাম গাছটির তলায়। তার পরে স্বভাবসিদ্ধ মৃদু হাস্যে বলল, জন, আজকের ব্যাপারটার জন্যে নিশ্চয় তুমি দুঃখিত। কিন্তু হলে কি হয়, সামাজিক প্রথা বলে একটা জিনিস তো আছে,
আমাদের মধ্যে একটা বোঝাপড়া হওয়া আবশ্যক।
জন বুঝলে যে এ হচ্ছে ডুএলের আহ্বান।
তাকে নীরব দেখে দুবোয়া শুধাল, তুমি কি বল জন?
জন বলল, দয়া করে আমাকে মিঃ স্মিথ বল।
বেশ তাই হবে, এখন কি বল?
এতে আর বলবার কি আছে! সামাজিক প্রথা রক্ষা করতে হবে বইকি।
কিন্তু এখানে second বা দোসর পাওয়া যায় কোথায়?
জন বলল, তোমার আপত্তি না থাকলে মেরিডিথ ও রিংলারকে ডাকি।
আপত্তি কি? দুজনেই আমার বন্ধু।
জন ভাবল, বিচিত্র এই ফরাসী জাতটা, সকলেই তার বন্ধু, সব দেশই তার দেশ, সব নারীই তার mon chére!
জন মেরিডিথ ও রিংলারকে ডেকে নিয়ে এল। সব ব্যাপার শুনে মেরিডিথ ও রিংলার সম্মত হল, স্থির হল মেরিডিথ হবে জনের দোসর, রিংলার হবে দুবোয়ার দোসর। আরও স্থির হল যে আগামীকাল খুব ভোরে বির্জিতলার দিঘিটার কাছে নির্জনে দ্বন্দ্বযুদ্ধ হবে, বারো গজ দূর থেকে দুজনে পর পর দুটো পিস্তলের গুলি ছুঁড়বে, জন আগে ছুঁড়বে, দুবোয়া তার পরে। আর ঘটনার আগে পর্যন্ত সমস্ত ব্যাপারটা গোপন রাখবার প্রতিশ্রুতি দিল সকলে।
দুবোয়া হেসে বলল, বির্জিতলার মস্ত গুণ এই যে কাছেই প্রেসিডেন্সি হাসপাতাল। মেরিডিথ বলল, আশা করি সেখানে কারও যাওয়ার প্রয়োজন হবে না।
নিশ্চয়ই নয়, নিশ্চয়ই নয়, বলে দুবোয়া চারটে সিগারেট বের করল। জন প্রত্যাখ্যান করে বলল, ধন্যবাদ।
দুবোয়ার এই আচরণের কারণ কি? কেবলই কি সামাজিক প্রথা রক্ষা, না জন ও কেটির যে পূর্ব-সম্বন্ধ কখনও কখনও খচ খচ করে বেঁধে দুবোয়ার বুকে, সেই কাঁটাটি উৎপাটন করে ফেলবার ইচছা? কিন্তু তাই বা কেমন করে বলি? সে তো জানত না। যে জন ফরসীর নল ঘন করে এমন সুযোগ দেবে। দুবোয়া সেই শ্রেণীর সৌভাগ্যবান, সুযোগ এগিয়ে এসে যাদের কাছে ধরা দেয়। মানুষ সুযোগের সন্ধানে থাকে, আর সুযোগ থাকে শয়তানের সন্ধানে।
.
ওরা অবশ্য ভাবল যে ঘটনাটি গোপন রাখবে কিন্তু গোপন থাকল না। লিজা নারীসুলভ স্বভাবগত সন্দেহপরায়ণতায় সমস্ত বিষয়টা আঁচে আন্দাজে অনুমান করে নিল। অবশ্য কাউকে সন্দেহের কথা বলল না, একা একা সঙ্কটমোচনের চিন্তায় নিযুক্ত হল।
অনেক রাতে কার স্পর্শে জনের ঘুম ভেঙে গেল, সবিস্ময়ে সে দেখল আলো আঁধারিতে দাঁড়িয়ে আছে কেটি।
তবু সে শুধাল-কে?
কেটি বলল, চিনতে পারছ না জন? আমি কেটি।
ও, মাদাম দুবোযা!
না জন, আমি কেটি।
এতো রাতে কেন?
তোমার সঙ্গে কথা বলবার সুযোগ পাই নি, তাই।
কি কথা বলবে?
চল আমরা কোথাও পালিয়ে যাই।
এ রকম কথার জন্য জন প্রস্তুত ছিল না, সে চুপ করে রইল।
কেটি আবার বলল, বুঝলে না? চল এখনই আমরা কোথাও পালিয়ে যাই।
জন এবারে বলল, তা কি করে সম্ভব হয়। তা ছাড়া কাল সকালে আমার একটা কাজ আছে।
কি এমন কাজ?
কাজ যাই হক—কিন্তু ওটা পারব না, তুমি আমাকে মাপ কর।
রাতের যে অন্ধকার আকাশের সহস্র অশ্রুবিন্দুকে প্রকাশ করে, সেই অন্ধকারই কেটির সদ্যঃপাতী অশ্রুবিন্দু দুটিকে গোপন করে রাখল।
কিছুক্ষণ দুজনে নীরব থাকবার পর কেটি সহসা তাকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করে বলল, জন, আমি তোমাকে ভালবাসি।
জন নিজেকে বন্ধনমুক্ত করে নিয়ে বলল—কেটি, আমাকে দুর্বল কর না, তুমি যাও। এই বলে সে এক রকম জোর করেই তাকে বিদায় করে দিল।
তার পরে তার কি মনে হল জানি না, টেবিলের দেরাজ থেকে পিস্তল বের করে গুলি বের করে নিয়ে খালি পিস্তল রেখে দিয়ে বিছানায় এসে শুয়ে পড়ল, কিছুক্ষণের মধ্যেই পড়ল ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সে স্বপ্ন দেখল-দুবোয়ার সঙ্গে তার দ্বন্দ্বযুদ্ধ চলছে। দুবোয়া তাকে লক্ষ্য করে অব্যর্থ গুলি ছুঁডেছে—এমন সময়ে কোথা থেকে কেটি এসে বুক পেতে দাঁড়াল, গুলি তার বুকে লাগল। সে যেমনি কেটিকে তুলেছে, দেখল কেটি নয়, লিজা। সে ভাবল, লিজা কখন এল!
কিছুক্ষণ পরে লিজা ধীরপথে ঘরে ঢুকল। অতি সন্তর্পণে টেবিলের দেয়াজ খুলে পিস্তলটি বের করে নিয়ে দেখল চেম্বার শূন্য, তখন গুলি দিয়ে চেম্বার ভর্তি করে পিস্তলটি যথাস্থানে রেখে দিয়ে যেমন নিঃশব্দে এসেছিল, তেমনি নিঃশব্দে আবার প্রস্থান করল। জন কিছুই জানতে পেল না।
