কেটি স্বামীর বাচালতায় লজ্জিত হয়ে উঠেছিল, এবারে সে ভাব আরও ঘনীভূত হল, সে মাথা হেঁট করল।
দেখ ডাক্তার কেরী, তোমার শান্তিদূত কেমন নীরব ও নম্র।
তার পরে একটু থেমে বলল, কিন্তু রাত্রে বড় ঠোকরায়।
তার অশিষ্ট ইঙ্গিতে সকলে স্তম্ভিত হয়ে গেল।
শেষরক্ষার আশায় জর্জ বলল, ডাঃ কেরী স্থির করেছেন যে কলকাতাতেই স্থায়ী হয়ে বসে হিদেনদের মধ্যে প্রেমধর্ম প্রচার করবেন।
দুবোয়া বলল, ডাঃ কেরী যথার্থই আমার ব্রাদার-ইন-ল। কারণ আমিও অনেক বছর হল সুন্দরবনে প্রেমধর্ম প্রচার করছি, বিশেষ করে হিদেন নারীদের মধ্যে।
এই অসভ্য লোকটির দুঃসাহসে সকলে বিরক্ত হয়ে উঠেছিল, ভাবছিল কেউ যদি একটা সমুচিত উত্তর দেয় তো ভাল হয়।
মেরিডিথ বলল, তবে তো তোমার পক্ষে শান্তি-কপোত বাহুল্য।
স্বভাবসিদ্ধ মৃদুহাস্যে দুবোয়া বলল, আদৌ বাহুল্য নয়, পোষাপাখী দেখিয়ে বুনোপাখী ধরতে হয়, তা কি জান না?
মেরিডিথ বলল, তোমার উত্তি বড় অশিষ্ট।
বিস্ময়ের ভান করে দুবোয়া বলল, কি আশ্চর্য, ডিনার টেবিল তো গিঞ্জের বেদী নয় যে, সদুপদেশ বর্ষিত হবে।
তবু ভুললে চলে না যে, এখানে ভদ্রমহিলা আছে।
নইলে অশিষ্ট কথা বলায় আনন্দ কি? আর তাছাড়া অশিষ্ট কথাই বা কি এমন বলেছি। পড়তে ম ভলতেয়ারের Candide বইখানা, দেখতে অশিষ্ট কথা কাকে বলে।
কেরী বলল, তার চেয়ে হোলি বাইবেল কি ভাল নয়?
সোৎসাহে দুবোয়া বলে উঠল, নিশ্চয়, নিশ্চয়। সংস্ অব সলোমন অতি উপাদেয় রচনা–স্বয়ং ম ভলতেয়ারও ওর সীমা লঘন করতে পারেন নি।
সকলে বুঝল যে এই ফরাসী বাচাল কিছুতেই থামবে না। তাই সকলে আলাপের সূত্র ছেড়ে দিয়ে খাদ্য গ্রহণে অধিকতর মননিবেশ করল। নীরব টেবিল কাঁটা-চামচের নিক্কণে, সোডাবোতল খোলবার সশব্দ উচ্ছ্বাসে, মদ ঢালবার লোভনীয় আওয়াজে মুখর হয়ে উঠল।
একজন আন্দারের উদ্দেশ্যে বলল, আউর থোড়া বরিফ।
জর্জ স্মিথ বলল, বরফের প্রসঙ্গে একটা মজার ঘটনা মনে পড়ল, শুনলে তোমরা নিশ্চয় আনন্দ অনুভব করবে। সেদিন আমার হেড খানসামাকে বরফ বলেছিলাম। যতটা বরফ আনতে বলেছিলাম তার অর্ধেক মাত্র নিয়ে আসায় আমি বিস্মিত হলাম। শুধালাম, ব্যাপার কি, এতটুকু কেন? লোকটা অনেকদিন আমার কাছে আছে, কিছু কিছু ইংরেজী শিখেছে তার কথাগুলো তার বিচিত্র ইংরেজীতেই বলছি, ও-ইংরেজী একবার শুনলে ভোলবার নয়।
আমি শুধালাম-How is this?
সে বললে–Master, all make met.
Did you rap it well in the cloth?
No, Sahib, that make ice too muchee warm.
Did you close the basket?
No, Master, because that make ice more warm.
Then the ice had the full benefit of sun and air. Idiot!
ঘটনাটি শুনে সকলে হো হো করে হেসে উঠল।
হাসল না কেবল দুবোয়া।
মেরিডিথ বলল, মনে হচ্ছে দুবোয়ার কাছে ঘটনাটা বিচিত্র লাগে নি।
দুবোয়া বলল—সত্যি তাই। এ আর এমন বিচিত্র কি? মেয়েরাও ঐ বরফের মত, খুলে রাখলেও খোয়া যায়, ঢেকে রাখলেও খোয়া যায়। আলো হাওয়া আদায় করে নেয় নিজ নিজ প্রাপ্য, অবশেষে যখন ঘরে এসে পৌঁছয় হতভাগ্য স্বামী আধখানার বেশি পায় না।
কেটি বিরক্ত হয়ে বলে উঠল, তুমি আজ বড় বাড়াবাড়ি কবছ।
কিন্তু ফল হল উল্টো। মিসেস কেরী তাকে ধমক দিয়ে বলল-তুমি একরত্তি মেয়ে, ওকে শাসন করবার কে? ভদ্রসমাজের উপযুক্ত কথাবার্তা বলতে হবে তো, এ তো পাদ্রীর গৃহকারাগার নয়।
সকলের লজ্জিত নীরবতা।
কেবল দুবোয়া মিসেস কেরীকে লক্ষ্য করে বলে উঠল, mon chérc mon chére।
খানা শেষ হয়ে গিয়েছিল, টেবিল পরিষ্কার করে নেওয়া হল। আর সেই সঙ্গে প্রত্যেক কোবরদার ধূমায়িত ফরসী নিয়ে নিঃশব্দে প্রবেশ করে নিজ নিজ প্রভুর পিছনে দাঁড়াল, মেঝেতে একখণ্ড করে কার্পেট পেতে তার উপরে ফরসীটি স্থাপিত করে কুলায়িত নলের রুপোর মুখনলটি প্রভুর হাতে তুলে দিল। তখন ঘরময় কেবল অম্বুরী তামাকের সুগন্ধ আর গদগদ সুশ্রাব্য শব্দ। মহিলাদের এ ব্যবস্থা ছিল না। খুব সম্ভব তারা ঘরের আবহাওয়া থেকে মৌতাত সংগ্রহ করে।
সেকালে মহিলারা তামাক সেবন করত না বটে কিন্তু কখনও কোন পুরুষকে আপ্যায়িত করবার ইচ্ছা হলে তার কাছ থেকে নলটি চেয়ে নিয়ে দু-চার টান দিত। কেটি, লিজা ও অন্যান্য মহিলারা সে রকম ইচ্ছা প্রকাশ করল না। কিন্তু মিসেস কেরীর কথা স্বতন্ত্র। ডিয়ার ব্রাদার-ইন-ল’কে আপ্যায়িত করবার উদ্দেশ্যে মুখনলটি চেয়ে নিয়ে এক টান দিয়েই সে এক কাণ্ড করে বসল। কাসতে কাসতে দম বন্ধ হয়ে মৃতি-প্রায় অবস্থায় সে ঢলে পড়ল দুবোয়ার কাঁধের উপরে। ব্যস্তসমস্ত হয়ে জন ফুটল স্মেলিং সল্ট-এর শিশির উদ্দেশে। যখন শিশিটি নিয়ে সে ফিরল, ডরোথি তখন লব্ধসম্বিৎ। তাড়াতাড়িতে নিজের চেয়ারে বসতে গিয়ে জন ডিঙিয়ে ফেলল দুবোয়ার ফরসীর নল। ব্যাপারটা অনেকেরই চোখে পড়ল, জনের চোখে প্রকাশ পেল লজ্জা ও দুঃখ, দুবোয়ার চোখে রোষ ও বিস্ময়। উপস্থিত সকলে প্রমাদ গুনল। কিন্তু কেবল এক পলকের জনা মাত্র দুবোয়ার ভাবান্তর ঘটেছিল, পলকপাতে তার মুখে ফুটে উঠল অত্যন্ত রেশমী হাসি, চোখে দেখা দিল অভ্যস্ত কৌতুককণিকা। সে জনকে টেনে নিয়ে পাশে বসাল। সকলে ভাবল, যাক, সঙ্কট কেটে গেল।
