কেরী বিলাতে থাকতে শুনেছিল যে গ্রীষ্মপ্রধান ভারতে শ্বেতাঙ্গদের ক্ষুধা-তৃষ্ণা একবারে লোপ পায়, তারা কেবল জলবায়ু ও কৃষ্ণাঙ্গদের মঙ্গলসাধন-সঙ্কলের উপরে নির্ভর করে জীবনধারণ করে। কিন্তু এ-কয়দিন সে যা দেখেছে ও শুনেছে তাতে ঠিক পূর্বশ্রুতির সমর্থন পায় নি। আর এখন এই ভরদুপুরে গ্রীষ্মমণ্ডলের সূর্য যখন মাথার উপরে তখন এতগুলি শ্বেতাঙ্গ নরনারী টেবিলের উপরে স্থূপীকৃত আহার্য সম্বন্ধে প্রচ্ছন্ন ও প্রকট যে আগ্রহ প্রকাশ করতে লাগল, তাতে কেরীর বুঝতে কষ্ট হল না যে, দ্বৈপায়ন ভ্রাতা-ভগ্নীগণের আভ্যন্তরীণ আর যে শক্তিই হ্রাস পেয়ে থাকুক জঠরেন্দ্রিয় স্ব-মাহায্যে অটুট আছে। কেরী এক নজরে টেবিলের আগাগোড়া জরিপ করে নিল-খাদ্যের বৈচিত্র্য ও পরিমাণ সত্যই বিস্ময়কর। সুপ, রোস্ট ফাউল, কারি রাইস, মটন পাই, ফোরকোয়ার্টার অব ল্যাম্ব, রাইস পুডিং, টার্ট, চীজ, টাটকা মাখন, টাটকা রুটি….
কেরী দেখল তালিকার এখানেই শেষ নয়, অজ্ঞাত ও পরিজ্ঞাতনামা বিচিত্র মৎস্য, আর সর্বোপরি প্রকাণ্ড রজতপাত্রে রক্ষিত শ্বেতাঙ্গ-সমাজের অতি প্রিয় ‘Burdwan stew” নামে খাদ্য।
আর সর্বশেষে আছে কেরী ভাবল, সর্বশেষেই বা কেন, ও বন্ধু তো আদিতে অন্তে মধ্যে, সর্বক্ষণ ও সর্বত্র আছে—উঁচু নীচু, ছোট বড়, স্থূল ও সূক্ষ্ম বিচিত্র বোতলাধারে মেডিরা, ক্যারেট, বিয়ার, বী-হাইভ ও হেনেসি ব্রাণ্ডি!
অদূরে দরজার পাশে আর একখানা ছোট টেবিলে সারিবদ্ধ সোডা-ওয়াটারের বোতল, কাছেই উদ্যত ক্ষিপ্রহস্ত চার-পাঁচজন আবদার বিখ্যাত লাল শরাব প্রস্তুত করছে। কেরী শুনেছিল যে, প্রবাস-দুঃখ ভোলবার মস্ত একটা উপায় Loll Shrub পান।
আনুষ্ঠানিক ভোজসভা কেরীর অভিজ্ঞতায় এই প্রথম। এই প্রভূত খাদ্য, অথচ খাদক মাত্র বারো-চৌদ্দজন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই যখন ক্ষীণাঙ্গী কেটিকে আড়াই পাউন্ড চপ আত্মসাৎ করতে দেখল, তখন খাদ্যের পরিণাম সম্বন্ধে তার মনে যে বৃথা দুশ্চিন্তা। দেখা দিয়েছিল, তা অপগত হল–আর সেই সঙ্গে বুঝল সুন্দরবনের জলহাওয়া স্বাস্থ্যের বিশেষ অনুকুল। কিন্তু তার সব চেয়ে বিস্ময়ের কারণ হল চাকরবাকরদের ব্যবহার। গৃহস্বামী ও অভ্যাগতদের ভৃত্যদের মিলিত সংখ্যা কম পক্ষে শতাধিক। কিন্তু এই একশ লোক কখন যে নীরবে ডাইনিং রুমে ও ডাইনিং রুমের বাইরে স্ব স্ব নির্দিষ্ট স্থান গ্রহণ করেছে, তা সে টেরও পায় নি। এমন শিক্ষা, এমন অভ্যাস, এমন কর্তব্যপরতা সৈন্যবাহিনীতেও দেখা যায় না। কেরী দেখল যে প্রত্যেক ভোস্তার পিছনে জন দুইতিন ভৃত্য দণ্ডায়মান, তন্মধ্যে একজন একখানা চামর দোলাচ্ছে—উদ্দেশ্য মক্ষিকা বিতাড়ন। মক্ষিকার অভাব হলেও প্রথারক্ষা অনিবার্য, নইলে তার চাকুরি থাকবে না।
তার পর বৃদ্ধ জর্জের ইঙ্গিতে ক্ষিপ্রহস্ত নীরবচরণ বাবুর্চির দল চঞ্চল হয়ে উঠল, আদারগণ কর্তৃক পরিবেশিত Loll Shrub বিস্ময় ও বাহবার উদ্রেক করল, আর সোডার সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে ফেনায়িত সুরা দর্শনে, স্পর্শনে, ঘ্রাণে ও স্বাদে পঞ্চেন্দ্রিয়ের তৃপ্তিসাধনে লেগে গেল। সেই সঙ্গে শুরু হল কাঁটা চামচ ও ছুরির টুংটাং নিক্কণ।
দুবোয়া ও কেটির কাহিনী কলকাতার শ্বেতাঙ্গ সমাজ শুনেছিল, অতিথিরাও জানত; কাজেই সকলেই মনে মনে অস্বস্তি বোধ করছিল, ভাবছিল কথাবার্তা কোথা থেকে শুরু করা যাবে। এমন সময়ে সকলের সব সমস্যার অবসান ঘটাল স্বয়ং মশিয়ে দুবোয়া। দুবোয়া অতিশয় ধূর্ত, অল্পক্ষণের মধ্যেই অথিতিদের অসাড়তার কারণ সে বুঝে নিয়েছিল—তাই সমস্ত আবহাওয়াটাকে নাড়া দেবার উদ্দেশ্যে আরম্ভ করল–ভলতেয়ার বলে গেছেন, আবহাওয়া সৃষ্টির দুটো উদ্দেশ্য, একটা হচ্ছে জীবের প্রাণরক্ষা, আর একটা হচ্ছে সামাজিক সৌজন্য রক্ষা।
মেরিডিথ বলল, সে আবার কেমন?
আবহাওয়া তত্ত্ব দিযে কথোপকথন শুরু করা যায়।
কেউ কেউ হাসল।
মেরিডিথ আবার বলল, শুনেছি যে তোমার ম ভলতেয়ার ভগবান মানে না, তবে আবহাওয়া সৃষ্টি করল কে?
দুবোয়া দুই কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে স্মিতবিকশিত মুখে অবাধে বলল—The other fellow!
টেবিলসুদ্ধ সবাই বিস্ময়ে ক্রোধে লজ্জায় সমস্বরে বিরক্তিসূচক অব্যক্ত ধ্বনি করল। কেরী ও টমাস বুকে ক্রস-চিহ্ন অঙ্কন করল, কেবল মিসেস কেরী বুঝে উঠল না যে ব্যাপারটা কি ঘটল—সে মূঢ়ের মত একবার দুবোয়ার একবার কেটির মুখে বৃথা অর্থ সন্ধান করে বুঝল যে এই কঠিন সমস্যার তুলনায় Burdwan stew অনেক বেশি তরল আর অনেক বেশি সুপেয়। সে বেশ খানিকটা নিজের প্লেটে ঢেলে নিল।
জর্জ স্মিথ অবাঞ্ছিত আলাপের প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দেবার উদ্দেশ্যে দুবোয়াকে লক্ষ্য করে বলল, ম দুবোয়া, তোমার সঙ্গে এখনও ডাঃ কেরীর পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় নি। ডাঃ কেরী এসেছেন এদেশে খ্রীষ্টধর্ম প্রচার করবার আশা নিয়ে।
উপবিষ্ট অবস্থায় যতটুকু ‘বাউ’ করা যায় তেমনি একটা ভঙ্গী কেরীর প্রতি করে দুবোয়া বলল, বিলক্ষণ। যদিও ব্যক্তিগতভাবে ডাঃ কেরীর সঙ্গে আমার এখনও আলাপ হয় নি, কিন্তু ওঁর কথা যথেষ্ট শুনেছি আর ইতিমধ্যেই বুঝে নিয়েছি যে, খ্রীষ্টধর্ম প্রচারে ডাক্তার সফলকাম হবেন।
কেরী কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তাকাল দুবোয়ার দিকে। দুবোয়া নিজ উক্তির ভাষ্যস্বরুপ বলল, ডাক্তার কেরী আনীত শান্তির কপোত এসেই বাসা বেঁধেছে আমার গৃহে—এই বলে সে কেটিকে দেখিয়ে দিল।
