ফরাসী শয়তান! জন ভাবে অভিধাটা একেবারে নিরর্থক নয়, যে ব্যক্তি শত গঞ্জনাতেও রাগে না, সব অবস্থাতেই মুখে হাসি ফুটিয়ে রাখতে পারে শয়তান ছাড়া সে আর কি? ফরাসী শয়তান আর তার গুরু ম ভলতেয়ার। ভলতেয়ারের একখানা ছবি জন দেখেছিল—মুখমণ্ডলের সমস্তটাই যেন একটা নিশ্চল বিদ্রুপের হাসি। সেই থেকে জনের মনে শয়তান ও হাসিতে একটা নিত্যসম্বন্ধ দাঁড়িয়ে গিয়েছিল সে ধারণা দৃঢ়তর হল দুবোয়াকে দেখে। ফরাসী শয়তান! শেষে কিনা তারই ভাগে পড়ল ঐ সোনার আপেলটা!
সোনার আপল শুনে লিজা রেগে উঠে বলে—তোমার মাথা খারাপ হয়েছে। মাকাল ফল, মাকাল ফল!
না লিজা, তুমি অবিচার করছ।
এ তর্কের আর শেষ হয় না। এমন সময়ে বাইরে চাকার শব্দ শুনে উঁকি মেরে দেখেই লিজা বলে উঠল—ঐ নাও, তোমার ফরাসী শয়তান এসেছে।
জনের মুখে আশাভঙ্গের পলাতক ছায়া দেখে লিজা বাক্যটা সম্পূর্ণ করল—সঙ্গে তোমার সোনার আপেলটিও এসেছে, ভয় নেই।
আশাভঙ্গের ছায়া অপসারিত হতেই অজ্ঞাত একপ্রকার ভয়ের ছায়ায় জনের মুখ এক লহমার জন্য পাণ্ডুবর্ণ হয়ে গেল, কিন্তু পরমুহূর্তেই জোর করে হাসি টেনে এনে বলল, চল লিজা, অভ্যর্থনা করি গে।
লিজা বলল, চল।
জন দেখল, লিজার মুখে শিষ্ট হাসির মুখোশ। লিজা দেখল, জনের মুখেও মুখখাশখানা শিষ্ট হাসির বটে, কিন্তু দু-একটা সাচ্চা মুক্তো যেন চোখের কোণে আভাসিত।
ভাইবোন ছুটে গিয়ে দুবোয়া দম্পতিকে অভ্যর্থনা করে নামাল, বলল–আমাদের পরম সৌভাগ্য যে তোমরা এসেছ।
কেটিকে কিছু বলবার সুযোগ না দিয়ে আগাগোড়া মুখমণ্ডল সলজ্জ বিনম্র জামাতৃসুলভ হাসিতে বিমণ্ডিত করে দুবোয়া বলল, সে কি কথা। আমাদের আগেই আসা উচিত ছিল, তবে কিনা মাদাম দুবোয়াকে নিয়ে সুন্দরবনের দর্শনীয় স্থানগুলো দেখাতে ব্যস্ত ছিলাম। মাদাম বনটা দেখে খুব খুশি হয়েছে, বনটির নতুন নামকরণ করেছে—ফরেস্ট অব বিউটিফুল উইমেন।
জন ও লিজা নিমেষের জন্য পরস্পরের দিকে তাকাল, তার পর একসঙ্গে কেটির দিকে। কেটি চকিতে দৃষ্টি সরিয়ে নিল অন্যদিকে।
লিজাকে প্রশংসা করবার উদ্দেশ্যে দুবোয়া বলল, এখন দেখছি এ শহরটিও সুন্দর শহর হয়ে উঠেছে-টাউন অব বিউটিফুল উওম্যান।
লিজার কানের ডগা লাল হয়ে উঠল—ক্রোধে। সে ভাবল, আমি আদেখলে মেয়ে নই।
মুখ বলল, চল তোমাদের মিসেস কেরীর ঘরে নিয়ে যাই, সে খুব ব্যস্ত হয়ে অপেক্ষা করছে।
মিসেস কেরী নিজ প্রকোষ্ঠের নিভৃতে একাকী বসে প্রাকডিনার ক্ষুধোদ্রেক-চেষ্টায় খান-দুই চপ ভোজন করছিল, এমন সময়ে তাদের ঘরে ঢুকতে দেখেই ‘ও মাই ডারলিং’, ও মাই ব্রাদার-ইন-ল’ বলে সখেদে চীৎকার করে উঠে বিনা ভূমিকায় মূৰ্ছিত হয়ে পড়ল।
এখন তার ঘন ঘন মূছায় আর কেউ ভয় পায় না, কেটি তো আগে থেকেই অভ্যস্ত। যথাসময়ে মুহাভঙ্গের অপেক্ষায় সকলে বসে রইল।
দুবোয়া বলে উঠল, মিসেস কেরী আমার ডিয়ার সিস্টার-ইন-ল না হলে ভাবতাম চপের ভাগ দেবার আশঙ্কাতেই মুহাটি ঘটল।
কেটি বলল, এমন করে বলা তোমার অন্যায়।
সে হেসে মৃদুস্বরে বলল, আমার সাধ্য কি এমন কৌতুকজনক সত্য কথা বলি–এ হচ্ছে গিয়ে ম ভলতেয়ারের উক্তি। তুমি নিশ্চয়ই জান তার নাম? বলে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল জনের দিকে।
দুবোয়ার গলার স্বরটি বিচিত্র, খুব দামী অথচ ব্যবহৃত রেশমের কাপড়ে বাতাস লাগলে যেমন একপ্রকার মৃদু মসৃণ শব্দ ওঠে, অনেকটা তেমনি।
মিসেস কেরীর মূছা ও মূহুভঙ্গ দুটোই সমান আকস্মিক। যেমন হঠাৎ সে মূৰ্হিত হয়ে পড়েছিল তেমনি হঠাৎ তার মূর্হভঙ্গ হল—আর উঠে বসেই দুই বাহুতে কেটি ও দুবোয়াকে জড়িয়ে ধরে গদগদ কণ্ঠে ‘মাই ডিয়ার সিস্টার’ ‘মাই ডিয়ার ব্রাদার’ বলে অবিরল অশ্রুপাত শুরু করে দিল। কেটি অপ্রস্তুতভাবে নতমুখে বসে রইল, কিন্তু দুবোয়া সংসারে অপ্রস্তুত হওয়ার জন্যে জন্মায় নি, ‘mon chere, mon chere’ বলতে বলতে সেও অশ্রুধারা খুলে দিল।
পারিবারিক অশ্লবর্ষণের মধ্যে আর থাকা উচিত নয় মনে করে জন ও লিজা সরে পড়ল। বলল, আমরা খাওয়ার ব্যবস্থা দেখি গে।
বেরিয়ে এসে লিজা বলল, জন, ওরা কি কান্নার জোলাপ খেয়েছে নাকি?
জন বলল, চল দেখি গে ওদিকের কতদূর কি হল।
.
প্রকাণ্ড ডাইনিংটেবিল ঘিরে অতিথিদের নিয়ে বৃদ্ধ জর্জ স্মিথ ভোজনে বসেছে। মিসেস কেরী দুপাশে বসিয়েহে কেটি আর দুবোয়াকে, মুহাভঙ্গে সে যে ওদের বগলদাবা করেছিল—এখনও ছাড়ে নি, মুহূর্তে অচ্ছেদ্যসঙ্গী করে তুলেছে। জজ দুপাশে কেরী ও টমাসকে নিয়ে বসল। দুবোয়া এমনি নির্লজ্জ যে জনের হাজার আপত্তি সত্ত্বেও তাকে পাকড়াও করে পাশে বসাল, বলল, মিঃ স্মিথ, তুমি হচ্ছ শুভসূচনার দূত। জনের ইহা হল তার নাকে একটা প্রবল ঘুষি বসিয়ে দেয়—কিন্তু অতিথি, তাই ‘শুভসূচনার দূত’কে স্বয়ং শয়তানের দূতের পাশে স্থান গ্রহণ করতে হল। কেটি চেষ্টা করেছিল লিজাকে পাশে বসাবে, কিন্তু সে কাজের অছিলা দেখিয়ে ছিটকে গিয়ে মেরিডিথ ও রিংলার নামে দুইজন পরিচিত বন্ধুর মাঝখানে আসন গ্রহণ করল। তার আসন-গ্রহণের তাৎপর্য অনুমান করে কেটি হাসল। লিজা মনে মনে বলল, মাদাম টাইগার, তুমি অধঃপাতে যাও। ইতিমধ্যেই সে মনে মনে সুন্দরবন-নিবাসী দুবোয়া দম্পতির নামকরণ করে ফেলেছে মশিয়ে ও মাদাম টাইগার।
