কেরী বলল, তুমি শান্ত হও, আমি যাচ্ছি।
ডয়োথির অভিপ্রায় কানা-ঘুষায় স্মিথ পরিবারের কানে উঠতে লিজা চাপা অর্জনে বলল, না, তা কখনও সম্ভব নয়।
পিতা একবার মেয়ের একবার পুত্রের মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইল।
জন বলে উঠল, কেন সম্ভব নয় লিজা? ওঁরা পিতার অতিথি, ওঁদের অসম্মান হলে পিতার অপমান; নিশ্চয়ই নিমন্ত্রণ করতে হবে মি: ও মিসেস দুবোয়াকে।
কৃতজ্ঞ পিতা জনের করমর্দন করে বলল, থ্যাঙ্কস জন! ইউ আর এ ব্রেভ ফেলো।
ওদের নিমন্ত্রণ করাই স্থির হল।
লিজা চাপা স্বরে বলল, ডাইনী বুড়িটা! মরেও না!
সেকালের কলকাতার শ্বেতাঙ্গ সমাজে মোটের উপর তিনটি জাত ছিল। উৎসব ব্যসন উপলক্ষে গভর্নরের কুঠিতে যারা নিমন্ত্রণ পেত—এই বিচিত্র বর্ণাশ্রমসমাজের তারা উচ্চতম থাক। যাদের উৎসব ব্যসনের অনুষ্ঠান হত টাউন হলে অর্থাৎ মেয়রের আদালত নামে পরিচিত অট্টালিকায় তারা মাঝারি থাক। আর একেবারে নিম্নতম থাকের উৎসবাদির নির্দিষ্ট কোন স্থান ছিল না। অল্প মাশুলের কোন ট্যাভার্নে তারা মিলিত হত। সামাজিক ব্যাপারে শেষোক্তদের উচ্চতম ও মাঝারি থাকে প্রবেশ ছিল নিষিদ্ধ। প্রয়োজন। হলে অর্থাৎ নিমন্ত্রণস্থলে এরা সামাজিক মর্যাদাহীন ধনী নেটিভদের বাড়িতেও পদার্পণ করত।
নীলু দত্তর বাগানবাড়িতে এদেরই আমরা দেখেছিলাম। উচ্চতম থাকের শ্বেতাঙ্গগণ উচ্চতম থাকের ‘নেটিভ’দের বাড়িতে যেত। ক্লাইভ, ওয়ারেন হেস্টিংস প্রভৃতি সকলেই মহারাজা নবকৃষ্ণ বাহাদুরের বাড়িতে পদধূলি দিয়েছে।
স্মিথ পরিবার মাঝারি থাকের শ্বেতাঙ্গ, তাদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধবও মাঝারি থাকভুক্ত, স্মিথদের মত অধিকাংশই ব্যবসায়ী। এরাই স্মিথদের নিমন্ত্রিত।
আর নিমন্ত্রণ করে পাঠানো হল মশিয়ে ও মাদাম দুবোয়াকে। স্মিথদের আশা ছিল দুবোয়ারা আসবে না।
জর্জ বলল, তুমি চঞ্চল হয়ো না লিজি, ওরা কখনও আসবে না।
লিজা হেসে বলল, বাবা, তুমি নিতান্ত সেকেলে লোক, কিছু জান না, ওরা নিশ্চয়ই আসবে।
জন বলল, ক্ষতি কি, আসবে আশা করেই তো লোকে নিমন্ত্রণ করে।
লিজা বিরক্ত হয়ে বলল, জন, তুমি চুপ কর। একটা অপরিচিত নবাগন্তুককে নিয়ে মাতামাতি করেই তুমি এই বিপদটি বাধিয়েছ।
কন্যার অভিযোগে পুত্রের ব্যথিত মুখ দেখে পিতার কষ্ট হল, সে বলল, এ তোমার অন্যায় লিজি, কেটিকে তো মন্দ বলে মনে হয় না।
ঝাঁজিয়ে উঠে লিজা বলল, না, মন্দ বলে মনে হয় না! ও একটি চাপা শয়তান। আমি লক্ষ্য করেছি ব্রুনেট মেয়েগুলো কখখনো ভাল হয় না।
লিজা নিজে ব্লণ্ড।
অপ্রীতিকর প্রসঙ্গ চাপা দেবার উদ্দেশ্যে পিতা বলল, উচিত মনে করলে আসবে, এলে আমরা শিষ্ট ব্যবহার করতে ভুলব না।
প্রসঙ্গটা এখানেই চাপা পড়ল, কিন্তু লিজা বুঝে নিল যে জনের মনে কেটির আসন আজও শূন্য হয় নি। ভাবল, এখন ভালয়-ভালয় নিমন্ত্রণ ব্যাপারটা চুকে গেলে হয়।
পুরুষের চোখ সৃষ্টি করেছেন বিধাতা বৃহৎ বস্তু দেখবার উদ্দেশ্যে, মেয়েদের চোখের সৃষ্টি সূক্ষ্ম দর্শনের নিমিত্ত। আদমের চোখ দেখেছিল আস্ত আপেল গাছটাকে, ইভের চোখ পড়ল গিয়ে কিনা তার ঐ ছোট্ট ফলটায়।
বেলা দুটোয় ডিনার। সেদিন কি-একটা ছুটি ছিল তাই ঘণ্টা-দুই আগে থেকে নিমন্ত্রিতদের অভ্যাগম শুরু হল। ক্ৰমে ফিটন, বুহাম, ব্রাউনবেরি নানা শ্রেণীর শকটে স্মিথদের বাড়ির প্রকাণ্ড হাতা ভরে উঠল। অধিকাংশই এল সস্ত্রীক, যদিচ অবিবাহিত এককের সংখ্যাও অল্প নয়। একক হক আর যুগল হক প্রত্যেকের সঙ্গে এল খানসামা, সরদার, হুঁকোবরদারের ছোট্ট একটি বাহিনী।
জর্জ, জন ও এলিজাবেথ অতিথিদের অভ্যর্থনা করে নিয়ে বসাতে লাগল ড্রয়িংরুমে; তার পর চলল কেরী পরিবারের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় করিয়ে দেবার পালা। টমাস পুরনো বাসিন্দা, প্রায় সকলেরই পরিচিত।
জন ও লিজা যথারীতি অতিথিদের পরিচর্যা করছিল বটে, কিন্তু দুজনারই মনে একটা উগ্র চিন্তা সমস্তক্ষণ ঠেলা মারছিল। সস্ত্রীক দুবোয়া কি সত্যিই আসবে? লিজা ভাবছিল ভদ্রতার খাতিরে দুবোয়া এলেও আসতে পারে, কিন্তু কেটি নিশ্চয় এমন নির্লজ হবে।
যে আসবে! জনের মনেও ঐ চিন্তা ছিল একটু ভিন্ন আকারে। যদি তারা না আসে? সেটা খুব ভাল হয়, স্বস্তি পাওয়া যায়। কিন্তু তখনই আবার কেমন একটুখানি আশাভঙ্গের খোঁচা অনুভব করে জন। সত্যি কি আসবে না? কেন, না আসবার কি কারণ? কিন্তু যদি আসে, কি রকম ব্যবহার সে করবে ওদের সঙ্গে, মানে কেটির সঙ্গে? লিজা বলেছিল যে, কেটি তার সঙ্গে অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করেছে; কিন্তু সেজন্য কেটিকে দায়ী করতে জনের মন সরে না। ওর কি দোষ? লিজা বলে, কেটি সোনা ফেলে কাচ বেছে নিয়েছে। কিন্তু সংসারের সহস্র বিভ্রান্তির মধ্যে সোনা ও কাচ বাছা কি সব সময়ে সম্ভব? কেটির পক্ষে জনের ওকালতিতে লিজা রাগ করে বলে, তুমি কাপুরুষ। জন মুখে না বললেও মনে মনে ভাবে ঐ কাপুরুষের মধ্যেই যে আছে পুরুষ। পুরুষ ভালবাসতে পারে, রাগ করতে পারে, কিন্তু একবারে নির্লিপ্ত হয় কিভাবে? কেটিকে কখনও কখনও সে মনে মনে দোষ দিয়েছে বটে, কিন্তু পরমুহূর্তেই হয়েছে ঠিক উল্টো প্রতিক্রিয়া-অধিকতর আকর্ষণ অনুভব করেছে তার প্রতি। লিজা বলে, আসল দোষ কেটির—জন বলে, না, দুবোয়ার। লিজা বলে, দুবোয়ার কি দোষ? বনের মধ্যে থাকে, সাতজন্মে সাদা মেয়ে দেখতে পায় না, যেমনি কেটিকে দেখেছে টুপ করে গিলেছে—তার দোষটা কি। কিন্তু ধন্য ঐ কেটিকে, শেষে কিনা আত্মসমর্পণ করল একটা ফরাসী শয়তানের কাছে।
