এই বলে যথাসাধ্য ফিরিঙ্গি রমণীর সাজে সজ্জিত হয়ে সে গিয়ে দাঁড়াল প্রমদার কাছে। অমনি প্রমদা তার কোমর জড়িয়ে ধরে পূর্ণোদ্যমে ঘুরপাক খেয়ে শুরু করে দিল বলডান্সের প্রবল অনুকরণ।
তবলচি ও বাজিয়েরা অনেকক্ষণ চলে গিয়েছিল, তাই টুশকি বলে উঠল, বাজনা
হলে কি ভাই নাচ জমে!
কিন্তু শীঘ্রই সে দুঃখ দূর হল। ঘরের ভিতর কি চলছে দেখবার জন্যে চাকর বাকরের দল প্রবেশ করে সোন্নাসে চীৎকার করে উঠল-‘বাঃ বিবিসাহেব বেশ’, ‘খালা’, ‘খুবসুরত’, ‘আর ছুরি মারিসনে পাগলি’, ‘কেটে দে মা বদর বেরিয়ে যাক’!
টুশকি বললে, শুধু বাহবা দিলেই হয় না, বাজনার যোগাড় কর।
অমনি তারা হাতের কাছে যা পেল বোতল, গেলাস, প্লেট, চেয়ারের হাতল, টেবিলের পাটাতন–বাজাতে শুরু করল।
ক্রমে নাচ জমে উঠল। তখন একজন বলে উঠল, একটা গান হলে বেশ জমত।
টুশকি বলল, জমত তো গাও না কেন, মিছে ষাঁড়ের মত চেঁচাচ্ছ কেন?
ঠিক বলেছ প্রাণ আমার! বলে সে ধরল–
“দেখো মেরি জান
কোম্পানি নিশান।
বিবি গিয়া দমদম
উড়া হ্যায় নিশান।
বড়া সাহেব ছোটা সাহেব
বাঁকা কাপতান,
দেখো মেরি জান
লিয়া হ্যায় নিশান।”
এবারে আর কোন অঙ্গের অভাব রইল না-নৃত্য, বাদ্য, গীত সবেগে সরবে সোৎসাহে চলল—মদের গন্ধ ও পোড় মোমের গন্ধে ঠাসা সেই অর্ধস্তিমিত নাচঘরের অর্ধরাত্রির প্রহরে। এখানেই এ পালার সমাপ্তি ঘটলে যথেষ্ট হল বলা চলত, কিন্তু না, কৌতুকময় জাদুকরের টুপির মধ্যে আরও কিছু কৌতুক সঞ্চিত ছিল।
ক্ষণিক নাচের বিশ্রামের অবকাশে রহিমা ও প্রমদা সাহেবী কণ্ঠের অনুকরণ শুরু করল–
আবদা পেগ লাও।
নেহি নেহি ছোটা পেগ নেহি,
বড়া পেগ।
একদম ওয়ারেন হস্তিনকা হস্তিনীকা মাফিক বড়া পেগ।
তাদের দৃষ্টান্তে সকলেই যথাসাধ্য সাহেব বিবির জীবনযাত্রার অনুকরণ শুরু করে দিল—আর প্রত্যেক উক্তির শেষে হাসির হররায় ছাদের কড়িকাঠগুলো কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল।
এমন সময় গর্জন উঠল-কৌন হ্যায় রে বদমাশ!
সকলে সচকিত হয়ে ভাবল, এ তো নকল সাহেবী কণ্ঠ নয়, একবারে খাঁটি বিলিতি জিনিস!
শীঘ্রই তাদের সন্দেহ সমূলে দূর করে কৌচের অন্তরাল থেকে মাথা তুলল মিঃ জনসন। হেনেসি ব্রান্ডির কৃপায় কৌচের আড়ালে ধরাশায়ী মিঃ জনসন এতক্ষণ কারও চোখে পড়ে নি।
জনসনের রসভঙ্গকর আবির্ভাবে সকলে সন্ত্রস্ত হয়ে যথাসম্ভব বিনীতভাবে দাঁড়াল।
কিন্তু তাতে জনবুলী উম্মা কমবার লক্ষণ দেখা গেল না। তিন-চার বার চেষ্টার পর সে পদস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে সাচ্চা জনবুলী কণ্ঠ ও ভাষা ছুটিয়ে দিল-You bastards, you blackies, you rascals! You insult Britons! But…but–
একটা শূন্য মদের বোতল কুড়িয়ে নিয়ে ফুসফুসের তাবৎ প্রশ্বাস প্রয়োগে গর্জন করে উঠল—Rule Britannia, Britannia rules the waves!
আর সেই সঙ্গে শুন্য মদের বোতল গদার মত ঘোরাতে ঘোরাতে ব্রিটনসন্তান গণের অপমানকারীদের উদ্দেশে সে ছুটল-But, but, Britons never shall….
কিন্তু ব্রিটনগণের সঙ্কল্প প্রকাশের সুযোগ হল না, তৎপূর্বেই জনসন সশব্দে মেঝেতে পড়ল, বোতলটা শতখঙ হয়ে দর্শকদের গায়ে এসে লাগল। মহৎ সঙ্করের এমন আকস্মিক পতন কদাচিৎ দৃষ্ট হয়।
খুন হল, খুন হল-বলে সবাই হল্লা করে উঠল।
শব্দে আকৃষ্ট হয়ে নীল দত্ত ঘরে ঢুকে বলল, তাই বল, জনসন সাহেব এখানে! যাও সবাই মিলে ওকে গাড়িতে তুলে দাও, ওর কোচম্যান বড় ভাবিত হয়ে উঠেছে।
তখন নীলু দত্তর অনুচরগণ সমুদ্রশাসনদক্ষ ব্রিটন-সন্তানকে ধরাধরি করে গাড়ির উদ্দেশে নিয়ে চলল।
.
১.১৮ ডিনার ও ডুএল
কেরীদের মানিকতলার বাড়িতে যাওয়ার সঙ্কল্প জানতে পেরে জর্জ স্মিথ স্থির করল যে বিদায়ের আগে একদিন বড় রকমের একটি ভোগের অনুষ্ঠান করবে। জন ও এলিজাবেথ পিতাকে সমর্থন করল, বলল, এই উপলক্ষে আমাদের পরিবারের বন্ধু বান্ধবদের নিমন্ত্রণ করা যাবে, তাদের সঙ্গে কেরী-পরিবারের পরিচয় করিয়ে দেবার এ সুযোগ ছাড়া যায় না। কাজেই পিতা পুত্র ও কন্যা তিনজনে আসন্ন ভোজের আয়োজনে লেগে গেল এবং কেরীদের কথাটা জানিয়ে দিল। কেরী বলল, আপনাদের অযাচিত বন্ধুত্বের ফলেই আমাদের বিদেশ-বাসের প্রথম পর্বটা সুসহ হয়েছে, আপনাদের কোন সঙ্কল্পে আমি বাধা দিতে চাই নে।
কিন্তু সঙ্কট বাধিয়ে দিল মিসেস কেরী। সে জেদ ধরে বসল, ভোজে কেটি ও তার স্বামীকে নিমন্ত্রণ করতে হবে।
বিস্মিত কেরী বলল, সে কি করে সম্ভব!
কেন সম্ভব নয়? ওদের তো রীতিমত বিয়ে হয়েছে। শুধু তাই নয়, মিঃ দুবোয়া খুব ভদ্রলোক, পাছে আমাদের মনে সন্দেহ থেকে যায় তাই সে বিবাহের রেজিস্ট্রিপত্রের যথাযথ নকল পাঠিয়ে দিয়েছে। এখন আর তাদের অপাঙক্তেয় করে রাখবার কি কারণ থাকতে পারে?
ডরোথি, মনে রেখো যে ভোজর আয়োজন করেছে স্মিথ পরিবার। নিমন্ত্রিত বাহবার ভার তাদের উপরে, তুমি আমি পরামর্শ দেবার কে?
তুমি কেউ নও জানি, কিন্তু আমি নিশ্চয়ই পরামর্শ দেব, কারণ কেটি আমার বোন আর মিঃ দুবোয়া এখন আমার ডিয়ার ব্রাদার-ইন-ল।
কেরী মহাবিপদে পড়ল। কেটি জনকে প্রত্যাখ্যান করেছে, এ তথ্য ডরোথি জানত না, আর জানলেও কিছু বুঝত কিনা সন্দেহ। তবু শেষ চেষ্টা হিসাবে বিষয়টি উত্থাপন করতেই ডরোথি কেরীর পিতামাতা সম্বন্ধে যে সব উক্তি প্রয়োগ শুরু করল তা ডরোথির মুখেও নূতন বটে। তাতেও কেরীকে নিরুত্তর দেখে শেষ অস্ত্র প্রয়োগে কৃতসর হল নরম দেখে গোটা দুই বালিস টেনে নিয়ে ডরোথি বলল, আমার গা কেমন করছে।
