টুশকি তার গলা জড়িয়ে ধরে বলে উঠল, তুমি চলে গেলে আমার জান বেরিয়ে যাবে, তুমি জানানা বধের পাপে পড়বে।
এবার আর কিছু না বললে চলে না, তাই টমাস বলল, না না, আমি কোথায় যাব।
টুশকি এবারে অঝোরে চোখের জল ছেড়ে দিল, বলল, মানিক আমার, মানিকতলায় থাকবে যেন, মদনমোহনতলায় আমার বাড়ি কি নেই? এস এস, আমার আর একটু কাছে এস।
এই বলে একটু টান দিতেই পাকা ফলটির মত টমাস ধপ করে মেঝেতে পড়ে গেল। টমাস দেখল টুশকির চোখে জল, সে তার ওড়না দিয়ে চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলল, নিকি ডিয়ার, তোমার বাড়িতেই থাকবার ইচ্ছ, কিন্তু ঐ কেরীর জন্য তা সম্ভব হবে না।
কেরী তোমার কে? সেই মুখপোড়া অর্থাৎ burnt-face তোমার কে?
টুশকি রাম বসুর কৃপায় দু-চারটে ইংরেজী কথা শিখেছিল।
টুশকির প্রমাতিশয্যে টমাস এবারে ভেঙে পড়ল, রুদ্ধ আবেগে বলে উঠল, কেউ নয়, কেউ নয়, নিকি, তুমি আমার সব।
তবে তিন সত্যি কর—অর্থাৎ three truth বল যে আমাকে ছেড়ে যাবে না?
টমাস বলল, না, কখনই যাব না।
তবে চল আমার ও ঘরে।
কি কর্তব্য বুঝতে না পেরে টমাস যখন ইতস্তত করছে এমন সময়ে রহিমা বিবি ছুটে এসে বলল, এ কি তোর ব্যাভার ঘুড়ি, আমার খসমকে বাগাবার চেষ্টা করছিস!
টুশকি বলল, চালাকি রাখ। টমুকে দেখে অবধি আমি পাগল হয়েছি।
আর তোর টমু যে আমাকে দেখে অবধি পাগল হয়েছে তার খোঁজ রাখিস? নাচের সময় আমার দিকে তাকিয়ে এমনিভাবে সে চোখ মারছিল
বলে সলোল দৃষ্টি নিক্ষেপের অভিনয় করে দেখাল।
যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা বলে টুশকি মারল রহিমাকে এক ধাক্কা। তার ফলে রহিমা এসে জড়িয়ে ধরল টমাসকে। রহিমা ও টুশকির মধ্যে টমাসকে নিয়ে টানাটানির প্রতিযোগিতা পড়ে গেল।
তখন সেই বিষম সঙ্কটকালে টমাসের মনে পড়ে গেল অগতির গতি, অনাথের নাথ ভগবানকে। সে নতজানু হয়ে করজোড়ে আবৃত্তি শুরু করল-”প্রভু, আমার প্রার্থনা শ্রবণ কর; শত্রুর কবল হইতে আমার জীবন রক্ষা কর। দুষ্টের মন্ত্রণা হইতে আমাকে রক্ষা কর–অন্যায়কারিগণের আক্রমণ হইতে আমাকে রক্ষা কর।”
টমাস বাংলা ভাষাতেই আবৃত্তি করছিল, বোধ করি ‘শত্রু’ ও ‘অন্যায়কারিগণের’ মনে বিবেক জাগ্রত করবার আশাতেই।
নতজানু যুক্তকর টমাস প্রার্থনা করে, আর রহিমা ও টুশকি সেই প্রার্থনার তালে তালে তার দুই গালে চুম্বন করে—পাপের আক্রমণ ও সেই পাপনিরোধপ্রচেষ্টার এমন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত জগতের ধর্মসাহিত্যে অসম্ভব না হলেও নিতান্ত বিরল।
টমাস গল্পকণ্ঠে আবৃত্তি করে—
“তোমার ভৎসনায় তাহারা পালাইল, তোমার বজ্রের আদেশে তাহারা প্রস্থান করিল। তাহারা পাহাড়ের চূড়ায় উঠিল, তাহারা গভীর উপত্যকায় নামিয়া বিধি-নির্দিষ্ট স্থানে চলিয়া গেল।”
শেষোক্ত প্রার্থনা শুনে টুশকি বলে উঠল-দুঃখ কেন খসম আমার! আমার সঙ্গে চল—এমন পাহাড়ের চূড়া দেখাব যার চেয়ে উঁচু নেই, এমন গভীর উপত্যকা দেখাব যার চেয়ে নীচু নেই—আর সেই স্থানে নিয়ে যাব যা একমাত্র তোমার জন্যেই বিধি-নির্দিষ্ট।
কি লো হুঁড়ি, পারবি তুই?
শেষোক্ত বাক্য রহিমার উদ্দেশে।
টমাস টুশকি দুজনেই দেখল যে প্রচণ্ড হাসির আবেগে রহিমা ঘরময় লুটোচ্ছে।
টুশকি বলল, দেখলে তো টমাস সাহেব-পারবে না বলে এখন সরে পড়েছে।
বটে রে, সরে পড়েছি!
এই বলে রহিমা ওড়নাখানা কোমরে জড়িয়ে ‘রণং দেহী’ মূর্তিতে উঠে দাঁড়াল। টুশকিও পশ্চাৎপদ হবার নয়, সে-ও ওড়না কোমরে জড়িয়ে বলল, আয় দেখি।
সেই যুযুধানদ্বয়ের ভীমবল্লভ মূর্তির দিকে তাকিয়ে টমাস দেখল দুজনেই পর্বতচূড়ার অধিকারিণী। ভয়ে তার প্রাণ উড়ে গেল।
হঠাৎ সে লাফিয়ে উঠে মুন্সী’ ‘মুলী’ বলে রাম বসুর উদ্দেশে সবেগে প্রস্থান করল।
টুশকি ও রহিমা ‘মেরি জান, কোথায় যাও’, ‘খসম আমার, পালাও কেন’–চীৎকার করতে করতে ছুটল খলিতপদ পলায়নপর টমাসের পিছু পিছু।
নাঃ, বোসজার সঙ্গে পালিয়েছে—বলতে বলতে তারা ফিরে এল।
এবারে রহিমা শুধাল, হারে টুশকি, ব্যাপারটা কি?
রহিমা ষড়যন্ত্রের কিছু জানত না, টুশকি বুঝিয়ে বলতে সে আর এক দফা হেসে উঠল।
তার পরে শুধাল, কিন্তু সত্যি থাকবে কি? না নেশা কাটলেই সাহেবও শিকলি কাটবে?
কাটবে না বলেই মনে হচ্ছে, দেখা যাক কতদূর কি হয়।
এমন সময়ে রহিমা বিবি সবিস্ময়ে চীৎকার করে উঠল, ও আবার কি ঢং রে প্রমদা?
হাম প্রমদা নেই হ্যায়, হাম কর্নেল জবরজঙ্গ প্রিংলি সাহেব হ্যায়।
দুজনে দেখে প্রমদা কোথা থেকে একটা পুরনো জঙ্গী কোর্তা সংগ্রহ করে পরেছে, মাথায় দিয়েছে পালক-গোঁজা জঙ্গী টুপি, পরেছে আঁট প্যান্টলুন, আর মুখ রাঙিয়ে নিয়েছে সাদায়-লালে মেশাননা রঙে।
দুজনে একসঙ্গে শুধায়, ও আবার কি ছিরি।
ছিরি-বিচ্ছিরি মৎ বোল। আও বিবিলোগ, কর্নেল সাহেবকে সাথ বলডান্স করনে পডেগা।
এতক্ষণে তারা বুঝল যে আজকের পালা শেষ হয়নি, এবারে সাহেবী নাচের নকলে নাচ চলবে। এতে তারা মোেটই বিস্মিত হল না। কেননা, তখনকার দিনে বাইনাচের অন্তে সাহেব-বিবিগণ প্রস্থান করলে নর্তকীগণ নিজেদের মধ্যে সাহেবী নাচের অনুকরণ দেখিয়ে কৌতুক অনুভব করত।
প্রমদা রহিমাকে লক্ষ্য করে বলল, আও বিবি, তুমহারা সাথ ডান্স করেগা।
রহিমা বলল, তবে দাঁড়াও কর্নেল সাহেব, আমি আগে বিবি সেজে নিই।
