নীল দত্ত বলে, গীতার মাহাত্ম না বুঝলেও মহাভারতের অমর্যাদা করবে না।
ঠিক সেই মুহূর্তেই হলঘরে হাসির খিলখিল বেলোয়ারী আওয়াজ উঠল।
নাও, ঐ বোধ হয় সভাপর্বের অভিনয় শুরু হল। এখন দুর্যোধন দুঃশাসন—এক শ ভাই মিলে এক দ্রৌপদীকে নিয়ে টানাটানি শুরু করলে এখানেই না দ্রৌপদীপতন ঘটে।
সেই আশঙ্কাতেই তো রহিমাৰিবি, হাফ কালী আর প্রমদাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছি।
উচ্ছ্বসিত হাসি, ঘুঙুরের রব, গেলাসের টুংটাং, মদ্যবিজড়িত প্রণয়হুঙ্কার, হিন্দী ইংরেজী গানের দু-একটা ছিন্ন কলি আসতেই থাকে।
ওরা বলে ওঠে, কেলেঙ্কারির একশেষ।
নীলু বলে, মেয়েমানুষগুলোকে খুন-জখম না করে যায়।
রাম বসু পরামর্শ দেয়, মদের এত খরচা করলে, ঐ সঙ্গে একটা ডাক্তার যদি এনে রাখতে।
তাতে মাতালের সংখ্যা আর একটা বাড়ত বই তো নয়। এর পরে মেয়েমানুষগুলোকে খেসারত দিতে হবে, তারপরে আছে কসাইটোলা বাজারের ইউনিয়ন ট্যাভানের বিল শোধ। জেরবার হয়ে গেলাম ভাই, জেরবার হয়ে গেলাম।
নিকি এলে বোধ করি এত হাঙ্গামা হত না।
নীলু বলে, কে জানে! কিন্তু সে আসবে কেন, মহারাজা নবকৃষ্ণের বাড়ির বায়না ফেলে মানিকতলার নীলু দত্তর বাড়িতে আসতে যাবে কেন? ওকথা মনে করিয়ে আর দুঃখ দিও না। ও সব থাক।
প্রসঙ্গ পালটিয়ে শুরু করে, তোমার বিলম্ব দেখে ভাবলাম যে, টমাসকে বুঝি আনতে পারলে না।
প্রায় সেই রকম ব্যাপার দাঁড়িয়েছিল। হঠাৎ কেরী বলে বসল, না না, টমাস গেলে চলবে কেন, আজ সন্ধ্যায় দুজনে বসব বাইবেল তর্জমা করতে। শোন একবার কথা! কেরীর কথা শুনে টমাসের তো গেল মুখ শুকিয়ে আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকায়। তখন আমি কেরীকে লম্বা এক সেলাম করে বললাম, মানিকতলার এক মুদি খ্রীষ্টান হবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। তাকে জানিয়েছি যে, সাচ্চা এক পাদ্রী নিয়ে এসে প্রভু খ্রীষ্টের মহিমা শোনাব। এখন ডাঃ টমাস না গেলে লোকটা কি ভাববে! বুঝলে দত্তমশাই, আমার কথা শোনবামাত্র কেরী আর টমাসের মুখ আশায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল। পাছে বেটা কেরীও সঙ্গে আসতে চায়, টমাসকে নিয়েই দিলাম ছুট।
এখন টমাসে আর টুশকিতে ভেট করিয়ে দিতে হয়।
সেটা মহাপ্রস্থানিক পর্বের আগে—স্ত্রীপর্বে।
টুশকিকে সব শিখিয়ে পড়িয়ে এনেছ তো?
টুশকিকে শেখাতে হয় না, সে তোমাকে আমাকে সকলকে শেখাতে পারে।
চল তবে একবার খানার ঘরটা দেখে আসি, সব ঠিক আছে কি না।
হাঁ, দেবতার ভোগে ত্রুটি হওয়া কিছু নয়।
দেবতাকে ভয় না করলেও চলে, এরা যে ব্ৰহ্মদত্যি, একটু কোথাও ভুলচুক হলে ঘাড় মটকে সর্বনাশ করে দেবে।
তবে এগুলোকে ডাক কেন?
লোকে বেতালসিদ্ধ হতে চায় কেন? দু
জনে খানার ব্যবস্থা পরিদর্শনের উদ্দেশে প্রস্থান করল।
সেকালে নীলু দত্তর মত অভাজনের বাড়িতে প্রচুর খানাপিনার লোভেও ইংরেজ পদার্পণ করত না। তবে এরা কারা? কলকাতার ইংরেজ সমাজের প্রত্যতম প্রান্তে কোট-প্যান্ট-হ্যাট-ধারী ইংরেজীভাষী যে এক মিশ্র ফিরিঙ্গি সমাজ গড়ে উঠেছিল—এরা তাদেরই সুযোগ্য প্রতিনিধি। ইংলভের সঙ্গে এদের অধিকাংশেরই সম্বন্ধ জনশ্রুতিযোগে। দু-চারজন খাঁটি ইংরেজও আছে। দেউলিয়া হওয়া বা ঐ-জাতীয় কারণে খাঁটি স্বদেশী সমাজে অপাঙক্তেয় হয়ে তারা এখন এদের গোষ্ঠীভুক্ত হয়েছে। টমাসকেই একমাত্র খাস ইংরেজ বলা চলে। মোট কথা, নীলু দত্ত ভারতীয় সমাজের যে-স্তরভুক্ত তার অতিথিরাও ইংরেজ সমাজে প্রায় সেই স্তরের। এইখানেই ভগবানের সমদর্শিতা। তিনি ভক্ত ও ভক্তির পাত্র এক ছাঁচে ঢালাই করে থাকেন, যাতে ভক্তির পাত্র না বলতে পারে ভক্ত পেলাম না, আবার ভক্ত না বলতে পারে ভক্তির পাত্র জুটল না। ভগবান যখন নিতান্ত কুৎসিত কালো মেয়ে গড়েন তখন সেই সঙ্গেই অনুরুপ রুচি দিয়ে একটি পুরুষ গড়তেও ভোলেন না। কেবল কালো কুৎসিত বলে কোন মেয়ের বিয়ে হল না, এমন তো শুনি নি। বাজারে টাটকা মাছ ও পচা দুই-ই আমদানি হয়, বাজার শেষ হয়ে গেলে দেখা যায়, দুই-ই উঠে গেছে। এই সব দৃষ্টান্তের পরে ভগবানকে আর কখনই একদেশদশী অপবাদ দেওয়া উচিত নয়।
গভীর রাত্রে মদোন্মত্ত নিমন্ত্রিতের দল বিদায় হয়ে গেল। বলা বাহুল্য সকলকেই লোকের সাহায্যে ঠেলেঠুলে গাড়ি, পালকি, তাঞ্জাম প্রভৃতি যানবাহনে তুলে দিতে হল। নীলু দত্ত মদের বরাদ্দ এমন সুপ্রচুর করেছিল যে ঝাড়লণ্ঠন ভাঙবার শক্তি আর তাদের অবশিষ্ট ছিল না-ভাঙাচোরার পালা গেলাস ও বোতলের উপর দিয়েই গেল। নীল বলল, মদের খরচা বাড়িয়ে ঝাড়লণ্ঠনের খরচা বাঁচালাম।
বাকি রইল কেবল টমাস—তাকে নিয়ে যাবে রাম বসু। এই ব্যবস্থার কারণ স্বতন্ত্র, আর শীঘ্রই তা প্রকাশ পেল।
হলঘরটায় একটা কৌচের উপর হেলায়িত দেহে আসীন ছিল টমাস। হঠাৎ টুশকি কাছে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে করুণভাবে বলে উঠল—টমাস সাহেব, তুমি আমার খসম, তুমি নাকি আমাকে ছেড়ে যাবে?
টমাস এই রকম ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত ছিল না। নাচের সময়ে আর সকলের মত সে-ও টুশকিকে সুপ্রসিদ্ধ নিকি মনে করে বাহবা দিয়েছিল, ঘাঘরা-ওড়নার রহস্যাবৃত সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছিল, তার সুরাখলিত পা দুখানার তালে তালে নিজেকে নর্তিত করেছিল, কিন্তু সেই নিকি (?) যে তাকে হঠাৎ এমন আপন মনে করেছে তা কল্পনায় আসে নি। টুশকির কথায় হঠাৎ কি উত্তর দেবে ভেবে পেল না।
