অবশ্য এই ক্ৰমে ব্যতিক্রম টমাস। টমাসের মত ব্যক্তি সর্বযুগে সর্বসমাজে সর্বদেশেই ব্যতিক্রম।
নীলু দত্ত বলে, ভায়া, এবারে বড় বজরাখানা ঘাটে ভিড়িয়েছি, আর ভয় নেই।
রাম বসু উত্তর দেয়, কিন্তু ঐ ডিঙি নৌকোখানাকে একেবারে অবহেলা কর না। সংসারে বজরা আর ডিঙি দুয়েরই প্রয়োজন হয়।
সে কি আর আমি জানি নে! তুমি তো তাকে এরই মধ্যে গঙ্গারামী কাছিতে বেঁধে ফেলেছ।
কিন্তু আর একটা উপরি বাঁধন দিতে দোষ কি?
কি করতে চাও শুনি।
তখন রাম বসু আরম্ভ করে, অনেককাল টমাসের সঙ্গ করছি, দেখছি যে, প্রভু যীশুখ্রীষ্টের উপরে ওর যত টান, মেরি ম্যাগলেনের উপর টান তার চেয়ে কিছু বেশি।
নীলু দত্ত শুধায়, সে বেটী আবার কে?
গোড়ায় ছিল খানকী, পরে প্রভুর কৃপায় হল মস্ত তপস্বিনী।
সব খানকীরই দেখছি এক ধারা। তা তুমি এত কথা জানলে কোথায়?
বাইবেল পড়ে। পড় পড় দত্ত মশাই, বইটা পড়। জাত যাবে না, অনেক কেচ্ছা জানতে পাবে।
এইসব কেচ্ছা আছে নাকি বইখানায়? তবে যে ধর্মগ্রন্থ তাতে আর সন্দ নেই।
ওর পুরনো অংশে অনেক লচ্ছেদার কেচ্ছা আছে, কিন্তু সত্যি বলতে কি, আমাদের রামায়ণ-মহাভারতের কাছে কেউ নয়।
তখন নীলু দত্তের বেনিয়ান-আচ্ছাদিত লোমশ বক্ষে হঠাৎ আর্যগৌরব উদ্বেল হয়ে উঠল—সে দুই হাত মাথায় ঠেকিয়ে বলল, ভায়া, ওসব আর্যঋষিদের সৃষ্টি হবে না?
তার পর একটু থেমে বলল, তা এমন একখানা ভাল বই, বাংলা তর্জমা হলে যে পড়া যেত।
সে আশা শীগগিরই মিটবে—ঐ কাজ করবে বলেই তো কেরী এ দেশে এসেছে।
বেশ বেশ, সাত-শীগগির করে ফেলুক, দুপুরবেলা পড়া যাবে। কিন্তু টমাসের কথা কি বলছিলে?
ওকে নারীঘটিত বাঁধন পরিয়ে দিতে পারলে নিশ্চিন্ত হওয়া যেত।
এই কথা! এ আর কঠিন কি? পরশুদিন আমার বাগানবাড়িতে নিকি বাইজীর নাচ হবে, অনেক সাহেব-সুবো আসবে। টমাসকে নিয়ে এস না।
সে কথা আভাসে একরকম তাকে জানিয়ে রেখেছি, এখন কেরী জানতে পেরে গোলমাল ঘটায়।
তা ও বেটাকেও আন না কেন?
সে বড় কঠিন ঠাই!
তবে সহজটাকেই নিয়ে এস। কিন্তু নিকির মত বনেদী বাইজী কি ঐ বুড়ো পাদ্রীর উপর নেকনজর দেবে?
রাম বসু বলে, ভয় কর না, সে কাজ আমি অন্য লোককে দিয়ে করিয়ে নেব টুশকিকে নিয়ে আসব।
নিজেদের প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের গৌরবে স্ফীত নীলু বলে, এবারে দেখা যাক ও বেটারাই আমাদের খিরিস্তান করে, না আমরাই ওদের জেণ্টু করি।
রাম বসু বলে, দত্তমশাই, আর দেরি করব না, তাড়াতাড়ি গিয়ে শুভ সংবাদটা টমাসকে শুনিয়ে আসি।
নীলু বলল, পরশু সন্ধ্যাবেলা, শনিবার!
রাম বসু দূর থেকে হাত নেড়ে ইশারায় জানায় যে সমস্ত তার মনে আছে।
.
১.১৭ নিকি বাইজী (?)
দোতলার হল-ঘরটায় নাচ চলছে। বারান্দার এক কোণে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে নীলু দত্ত ও রাম বসু কথা বলছিল।
রাম বসু বলে, দত্তমশাই, টুশকিকে যে নিকি বলে চালিয়ে দিলে, যদি ধরা পড়ে যায়?
পাগল হলে ভায়া? মদের এমন ঢালাও বন্দোবস্ত করেছি যে টুশকি-নিকিতে তফাৎ বোঝা দূরে থাক, মোহর-সিকিতে তফাৎ করবার ক্ষমতাও আর ওদের নেই। ঐ শোন
একটা নাচের অন্তে বিজাতীয় কণ্ঠে উল্লাস-হুঙ্কার উঠল—
বেভো, ক্যাটালিনি অব দি ঈস্ট।
নীল দত্ত বলল, দেখলে তো কাঙ্খানা। ওদের কি আর হঁশ আছে! ঐ যে মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে নিকি বাইজী, ব্যস, এখন যদি পাড়ার কেক্তি বুড়িও এসে নাচে তবু সে নিকি।
ব্রেভো নিকি, মাই ডারলিং।
যাক, তোমারও কম সুবিধে হয় নি। নিকি না আসাতে অনেক টাকা বেঁচে গেল।
ভায়া, সে গুড়ে বালি।
কেমন?
নিকি আসতে পারবে না শুনেই মদের বরাদ্দ বাড়িয়ে দিতে হল। নিকির রূপের অভাব মদের প্রভাবে ঢেকে দিতে হবে তো, নইলে যে বেটারা কুরুক্ষেত্র কাজ করে বসবে।
কেমন, শুনি।
আগে ভেবেছিলাম ম্যাসওয়ানস বিয়ার আনব, কোয়ার্ট বোতল সাড়ে তিন টাকা ডজন। নিকি না আসাতে স্টোনস বাস বিয়ার আনাতে হল, কোয়াট বোতল সাড়ে পাঁচ টাকা ডজন। তার পর দেখ, ন্যাশনাল মার্কা ব্রাঙি চৌদ্দ টাকা বোতলের বদলে আনতে হল বী-হাইভ বাইশ টাকা বোতল, ডেনিস মুনি চব্বিশ টাকা বোতল, হেনেসি সাতাশ টাকা বোতল। সবসুদ্ধ মিলে নিকির খরচের উপর দিয়ে গেল।
রাম বসু শুধায়, দু-এক ফোঁটা প্রসাদ পাওয়া যায় না?
পাগল হয়েছ নাকি ভায়া! তলানিযুদ্ধ না খেয়ে বেটারা যাবে না।
যাই হক, বোতল বিক্রি করেও কিছু খরচা উঠবে। বিলিতি মদের বোতলের চড়া দাম, চার টাকা ডজন।
বসু, তুমি দেখছি এতকাল সাহেবের সঙ্গ করেও এদের স্বভাব জান না।
কেন, কেন?
যাওয়ার আগে বেটারা মাতাল হয়ে বোতল নিয়ে গদাযুদ্ধ আরম্ভ করবেঝাড়লণ্ঠন ভেঙে, কৌচ-চেয়ার গুঁড়িয়ে তবে বিদায় নেবে।
তবে এই কাণ্ড ফি বছর করতে যাও কেন?
কর্মফল! পাড়ায় খাতির বাড়বে, বনেদী ধনী ঘোষেদের উপর টেক্কা দিতে হবে।
তার পর সে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে-জানাম্যধর্মং ন চ মে নিবৃত্তিঃ।
গীতার মহদুক্তির পটভূমিতে হলঘরের মধ্য হতে ধ্বনিত হয়
বিগিন ডারলিং বিগিন,
ক্যাটালিনি অব মাই হার্ট।
একটি মদমত্ত কণ্ঠ সুরা ও সুর-বিজড়িত স্বরে গেয়ে ওঠে–
You’re quite all right inside the bar,
But khubarder, the Caviare!
রাম বস বলে, নাঃ, একেবারে পাষণ্ড, গীতার মাহাত্ম্য বোঝে না, সব মাটি করে দিল।
