কেরী দেখল এমন অনুনয়ের পরে রাজী না হবার আর কারণ থাকতে পারে না। পরদিন কেরী ও টমাসকে নিয়ে রাম বসু নীলু দত্তর মানিকতলার বাড়ি দেখিয়ে আনল। মারহাট্টা খালের ঠিক ধারেই বাড়িটি বেশ বড়, ভিতরে অনেকটা জায়গা, কেরীর পছন্দ হল।
রাম বসু ভাবে, এবার কেরীকে শক্ত করে বাঁধা গেল, এমন সুন্দর বৃহৎ বাড়ি ছেড়ে আর সে অনিশ্চয়ের মুখে ভাসবে না, আর জালি বোটের মত তাকেও পিছনে পিছনে ভেসে চলতে হবে না। সে আরও ভাবে যে, এ হল ভাল, কলকাতাতেও থাকা হবে আবার মাসিক কুড়ি টাকা বেতনও মিলবে। গাছের ও তলার ফল দুই-ই হবে তার করায়ত্ত। ভয় ছিল তার কেরীকে, এ কয়দিনেই বুঝেছিল যে কেরী ও টমাস এক উপাদানে গঠিত নয়। টমাস যত শক্তই হক, তবু ধাতুময়, আঘাতে বাঁকে, উত্তাপে গলে, কিন্তু কেরী গঠিত নিরেট পাথরে, আঘাতে ভাঙতে পারে কিন্তু উত্তাপে গলবার নয়। সেই কেরী এত সহজে স্থায়ী হল দেখে সে নিশ্চিত হল, চিন্তা ছিল না টমাসের জন্য, কারণ তাকে আগেই বেঁধে ফেলেছিল।
.
সেদিনটা ছিল রবিবার। সেন্ট জত্ন গির্জায় উপাসনায় যোগ দিয়ে টমাসের ফিরতে প্রায় মধ্যাহ্ন হয়েছিল। বাড়ি এসে দেখে রাম বসু অপেক্ষা করছে। কি ব্যাপার?
একবার দেখা করতে এলাম।
বেশ বেশ, চল না আজ সন্ধ্যায় শহরটা একবার ঘুরে দেখে আসি।
শহরটা বলতে কতখানি কি বোঝায় জানবার উদ্দেশ্যে বসু বলে ওঠে, অমনি ডাঃ কেরীকে সঙ্গে নিলে হত না?
টমাস শিউরে উঠে বলে, আরে না না, তাকে আর বিরক্ত করা কেন, তুমি আমি দুজনেই যথেষ্ট।
বসুজা খেলোয়াড় লোক, মরা পাখীকে খেলিয়ে তবে আয়ত্ত করে। বলে, বেশ বেশ, চলুন শহরের গির্জাগুলো দেখে আসি, দেখলেও মনটা পবিত্র হয়।
বসু তুমিও দেখছি ধর্মবাতিকগ্রস্ত হয়ে পড়লে। দেখ, ধর্ম খুব উত্তম, কিন্তু জীবনের অন্য অঙ্গও তো নিন্দনীয় নয়।
বসু নিতান্ত জিজ্ঞাসুর মত শুধায়, এবিষয়ে প্রভু যীশুখ্রীষ্ট কি বলেন?
“Give unto Caesar what is Caesar’s”, তবে দেখেছ যে, সীজারের সম্পত্তি প্রভু অস্বীকার করেন না।
রাম বসু ছাড়ে না; বলে, প্রভু স্বীকার করলেও ডাঃ কেরী বোধ হয় স্বীকার করবেন না।
আরে তাকে একসঙ্গে ধর্মের শেয়ালে আর জ্ঞানের বাঘে আক্রমণ করেছে। শেয়ালের হাত থেকে যদি রক্ষা করা যায়, বাঘের হাত থেকে রক্ষা করবে কে? সারাদিন অভিধান ব্যাকরণ প্রভৃতি নিয়ে মশগুল হয়ে পড়ে আছে। সারাদিন কি ঐ সব ভাল লাগে, তুমিই বল না। মানুষেরা তো একটু ফুর্তি করতেও চায়।
চাই বই কি ডাঃ টমাস।
তবে চল আজ সন্ধ্যায় ঘুরে আসা যাক।
.
সন্ধ্যাবেলা রাম বসু টমাসকে এক জুয়ার আড্ডায় নিয়ে গেল। দুজনে যখন বেরিয়ে এল—টমাস একেবারে গজভুক্তকপিখবৎ শূন্য।
টমাস কপাল চাপড়ে বলে উঠল-বসু, আমি নিঃস্ব হলাম।
বসু বলল, ক্ষতি কি! স্বয়ং প্রভু যে নির্দেশ দিয়েছেন—”Give unto Caesar what is Caesar’s!” ও ছাই গিয়েছে ভালই হয়েছে।
টমাস প্রভুর নির্দেশনায় খুব বেশি সান্ত্বনা পায় না। বলে, প্রভুর পক্ষে বলা সহজ, তিনি ছিলেন সন্ন্যাসী, আমি যে গৃহী।
গৃহ নেই, গৃহিণী নেই; কেমন গৃহী?
বসু, গৃহ আর গৃহিণী দুই-ই মনে, চালচুলো না থাকলেও, জরু গরু না থাকলেও অধিকাংশ মানুষই গৃহী।
তার পরে একটু থেমে থেকে শুধায়, তোমার জানা কোন money-lender আছে?
রাম বসুর মধ্যস্থতায় গঙ্গারাম সবকাব মাত্র শতকরা পঁচিশ টাকা সুদে টমাসকে টাকা ধার দেয়। সে আভূমিনত সেলাম করে জানায় যে, সরকারী কর্মচারী হলে সুদটা কিছু কম হত, কিন্তু
কিন্তু, বলে টমাস, আমরা যে আরও বড় সরকারের কর্মচারী, পাদ্রী, প্রভুর প্রেরিত–
এবারে গঙ্গারাম আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা নমস্কার করে, বোধ করি পূর্বোক্ত প্রভুর উদ্দেশেই, তার পরে বলে, পাদ্রী সাহেবের কথা যথার্থ, কিন্তু কি জানেন, এসব বৈষয়িক ব্যাপারে প্রভুর কর্মচারীর চেয়ে কোম্পানির কর্মচারীর গুরুত্ব বেশি।
তার পর টমাসকে খুশি করবার আশায় বলে, কোনরকম জামিন না রেখে যে আপনাকে টাকা দিলাম, তার কারণ আপনার সাদা চামড়া।
রাম বসু বলে, ওর চেয়ে বড় জামিন আর কি হতে পারে, এটা যে আস্ত একটা রুপোর খনি, কি না silver mine।
টমাসের ধারণা হল যে, মস্ত একটা রসিকতা হয়ে গেল, তাই একবার হাসবার চেষ্টা করল, কিন্তু শতকরা পঁচিশ টাকা মনের মধ্যে খোঁচা দিতে থাকায় হাসিটি তেমন প্রকট হল না।
একটিমাত্র শর্ত রইল যে, টাকা শোধ না হওয়া পর্যন্ত টমাস কলকাতা ছাড়তে পারবে না।
সেকালে ইংরেজরা, বিশেষ কোম্পানির ইংরেজ চাকরেরা দেশী মহাজনদের কাছে এমনভাবে বাঁধা পড়ত যে, তাদের নড়বার-চড়বার শক্তি থাকত না। নবাগত তরুণ writer (পরবতীকালের সিভিলিয়ান)-গণ পিতৃশাসনের কৃপোদক থেকে এখানে এসে পড়ত যথেচ্ছাচারিতার মহাসমুদ্রে, এদেশের মাটিতে পা দিয়েই উচ্ছলতার চৌঘুড়ি হাঁকাতে শুরু করত। কিন্তু টাকা? কোম্পানির তনখায় গ্রাসাচ্ছাদন চলাই দায়, অতিরিক্ত খরচ যোগায় কে? যোগাত এইসব মহাজন। কিন্তু মহাজনদের টাকা শুধত কে? Writer গণই শুধত। কলকাতায় শিক্ষানবিশি পর্ব সমাধা করে জেলার ভার নিয়ে মফস্বলে যেতেই বেরুত তাদের অতিরিক্ত খানকতক হাত। উৎকোচ, প্রজাপীড়ন, দুর্বিচার প্রভৃতির মূল এখানে। অল্পকালের মধ্যে দেনা শোধ করে দিয়ে মহাপ্রভুরা প্রভূত অর্থ সঞ্চয় করে স্বদেশে ফিরে যেত, ভারতীয় জাদুদণ্ডের স্পর্শে জুড়িগাড়ি, বাড়িঘর, লাটঘরানা পত্নী ও পার্লামেণ্টের আসন প্রভৃতি জুটতে বিলম্ব হত না। এরাই তৎকালে ইংরেজ সমাজে ‘Nabob’ নামে পরিচিত। মুসলমানী নবাবী শাসনের সুযোগ্য উত্তরাধিকারী ফিরিঙ্গি নবাব।
