এমন সময় বৃদ্ধ জর্জ মোমবাতির আলো হাতে তার ঘরে প্রবেশ করল, স্নিগ্ধ কঠে বলল, জন, কালকেই আমি নিজেই পুলিস নিয়ে যাব কেটিকে উদ্ধার করে আনতে, তুমি নিশ্চিন্ত থাক।
যথাসাধ্য নিজেকে দৃঢ় করে জন বলল, না বাবা, ও রকম কিছু করতে যেও না। তাতে আমার দুঃখ বাড়বে বই কমবে না।…আর তাছাড়া আমি একটুও দুঃখিত হই নি।
এই বলে পিতাকে সান্ত্বনা দেওয়ার উদ্দেশে মুখে হাসি ফোঁটাতে চেষ্টা করল, কিন্তু এই প্রচেষ্টার উদ্যমে এতক্ষণের নিরুদ্ধ অশু হঠাৎ বাঁধ ভেঙে নির্বারিত ধারায় নেমে এল তার দুই গাল বেয়ে।
বৃদ্ধ জর্জ এক ফুঁ-এ আলো নিভিয়ে দিয়ে প্রস্থান করল। পুত্রের অশু দর্শনে ভূয়োদশী পিতার মন হাল্কা হয়ে গেল। পুরুষ বিধাতার সৃষ্টি, নারী শয়তানের। পুরুষ ও নারীকে অবলম্বন করে সংসারে আজও দেবদানবের যুদ্ধ সক্রিয়।
১.১৬-২০ মানিকতলার নীলু দত্ত
পাড়াপড়শীরা বলে, ব্যাপার কি হে নীলু দত্ত, হাতের আঙুল দিয়ে এক ফোঁটা জল গলে না, আর অতবড় বাডিটা সাহেবকে বিনা ভাড়ায় থাকতে দিলে, বলি মতলবটা কি?
নীলু দত্ত লোকটা স্বল্পভাষী, আর অধিকাংশ স্বল্পভাষী লোকের মত আত্মগোপনপ্রয়াসী। অনেকের অনেক জিজ্ঞাসাবাদের পর একদিন উত্তর দিল, আরে ভাই, একে বিদেশী তাতে আবার গরিব পাদ্রী, না হয় দিলাম দুদিন থাকতে, পড়েই আছে তো বাড়িটা।
পড়শীরা বলে, ওহে দত্ত, অনেক মোহর পড়েই তো আছে তোমার সিন্দুকে, কই দাও দেখি দুদিনের জন্যে আমাদের?
তাদের কথা শুনে নীল নীরবে হাসে।
নীলু দত্ত হঠাৎ-ধনী। কোম্পানির প্রথম আমলে ব্যবসা করে হঠাৎ কিছু টাকা করে ফেলে। ঐটুকুতে তার শ্রম ও বুদ্ধির আবশ্যক হয়েছিল। তার পর সে রইল, নিষ্ক্রিয়, তার টাকা হয়ে উঠল সক্রিয়। নদীস্রোত ও টাকার স্রোত একই নিয়মের অধীন। গোড়ায় মূল গতিবেগটা একবার সঞ্চার করে দিতে পারলে নিত্য নূতন ধারা সংগ্রহ করে নিয়ে বর্ধিততর বেগে স্ফীততর দেহে চলতে থাকে নদী ও অর্থপ্রবাহ। নীলু দত্ত একসময়ে দেখতে পায় যে তার সাধের তরণী স্রোতের প্রবল ঠেলায় কখন অজ্ঞাতসারে সার্থকতার সমুদ্রসঙ্গমে উপনীতপ্রায়। পাড়ার সকলে বলাবলি করে, এবারে একটা ডুব দিয়ে উঠলেই নীলু দত্তর জীবন্মুক্তি। এমন অবস্থায় মাথা ঘূর্ণিত হওয়াই স্বাভাবিক, কিন্তু এক্ষেত্রে তেমন অঘটন ঘটল না, নীলু দত্ত তৃণাদপি সুনীচ হয়েই থাকল। এখন তার একমাত্র খেদ এই যে, তার অর্থ আছে অথচ কৌলীন্য নেই; ঐ যে ঘোষেদের বাড়ির ইটগুলো খসে পড়েছে, ওর কৌলীন্য নীলুর চেয়ে অনেক বেশি। তখন সে কৌলীন্য সংগ্রহে মনোনিবেশ করল। তখনকার দিনে সাহেব-সান্নিধ্য ছিল কৌলীন্য অর্জনের সহজতম পন্থা লোক বলত, যেমন তেমন সাহেব লাট সাহেব। তাই রাম বসু কেরীকে আশ্রয় দানের প্রস্তাব করবামাত্র লাফিয়ে উঠে সে রাজী হল।
একটা অন্ধকারাচ্ছন্ন হিদেন জাতিকে আলোকদানের আশায় সপরিবারে কেরী কলকাতায় আসেন, আদর্শের আতিশয্যে পূর্বাপর ভালরূপে চিন্তা করবার সুযোগ পান নি, সঙ্গে ছিল ভাববাতিকগ্রস্ত টমাসের প্ররোচনা। টমাস তাকে বুঝিয়েছিল গ্রাসাচ্ছাদন ও আশ্রয়ের চিন্তা করবার প্রয়োজন নেই, জাহাজঘাটাতে উপস্থিত হলেই দেখতে পাবে যে হাজার হাজার হিদেন নরনারী তোমার মত ‘প্রেরিত পুরুষ’কে মাথায় বহন করে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। বলা বাহুল্য, কেরীর এ কয়দিনের অভিজ্ঞতায় টমাসের উক্তি সমর্থিত হয় নি। কেরী দেখল যে এই বৃহৎ নগরে আলোপ্রাপ্তচ্ছু ‘হিদেন’ যদি কেউ বা থাকে তবে সে এখনও পর্যন্ত একান্ত গোপনেই আছে। আর, আশ্রয়? সে তো দিয়েছে জর্জ স্মিথ। কিন্তু এখানে তো অনির্দিষ্টকাল থাকা চলে না। তার উপরে কেটির অন্তর্ধান, ডরোথির উন্মাদবৎ অবস্থা কেরীকে আরও বিব্রত করে তুলল। সে স্থির করল অবিলম্বে অন্যত্র যাওয়া কর্তব্য। তাই রাম বসু নীলু দত্তর বাড়িতে গিয়ে বাস করবার প্রস্তাব করামাত্র কেরী সম্মত হল। কেরী মনে মনে আয়ের দিকটা হিসাব করে দেখতে পেল হাতে আহে কেটারিঙের মিশন কর্তৃক স্বীকৃত মাসোহারা ষাট টাকা, দি হোলি বাইবেল ও মনের অদম্য আকাঙ্ক্ষা। আর ব্যয়ের দিকটা হিসাব কবে দেখল—নিত্য ও নৈমিত্তিক অসংখ্যপ্রকার খরচ। তদুপরি ডরোথির হিস্টিরিয়া আর টমাসের অব্যবস্থিতচিত্ততা। এবম্প্রকার বাজেট সন্দর্শনে সাধারণ লোকের মূহ যাওয়ার কথা। কিন্তু একথা একশ বার স্বীকার্য যে, কেরী সাধারণ লোক ছিল না। সে ঈষৎ কুণ্ঠার সঙ্গে বাড়ি-ভাড়ার প্রসঙ্গ তুলতেই রাম বসু বলে উঠল—ও কথা মুখে আনবেন না, ‘ডোন্ট ব্রিং টু মাউথ।’
সে জানাল নীলু দত্ত একজন ভক্ত লোক।
কিন্তু সে ত হিদেন।
রাম বসু বলল, হিদেন হলে কি হয়, মনে মনে খাঁটি খ্রীষ্টান। কৃষ্ণ কৃষ্ণ জপ করতে করতে খ্রীষ্ট খ্রীষ্ট বলে ফেলে। ডাঃ কেরী, আপনার শুভাগমন সংবাদ আমার মুখে শুনে বলল,ভায়া, পাদ্রী-বাবাকে বল যে, দয়া করে এসে আমার বাড়িতে পায়ের ধুলো অর্থাৎ ‘ডাস্ট অব দি ফীট’ দিয়ে বাস করুন।
তার পর সে বলল, এখন তার বাড়িতে গিয়ে বাস না করলে খুব দুর্নাম, কি ্না ব্যাড নেম হবে। যে-সব হিদেন এখন কৃষ্ণ বলতে খ্রীষ্ট বলে ফেলে তাদের সবারই আবার কৃষ্ণপ্রাপ্তি ঘটবে। ওখানে যেতেই হবে।
