.
বসুপত্নী অন্নদা একটি মূর্তিমতী খাণ্ডারণী। যে সংসারে স্বামী-স্ত্রীতে মনের মিল, সে সংসারে পয়ার ছন্দ। ছত্রে ছত্রে মিলে গিয়ে সংসাররূপ মিত্রাক্ষর দিব্য শান্ত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, অগ্রসর হবার উদ্দীপনা অনুভব করে না। আর যে সংসারে স্বামী স্ত্রীতে মনের মিল নেই তা হচ্ছে গিয়ে অমিত্রাক্ষর ছন্দ-ছত্র থেকে ছত্রান্তরে, যতি থেকে যত্যন্তরে, অতৃপ্তির আবেগে কেবলই এগিয়ে চলে, শান্তি না থাকায় কোথাও সমাপ্তির নিষেধ স্বীকার করতে হয় না। রাম বসুর লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ, সাহেব পাদ্রীর প্রতি ঔৎসুক্য, খ্রীষ্টীয় ধর্মে বিশ্বাস প্রভৃতির মূলে সাংসারিক অশান্তি। সাংসারিক শান্তির অভাবেই মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রেরণা।
১.১৩ টুশকি
সন্ধ্যাবেলা টুশকি তসরের শাড়ি পরল, হাতে একজোড়া মন্দির নিল, ডাকল, ন্যাড়া, আয় আমার সঙ্গে।
রাম বসু শুধাল, কোথায় চললে?
কেন, জান না নাকি? মদনমোহনের আরতি দেখতে।
ন্যাডাকে আবার কেন?
ও এখানে একলা থেকে কি করবে? দেখে আসুক। তার পর একটু ভেবে বলল, সন্ধ্যাবেলায় দেবদেবী দেখলে মনটা ভাল থাকে। না রে ন্যাড়া?
তা বইকি দিদি। সারাটা দিন অসুরগুলোর সঙ্গে কাটে যে। এ তবু ভাল, দিনের বোঝা দিনে নামে। সাহেবগুলোর সঙ্গে থেকে দেখলাম কিনা—ওরা সাতদিনের বোঝ নামায় একদিনে, রবিবারে।
টুশকি হেসে বলল—সাতদিন বইতে পারে?
ন্যাড়া বলল, তুমি আমি হলে কি পারতাম, ঘাড় ভেঙে যেত। ওরা যে অসুর। সাতদিনের বোঝা বইবার মত করেই ওদের দেহ তৈরি।
ন্যাড়ার কথায় টুশকি হেসে উঠল। রেড়ির তেলের সেই স্তিমিত আলোতেও রাম বসুর চোখে পড়ল টুশকির নিটোল গালে দুটি টোল।
বসুজার দৃষ্টি টুশকির চোখ এড়াল না, সে বলল, তুমি একা বসে থেকে কি করবে?
রাম বসু বলল, বসে আর রইলাম কোথায়! অথৈ সাগরে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছি।
দেখো ডুবে না যাও।
ডোববার চেষ্টাই তো করছি।
কেন, ডোববার এত শখ কেন?
তলিয়ে দেখি পাতালপুরীর রাজকন্যে মেলে কি না।
তবে তাই দেখ। আমি এখন চললাম। আয় ন্যাড়া। এই বলে ন্যাড়াকে সঙ্গে নিয়ে টুশকি প্রস্থান করল।
ঘণ্টাখানেক পরে টুশকি ফিরে এল। টুশকি দেখল যে, প্রদীপের কাছে বসে বসুজা নিবিষ্ট মনে লিখছে, ওদের আগমন টের পেল না। টুশকিই প্রথম কথা কইল-কি কায়েৎ দাদা, কি লেখা হচ্ছে?
ওঃ, তোমরা ফিরলে? কিছু না, একটা গীত রচনা করলাম।
গীত! কি গীত? সেই পাতালপুরীর রূপবর্ণনা নাকি?
না ভাই, ঠিক উল্টো। সাগর পার করবার জন্যে ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা।
কেন, পার হতে যাবে কেন? ডুবে মরবার শখ যে হয়েছিল!
এখনও আছে। কিন্তু সাহেবের ইচ্ছা অন্যরকম।
এর মধ্যে সাহেব আবার এল কোত্থেকে?
খাস বিলেত থেকে, কেরী সাহেব। যার কথা ওবেলা বলেছি।
সাহেবের ইচ্ছাটা কি?
যীশু সম্বন্ধে একটা গীত লিখি।
আর তুমি লিখে ফেললে? কোথাকার মেলেচ্ছ, তাদের দেবতার বিষয়ে অমনি গীত রচনা করলে! কায়েৎ দাদা, কিছুই তোমার অসাধ্য নয়!
সাধ্য কি অসাধ্য শোন না একবার।
দাঁড়াও কাপড়টা ছেড়ে আসি, অমনি ন্যাড়াকেও খেতে দিয়ে আসি, ছেলেটার ঘুম পেয়েছে।
কিছুক্ষণ পরে টুশকি ফিরে এলে, বাতিটা কাঠি দিয়ে উস্কে দিয়ে রাম বসু সুর করে পড়তে শুরু করল
“কে আর তারিতে পারে
লর্ড জিজছ ক্রাইস্ট বিনা গো,
পাতকসাগর ঘোর
লর্ড জিজছ ক্রাইস্ট বিনা গো।
সেই মহাশয় ঈশ্বর তনয়
পাপীর ত্রাণের হেতু।
তারে যেই জন করয়ে ভজন
পার হবে ভবসেতু।
এই পৃথিবীতে নাহি কোন জন
নিষ্পাপী ও কলেবর।
জগতের ত্রাণকর্তা সেই মহাশয়
জিজছও নাম তাঁহার।
ঈশ্বর আপনি জন্মিল অবনী
উদ্ধারিতে পাপী জন।
যেই পাপী হয় ভজয়ে তাঁহার
সেই পাবে পরিত্রাণ।
আকার নিকার ধর্ম অবতার
সেই জগতের নাথ।
তাঁহার বিহনে স্বর্গের ভুবনে
গমন দুর্গম পথ।
সে বদন বাণী শুন সব প্রাণী
যে কেহ তৃষিত হয়।
যে নর আসিবে শুদ্ধ বারি পাবে
আমি দিব সে তাহায়।
অতএব মন কর রে ভজন
তাঁহাকে জানিয়া সার।
তাঁহার বিহনে পাতকিতারণে
কোন জন নাহি আর।”
পড়া শেষ করে বসু জিজ্ঞাসা করল, কেমন লাগল?
টুশকি মনে দিয়ে শুনছিল, বলল, খুব সুন্দর, শুনলে জ্ঞান হয়, কেবল ঐ জিজছ না কি বললে না, ঐটি ছাড়া।
আরে ঐটিই তো আসল, আর কিছু না থাকলেও চলত। আমাদের ভক্ত বৈষ্ণব বাবাজীরা যেমন কৃষ্ণ-র ‘ক’ শুনলেই মৃছা যায়, পাদ্রীদেরও প্রায় সেই দশা।
তোমার দশা দেখছি আরও খারাপ—ঐ নাম শুনে লম্বা গীত রচনা করে ফেললে, এর চেয়ে যে মূৰ্ছা হলে ভাল ছিল।
এক এক সময়ে আমিও তাই ভাবি। কিন্তু মূৰ্ছা যাওয়ার উপায় কি? কেরী সাহেব দেখা হলেই গীতটার জন্যে তাগিদ দেয়।
তাই বল, সেই তাগিদে লিখলে! তবু ভাল, আমি ভাবলাম, কি জানি, হয়তো বা এবারে জিজছ ভজবে।
পাগলি! পাগলি! আমার কাছে কৃষ্ট আর খৃষ্ট দুই-ই সমান। আসলে আমি যার ভক্ত তার নাম শুনবে?
না, সে পাপ নাম মুখে এনো না; তাছাড়া হাজারবার তো শুনেছি।
এই বলে টুশকি হাসল, গালে দেখা দিল টোল।
বসুজা বলল—ঐ কালিয়দহে যে ডুবে মরেছে তাকে টেনে তোলবার সাধ্য গোকুলের কেষ্ট কি ফিলিস্তানের খৃষ্ট—কারও নেই।
