ভায়া, আর সময় নেই, এখন আর ফিরিয়ে দিয়ে আসা চলে না। আর খুব বেশি অশান্তি দেখি তত নিয়ে গিয়ে টুশকির জিম্মা করে দেব।
ঐ অতটুকু ছোঁড়াকে দেবে টুশকির বাড়িতে!
আর কি উপায় আছে বল।
টুশকি রাজী হবে তো?
টুশকিকে তুমি জান না। এক রাত্রির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে যারা ওর কাছে যায়, তাদের প্রতি ওর দারুণ ঘৃণা। এই নিরীহ ছোকরাকে পেয়ে ও বেঁচে যাবে।
যায় ভালই। কিন্তু আমি প্রায়ই তোমার কথা ভাবি, কোন সুখে থাক ঘরে।
ঘরে আর থাকি কই! পাদ্রীদের সঙ্গেই তো দীর্ঘকাল ঘুরে বেড়ালাম। আর যখন একেবারে অসহ্য বোধ হয়, টুশকির কাছে গিয়ে পড়ে থাকি।
কি, একরাত্রির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে?
না ভাই, অনেক রাত্রির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। ও আমার অবস্থা কতক বোঝে!
তাহলে আমি এখন যাই, বলল পার্বতী।
কাল সাহেবের ওখানে আসছ তো?
না, দিনতিনেকের জন্য বাইরে যাচ্ছি, ফিরে এসে দেখা করব-বলে পার্বতী বিদায় নিল।
তখন রাম বসু ছোকরাটাকে কাছে ডেকে বলল—হ্যাঁ রে, তোকে কি বলে ডাকব?
সে বলল, ন্যাড়া বলেই ডেকো। মনে পড়ছে খুব ছেলেবেলায় যেন ঐ নাম ছিল।
তার মানে? ছেলেবেলার কথা কি মনে নেই তোর?
সে অনেক কথা, আর একদিন বলব। কিন্তু এত বেলায় তো নিয়ে চললে, গিন্নিমা রাগ করবে না তো?
না রে না, সে রকম লোকই নয়।
না হয়, ভালই। কিন্তু তোমাদের কথাবার্তা কিছু কিছু কানে ঢুকল যে!
শুনেছিস নাকি? চল্, তবে এবার দেখবি।
দু-চার মিনিট পরেই একধারে ডোবা অন্যধারে বাঁশঝাড় রেখে, মাঝখানের শুঁড়ি পথ ধরে দুজনে এসে দাঁড়াল হোগলাপাতায় ছাওয়া বাড়ির সামনে। রকে বসে খেলছিল চার-পাঁচ বছরের একটি বালক। সে চীৎকার করে উঠল-মা, বাবা এইছে।
ভিতর থেকে উত্তেজিত কাংস্যকণ্ঠে উত্তর এল—এই যে আমিও এইছি, তৈরী হয়েই ছিনু।
মুহূর্ত পরে খাটো মলিন শাড়ি পরা কৃশকায় এক রমণী বের হয়ে এল, হাতে তার এক মুড়ো ঝাঁটা।
কিন্তু একটির বদলে দুটিকে দেখে অভ্যস্ত কার্যে বাধা পড়ল, কাঁসার বাটি খন খন আওয়াজ করে উঠল-একা রামে রক্ষা নাই, সুগ্রীব দোসর!’ আজ আবার সঙ্গে কারপরদাজ আনা হয়েছে! ভাবা হচ্ছে যে, আমি দুজনের সঙ্গে পেরে উঠব না। দেখবি তবে, দেখবি?
এই বলে সে কোমরে কাপড় জড়াতে শুরু করল।
রাম বসু তাকে শান্ত করবার অভিপ্রায়ে বলল, গিন্নি, আগে শোন ছেলেটা কে, তার পর রাগ কর।
কাঁসার বাটি উগ্রতর রবে খন খুন করে উঠল-বটে বটে, আমি রাগ করেছি। আগে তো ময়লা সাফ করে নিই, রাগ করব তার পরে।
তাকে খুশি করবার ইচ্ছা ন্যাড়া সাষ্টাঙ্গে প্রণত হয়ে বলল, গিন্নিমা, পেন্নাম হই।
দূর, দূর! ছুঁস নে-বলে বসুপত্নী তিন হাত পিছিয়ে গেল। তার পর স্বামীর উদ্দেশে বলল, নিজে তো খিরিস্তানের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে জাতজন্ম খুইয়েছ, আবার সঙ্গে করে আনা হয়েছে একটা আস্ত খিরিস্তানকে।
ভুল করছ গিন্নি, ও খিরিস্তান নয়।
খিরিস্তান নয় তো কাটা-পোশাক গায়ে কেন?
কাটা-পোশাক পরলেই কি খিরিস্তান হয়? দাড়ি থাকলেই কি মুসলমান হয়?
এখন বসুর এক শ্যালকের দীর্ঘ শ্মশু ছিল। গিন্নি ভাবল, লক্ষাটা তারই প্রতি—
তবে রে ড্যাকরা মিন্সে, যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা—
সম্মার্জনী স্বামীর উদ্দেশে নিক্ষিপ্ত হল।
রাম বসু জানত, ঠিক কোটির পরে কি ঘটবে, স্বামী-স্ত্রীতে অনেকদিনের পরিচয় কিনা, সে চট করে মাথা নীচু করে নিয়ে অস্ত্রকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করল। ষ্টলক্ষ্য সম্মার্জনীকে লক্ষ্য করে ন্যাড়া হাততালি দিয়ে বলে উঠল—’বো-কাটা’–কিন্তু রাম বসু গীতো নিষ্কাম পুরুষের ন্যায় যেন কিছুই ঘটে নি এমনভাবে বলল, গিন্নি, বেলা অনেক হল, দুই ঘড়ি বাজে, খেতে দাও।
খেতে দাও! এতবেলা অবধি যেখানে ছিলে সেখানে গিয়ে গেলো গে—এখানে কেন?
এই বলে সদর্পে ঘরের ভিতরে গিয়ে দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিল।
রাম বসু বলল—আস্তে গিন্নি আস্তে, দবজা ভেঙে গেলে চোর-হঁচড় ঢুকবে।
ভিতর থেকে আওয়াজ এল-চোর-ছ্যাচড় ঢুকবে! কত সাত রাজার ধন মানিক এনে রেখেছ কিনা!
রাম বসু গৃহিণী-চরিত্রের অন্ধিসন্ধি জানত, বুঝল, আজ এখানে ভাত জোটবার আশা নেই। ন্যাড়ার হাত ধরে টেনে নিয়ে আঙিনার বাইরে এসে দাঁড়াল। বলল, চল।
কোথায়?
চল্ না! তোর বুঝি খুব খিদে পেয়েছে, মুখ শুকিয়ে গিয়েছে যে!
ন্যাড়া অল্পবয়সে অনেক দেখেছে কিন্তু ঠিক এহেন দৃশ্য তার অভিজ্ঞতার বহির্ভূত। সে বলল, দাদা, আমাকে এনেই এত গোলমালে পড়লে। আমাকে বরঞ্চ ছেড়ে দাও।
দূর বোকা, সে কি হয়, বিশেষ সাহেবের কাছ থেকে ভার নিয়েছি তোকে আশ্রয় দেব।
ও কাজটি পারবে না। আমাকে এ পর্যন্ত কেউ আশ্রয় দিতে পারে নি, না বাপ মায়ে, না সাহেব-সুবোয়। তুমিও পারবে না, মাঝ থেকে তোমার হেনস্তা হবে!
বসু কোন উত্তর দিল না দেখে ন্যাড়া শুধাল, তা এত বেলায় আবার চললে কার বাড়িতে?
টুশকির বাড়িতে।
সে কে হয় তোমার?
কেউ হয় না।
তবে বোধ হয় আশ্রয় মিলবে—ঐ যে বলে কিনা, আপন চেয়ে পর ভাল, পর চেয়ে বন ভাল।…তা সেখানেও আশ্রয় না মেলে কাছে তো সুন্দরবন রয়েছেই।
চল।
সে আবার কতদূর?
মদনমোহনতলা।
সে যে অনেক দূর!
হাঁটতে পারবি না?
অপ্রস্তুত হয়ে ন্যাড়া বলল, না না, এমনি বললাম, খুব হাঁটতে পারব, চল। তখন তারা মদনমোহনতলার দিকে হন হন করে হাঁটতে শুরু করল।
