কিন্তু ঐ হাসি দেখেই কি পেট ভরবে? খেতে হবে না?
তারপর একটু থেমে বলল—পাদ্রীগুলোর সঙ্গে মিশে তোমার এইটুকু উন্নতি হয়েছে যে, আমার হাতে ভাত খাও, নইলে শুধু কেষ্টর সাধ্য ছিল না আমার ছোঁওয়া খাওয়ায়।
তবে দেখ খৃষ্টের মহিমা!
না না, কথা শোন কায়েৎ দাদা, হিন্দু দেবদেবীর সম্বন্ধে গীত লেখ।
আরে পাগলি, হিন্দু দেবদেবী কি মাসিক কুড়ি টাকা বেতন দিতে পারবে?
মাসিক কুড়ি টাকা বেতন পেলে কি তুমি হাঙর কুমিরের স্তব রচনা করতে পার?
অবাক করলে। হাঙরের মুখে হাত ঢুকিয়ে বসে আছি, স্তব রচনা করা তো তুলনায় অনেক সহজ।
পোষা হাঙর হলে সবাই পারে।
হাঙর কুমির কখনও পোষ মানে? আসল কথা কি জান, হঠাৎ কখন বলে ফেলেছিলাম যে, জিজছ সম্বন্ধে গীত রচনা করেছি, তার পর থেকে দেখা হলেই কেরী সাহেব তাগিদ দেয়, কই মুন্সী, গীতটি কোথায়?
আচ্ছা, সাহেব বুঝি খুব ধার্মিক?
না হয়ে উপায় কি, যা খাণ্ডারণী ব্রাহ্মণী! তারপর টুশকির গাল দুটি একটু টিপে দিয়ে বলল, সবারই তো টুশকি নেই যে আশ্রয় দেবে; কাজেই জিজহের শরণ নিতে হয়।
খুব ভাল লোক নিশ্চয়, নইলে সাতসমুদ্র পার হয়ে ধর্মপ্রচার করতে আসে। দেখতে ইচ্ছে হয়।
দেখবে? আচ্ছা একদিন টমাস সাহেবকে আনব-টমাস, যার কাছে আগে চাকরি করতাম। কেরীকে পারব না।
সাহেব এসব জায়গায় আসবে?
আরে ওদের দেশে গুঁড়িবাড়ি, বেশ্যাবাড়ি, জুয়োর আচ্ছা, বারুদখানা, গির্জা সব পাশাপাশি একটা থেকে আর একটায় কেবল এক ধাপের ব্যবধান।
তবে এনো একদিন কাছাকাছি সাহেব দেখি নি।
খুব কাছাকাছি যাবার ইচ্ছা যেন!
নাও এখন রঙ্গ রাখ। ঐ শোন, শোভাবাজারের রাজবাড়ির ঘড়িতে দশটা বাজল। এখন ওঠ, খাবে।
আজ রাতে শোওয়াটাও এখানে।
বেশ, তাই হবে। নাও এখন চল।
রাম বসু কাগজখানি ভাঁজ করে চাপা দিয়ে রেখে উঠল রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে শুধাল, ন্যাড়া কোথায়?
খেয়ে শুয়েছে ওঘরে।
তার পর বলল, ছেলেটা বেশ।
তবে তোমার কাছেই থাকুক।
ওকে আবার কোথায় নিয়ে যাবে ভাবছ? এখানেই থাকবে—ওকে পেয়ে আমি বেঁচে গিয়েছি।
টুশকি, যার কেউ নেই তুমি তার আশ্রয়, তুমি লক্ষ্মী।
টুশকি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলল, যে তিন কুলে কালি দিয়েছে সে আবার লক্ষ্মী, সে আবার সরস্বতী! নাও ব’স।
বসুজা খেতে বসলে টুশকি পরিবেষণ শুরু করল।
.
১. ১৪ পাদ্রী ও মুন্সী
পূর্বোক্ত ঘটনার পরে পাঁচ-সাত দিন অতিবাহিত। এ কয়দিন রাম বসু কেরীর সঙ্গে দেখা করতে আসতে পারে নি। বসিরহাটে তার কিছু পৈতৃক জমি-জমা ছিল, হঠাৎ খবর পেয়ে সেখানে যেতে বাধ্য হয়েছিল। নতুবা নবাগত কেরীকে ছেড়ে দূরে থাকা তার স্বভাব নয়। পার্বতীকে সে বলল, ভায়া হে, একটি কথা মনে রেখ, দুধের ভাঁড় আর পাত্রী সাহেব এ দুটো বস্তুকে ছাড়া রাখতে নেই, যে পারবে এসে মুখ দেবে। কিন্তু এত সতর্কতা সত্ত্বেও মাঝখানে কদিনের জন্য পাত্রী সাহেবকে ছাড়া রাখতে সে বাধ্য হয়েছিল। ফিরে এসে দেখলে যে, না, দুধের ভাঁড় যেমন ছিল তেমনি আছে, কেউ মুখ দেয় নি।
আজ দুপুরবেলা স্মিথদের বাড়ির বাগানে একটি আমগাছের ছায়ায় বসে কেরী, টমাস ও রাম বসুর মধ্যে আলোচনা হচ্ছিল। তখনকার দিনে দুপুরে কলকাতা শহরে রাতের নিযুতি নামত। দেশীয় সমাজের আদর্শে নবাগত বিদেশীগণও বাংলাদেশের নিদ্রাভরা দ্বিপ্রহরের কাছে নতিস্বীকার করেছিল। কাজেই স্মিথদের বাড়িতেও নিযুতি। কিন্তু কেরী আনকোরা নবাগক, তাই দিবানিদ্রায় অভ্যস্ত নয়, আর তার উৎসাহের ধাক্কাতে টমাস ও রাম বসুর ঘুমোবার উপায় ছিল না।
শীতের মধ্যাহ্ন। অদূরশায়ী সুন্দরবনে উত্তরে হাওয়ার মরমর সরসর রব-একটা ঘুঘু অকারণে করুণ সুরে ডেকেই চলেছে।
কেরী বলল, মিঃ মুন্সী, এই দিনটির জন্য আমি বাল্যকাল থেকে অপেক্ষা করে ছিলাম।
রাম বসু বলল, ডাঃ কেরী, এসব লক্ষণ সাধারণত বাল্যকালেই দেখা দিয়ে থাকে। আমাদের শাস্ত্রে আছে যে, প্রহ্লাদ বাল্যকালেই ভক্তির লক্ষণ দেখিয়েছিল।
তার উক্তির অনুমোদনে টমাস মাথা নাড়ল, ভাবটা এই যে, এসব কথা তার অজানা নয়।
নিজের সমধর্মা একজনের উল্লেখে আহ্লাদিত কেরী ‘প্রহ্লাদ’ শব্দটা উচ্চারণ করতে চেষ্টা করল কিন্তু বার দুই ‘পেল্ল’ ‘প্রলা’ করেই ক্ষান্ত হল, বিজাতীয় শব্দটা তার জিহ্বার পক্ষে গুরুভার। টমাস তাকে সাহায্য করতে উদ্যত হল কিন্তু ততক্ষণে অসহায় কেরী প্রসঙ্গান্তরে পৌঁছেছে। কেরী বলল, বাল্যকালে পলাপিউরি গ্রামে একটি হিদেন বালককে দেখে প্রথম আমার মনে হিদেন সমাজে খ্রীষ্টধর্ম প্রচার করার বাসনা জাগ্রত হয়।
বিস্মিত রাম বসু সাগ্রহে বলে উঠল, কি আশ্চর্য ডাঃ কেরী, আপনার জীবনবৃত্তান্তের প্রত্যেকটি ঘটনার সঙ্গে আমাদের শাস্ত্রের কেমন গাঁঠে গাঁঠে মিল! গৌতম বুদ্ধের মনেও প্রথমে একটি সন্ন্যাসীকে দেখে সংসার ত্যাগের ইচ্ছা জেগেছিল।
এবারে বুদ্ধ নামোচ্চারণে কেরী সগর্বে উত্তীর্ণ হল, বললে, ইয়েস, বুঢ়া, তার কথা আমি পড়েছি।
টমাস মাথা নাড়ল–ভাবটা, আমরা বিশ্বাস করেছি।
তার পর কাপ্তেন কুকের ভ্রমণ-বৃত্তান্ত পড়ে জানলাম, জগতে হিদেনের সংখ্যা অজস্র। তখন মনে হল, হায়, সত্যধর্মে দীক্ষিত না হয়ে মরলে এরা যে অনন্ত নরক ভোগ করতে বাধ্য হবে। তখনই স্থির করলাম, যাব হিদেনদের দেশে, সত্যনাম দিয়ে দুর করব তাদের নরকভোগ। এমন সময়ে-দেখ মুন্সী, করুণাময় ভগবানের কি দিব্য অভিপ্রায়-এমন সময়ে ব্রাদার টমাসের সঙ্গে পরিচয় ব্যাপটিস্টমণ্ডলীর এক সভায়।
