মোতি রায় বলল, আর একটু সবুর করুন, মাধব এসে পড়ুক।
এমন সময়ে বাইরে বন্দুকের আওয়াজ উঠল।
দোতলার ঘরটায় দরজা বন্ধ করে রেশমী বসে ছিল। খুদিরাম বারে বারে দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলে গিয়েছে, শীগগির সাজপোশাক সেরে নাও, বাবুরা বসে আছে।
রেশমী বারে বারে বলেছে, এই হল আমার। ততক্ষণ সবাই নিকি বাঈজীর গান শুনুক না।
কেন যে সে দেরি করছে নিজেই তা ভাল করে জানে না। বলা বাহুল্য, সাজপোশাক সে করে নি, নিজের শাডিখানা মাত্র পরেছিল।
ঘরটার দক্ষিণ পশ্চিম খোলা। দক্ষিণের জানলা দিয়ে কলকাতার দিকটা দেখা যায়, পশ্চিমের জানলা দিয়ে দেখা যায় ঠিক সম্মুখে গঙ্গা।
দক্ষিণের জানলার ধারে সে দাঁড়িয়ে আছে। কোনও আশা-ভরসা মনে পোষণ করছিল কি? টুশকি গিয়ে খবর দেবে, দলবল নিয়ে উদ্ধারের জন্য আসবে জন, এমন আশা-পোষণ বাতুলতা মাত্র। তবু সেরকম ক্ষীণ আশা হয়তো ছিল মনে, সময়-বিশেষে মানুষ বাতুল। লতার বেয়ে ওঠবার জন্যে সরু একখানা কঞ্চির আবশ্যক হয়; আশা লতার পক্ষে সেটুকুও আবশ্যক। কিন্তু দক্ষিণদিকে দলবল কেন, একটা মানুষ পর্যন্ত নেই। সে ভাবল, ভালই মল, টুশকি বেঁচে গেল। আর জন! জনের কথা মনে হতেই দু চোখ জলে ভরে উঠল। এ হেন সময়ে, এ হেন লোকের স্মরণে অশুদগম! ভালবাসা যে একমুখী পথ।
এবারে সে পশ্চিমের জানলায় এসে দাঁড়াল। ওপারে জনশূন্য তরুশূন্য দিগন্তে মহাসমারোহে সূর্য অস্তায়মান। স্তরে স্তরে মেঘপুঞ্জ রচনা করেছে বিরাট সৌধ। সূর্য তাকে স্পর্শ করবামাত্র বর্ণবিপর্যয় শুরু হল পাথরগুলোয়। কালো হয়ে উঠল সাদা, সাদা হয়ে উঠল ভাস্বর, ক্ৰমে সমস্ত উজ্জ্বল, প্রোজ্জ্বল, সমুজ্জ্বল। ধীরে ধীরে আগুন ছড়িয়ে পড়ল মহল থেকে মহলে, শিখর থেকে শিখরে, এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। কোন রূপকথার রাজপুরী পুড়ে যাচ্ছে দৈবীশিখায়। খান খান হয়ে, চুর চুর হয়ে ভেঙে ভেঙে পড়ছে প্রাসাদ, বলভি, অলিন্দ, বাতায়ন, গম্বুজ, শিখর, কার্নিস। গঙ্গাবকে বিস্তারিত হয়ে গেল স্বর্ণময় সেতু, ঠেকল এসে এপারে ঠিক বাগানবাড়ির ঘাটে। অবাক চোখে তাকিয়ে আছে রেশমী। ক্রমে সব ম্লান, নিস্তেজ, নিষ্প্রভ হয়ে গেল। তবু সে তাকিয়েই রইল। এ কি মহান্ ইঙ্গিত ভাস্করের! এ কি পথনির্দেশ মৃত্যুর, মুক্তির!
এমন সময়ে চমকে উঠল সে বন্দুকের শব্দে; যে-শব্দে নীচতলায় বাবুর দল চমকে উঠেছিল, এ সেই আওয়াজ।
মোতি রায় একজন মোসাহেবকে বলল, মাধব এসে পৌঁছল বোধ হয়, যাও তাকে অভ্যর্থনা করে নিয়ে এস।
লোকটা যেতে না যেতেই বাইরে বিষম কোলাহল উঠল, বেশ একটু চড়া রকমের কোলাহল। ভিতরে বাবুরা বলে উঠল, মাধব রায়ের এ কি রকম আচরণ, যেন ডাকাত পড়ল!
বাইরে ঘোড়ার হেষা, কোচম্যান আদালী সিপাহী বেহারার হাঁক-ডাক অন্ধকারকে যেন গুলিয়ে ঘেঁটে দিল।
ব্যাপার কি হে?
বাবুরা চঞ্চল হয়ে উঠল, কেউ কেউ অতি কষ্টে দেহটা টেনে দরজায় এসে দাঁড়াল। এতক্ষণ চণ্ডী বক্সী নজরবন্দী হয়ে এক কোণে বসে ছিল, এখন প্রথম সুযোগেই গৃহত্যাগ করে অন্ধকারে গা-ঢাকা দিল।
বাইরে মাধব রায়ের দল আর স্পেকারের সিপাহীদের সঙ্গে বাগানবাড়িতে আগত বাবুদের আদালী চাপরাসী বেহারা বরকন্দাজদের সংঘর্ষ বেধে গিয়েছে। সমস্ত সংঘর্ষেরই সূচনার ইতিহাস অন্ধকারাচ্ছন্ন। কুরুক্ষেত্রের মহাহব থেকে পাড়ার বেলগাছটা নিয়ে হাঙ্গামা কোনটাই পূর্বপরিকল্পনা-প্রসূত নয়। যুযুধান দুটো দল মুখোমুখি হওয়াটাই আসল, তার পরে লাঠালাঠি কাটাকাটি সে তো নিশাবসানে দিবাসমাগমের মত সুনিশ্চিত।
মাধব রায় আর স্পেকারের জনপঞ্চাশেক লোক—তার মধ্যে অনেকগুলোই অশ্বারোহী-বাগানবাড়িতে এসে পৌঁছলে একটা শোরগোল পড়ে যায়। এরা আবার কারা এল? হয়তো ঘোড়াগুলো ক্ষেপে উঠেছিল, হয়তো দু পক্ষের বরকন্দাজ “তেরি মেরি” হয়েছিল, হয়তো আদালী চড়া মেজাজে কথা বলেছিল, অমনি ব্যস শুরু হয়ে গেল। বন্দুক ছুঁড়ল স্পোকার।
মোতি রায়ের বরকন্দাজেরাও হুঁডল বন্দুক। তারা জানত না যে, কোম্পানির সিপাহী এসেছে। তখন দু পক্ষের বন্দুক ছোড়বার পাল্লা পড়ে গেল। সৌভাগ্যবশত সবগুলোই ফাঁকা আওয়াজ। বন্দুকের আওয়াজে ফিটন বুহামের ঘোড়াগুলো ক্ষেপে উঠে এদিকে ওদিকে ছুটে চলে গেল, পালকির বেহারাগুলো মুক্তিদায়িনী গঙ্গায় ঝাঁপিয়ে পড়ল। চারিদিকে ব্যবস্থা ও অবস্থা লণ্ডভণ্ড হওয়ার মত।
এমন সময়ে অনেকগুলো ঘোড়ার পায়ের দড়বড়িতে সকলে চমকে উঠল, আবার কারা আসে?
জনের দলবল এসে পৌঁছল।
রেশমী এসব কাণ্ডের মর্ম বুঝতে পারল না। গোলমালটা তার কানে প্রবেশ করল, কিন্তু তার অর্থটা নয়। নিমজ্জমান ব্যক্তির বিশ্বাস করতে সাহস হয় না যে, তার উদ্ধারের আয়োজন চলছে। বিশেষ তখন রেশমী নিজের সঙ্ক সাধনের জন্য দোতলার সে ঘরটি পরিত্যাগ করে বেরিয়ে গিয়েছিল।
টুশকি জনকে ইঙ্গিতে দোতলার ঘরটা দেখিয়ে দিল—ঐ ঘরে রেশমী আছে।
তখন জন, মেরিডিথ, অগলার, প্রেস্টন, রাম বসু ও ন্যাড়া ছুটল দোতলার ঘরটা লক্ষ্য করে, পথপ্রদর্শিকা টুশকি।
বেচারামবাবুর দল যে যেখান দিয়ে পারল বেরিয়ে ছুটল গঙ্গার দিকে, গঙ্গা হিন্দুর শেষ আশ্রয়। অন্ধকারে ছুটতে ছুটতে বেচারাম বলে উঠল, “ওরে, আয়ান এল ভীষণরূপে দড়বড়িয়ে ঘোড়া, কলির কেষ্ট পালা এবার নইলে হবি খোঁড়া।” বেচারাম জাত-কবি, সঙ্কটকালেও ছড়া আওড়ায়।
