সবাই গেল, গেল না কেবল মোতি রায়। মুহূর্তে গোলমালের অর্থ বুঝল সে। বলে উঠল, ওহো, সে হারামজাদা মেধোটা এসেছে আমার শিকার ছিনিয়ে নিতে! রহে পাজি!
এই বলে সে ছুটল দোতলার ঘরটার দিকে। মোতি রায় ও জনেরা ঠিক একই সময়ে ঘরটায় ঢুকল—বিপরীত দুই দিক থেকে।
সবাই দেখল-ঘর শূন্য।
পরমুহূর্তে টুশকি চেঁচিয়ে বলে উঠল, ঐ মোতি রায়।
মোতি রায়! জন ছুটে এসে মারল তাকে এক লাথি।
রেশমী কোথায়, বল্?
কে দেবে উত্তর? ধরাশায়ী মোতি রায় তখন সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে।
আগুন! আগুন!
চারিদিক থেকে নানা কণ্ঠে চীৎকার উঠল, আগুন! আগুন! বেরিয়ে এস, বেরিয়ে এস!
ক্ষণকালের জন্য জনেরা হতভম্ব হয়ে গেল, তার পরে দেখল যে, সত্যই নীচতলায় আগুন লেগেছে।
সকলে তখন বাড়ি ছেড়ে বের হয়ে যাচ্ছে; জনেরা ভাবল, রেশমীও নিশ্চয় বেরিয়ে গিয়েছে, তারাও দ্রুত বেরিয়ে এল।
মোতি রায়ের লোকজন মোতি রায়কে টেনে বের করল।
কিন্তু রেশমী কোথায়? কোথাও তো নেই! কিংবা প্রকাণ্ড জনতার মধ্যে অন্ধকারে কোথাও থাকলেও খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। রাম বসু, টুশকি, ন্যাড়া “রেশমী”, “রেশমী দি” বলে চীৎকার শুরু করল, কিন্তু জনতার কোলাহল ছাপিয়ে সে ডাক রেশমীর কানে পৌঁছবার কিছুমাত্র সম্ভাবনা ছিল না।
আগুন! আগুন!
সমস্ত নীচতলাটা আগুনে ছেয়ে ফেলেছে। শত্রু-মিত্র ভুলে তখন সবাই তাকিয়ে আছে প্রবর্ধমান অগ্নিকুণ্ডের দিকে।
কেমন করে লাগল? কে লাগাল? মদের ভাঁড়ারে আগুন, নাচঘরে আগুন, আতসবাজিগুলোয় আগুন। সমস্ত দাউ দাউ করে জ্বলছে। জানালা দিয়ে, দরজা দিয়ে, ফাঁক-ফুকর দিয়ে শত শত অগ্নিময় জিহা লক লক করে বের হচ্ছে, আকাশ আচ্ছন্ন ধোঁয়ায়।
তুবড়িগুলো যেটা যে-ভাবে ছিল অগ্নি-প্রস্রবণ হোটাচ্ছে। হাউইগুলো পাগলের মত হুসহাস করে অন্ধকারকে ঢু মেরে ছুটছে। ঝাড়লণ্ঠন, আয়না, দেয়াল-জোড়া ছবিগুলো খান খান হয়ে ঝন ঝন শব্দে ভেঙে ভেঙে পড়ছে।
ক্ষণকালের জন্য বৃহৎ জনতা স্তব্ধ হয়ে গেল, জনেরা ভুলে গেল রেশমীর প্রসঙ্গ। আগুনের সুযোগ নিয়ে রেশমী পালিয়েছে, কাছেই কোথাও আছে—ভেবে জনেরা নিশ্চিন্ত হয়েছিল।
এমন সময়ে আকাশের দিকে ইঙ্গিত করে ন্যাড়া বলল, দেখ টুশকি দি, লকেট বাজিগুলোর কি বাহার!
একটা লকেট বাজি ফেটে গিয়ে আকাশে আগুনের অক্ষরে লিখে দিল ‘রেশমীমিলন’। আর একটা, আর একটা, আর একটা! আকাশ অগ্নিময় ‘রেশমী’ নামে গেল ভরে।
সেই অগ্নিময় প্রভায় তেতলার ছাদ লক্ষ্য করে টুশকি চীৎকার করে উঠল, কায়েৎ দা, ঐ যে রেশমী!
সত্যিই তো রেশমী।
ওরে রেশমী, নেমে আয়!
রেশমী, নেমে আয়, নেমে আয়!
এতক্ষণে রেশমী দেখতে পেল যে আলোয় ওরা দেখেছিল তাকে, সেই আলোতেই সে দেখল ওদের দেখল যে রাম বসু, টুশকিরা এসেছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে তার কানে প্রবেশ করল জনের করুণ মিনতি-রেশমী, নেমে এস! রেশমী, নেমে এস!
এ পর্যন্ত রেশমী ছিল নিশ্চল, নির্বিকার, পাষাণবৎ। জনের কণ্ঠস্বর কানে যেতেই পাষাণ গলল, সে বলে উঠল, জন, জন, তুমি এসেছ?
রেশমী, আমি ভুল বুঝেছিলাম, ভুল করেছিলাম, নেমে এস।
রেশমী বলল, জন, তুমি এসেছ? আবার আমার বাঁচতে ইচ্ছা করছে, আবার আমার তোমার বুকে ফিরে যেতে ইচ্ছা করছে, কিন্তু তা বুঝি হবার নয়।
জন আর্তস্বরে বলে উঠল, এখনও সময় আছে, নেমে এস নেমে এস!
না জন, আর সময় নেই, নিজের হাতে লাগিয়েছি আমি আগুন, এ আগুন এখন আমার সাধ্যের অতীত।
তবে দাঁড়াও আমি যাচ্ছি, বলে জন ছুটল সেই অগ্নিকাণ্ডের দিকে।
I say, John–পাগলের মত আচরণ কর না। এ অগ্নিকুণ্ডে প্রবেশ করলে বাঁচবে।
আমি বাঁচতে চাই না, আমি রেশমী চাই, বলে জন এগিয়ে গেল।
তখন অগলার, প্রেস্টন ও মেরিডিথ তিনে মিলে জনকে আটকে রাখল। ওদের হাত ছাড়াবার উদ্দেশ্যে ধস্তাধস্তি করতে করতে জন বলল, তোমরা বুঝছ না, রেশমীকে ছাড়া আমার জীবন নিরর্থক। ছাড়, ছাড়।
জনের প্রচেষ্টা লক্ষ্য করে রেশমী বলল, জন, এখানে প্রবেশ করলে মরবে। মরে কি লাভ? আমিও আর মরতে চাই না, কিন্তু এখন আর বাঁচবার পথ নেই।
সবাই দেখল, রেশমী অত্যুক্তি করে নি। একতলা দোতলা ভয়াবহ অগ্নিকুণ্ডে পরিণত। পলায়নের পথ বন্ধ করে আগুনের শিখা তেতলার ছাদে রেশমীর পায়ের কাছে পৌঁছেছে।
ন্যাড়া আগুন টপকাতে গিয়ে জখম হল, তাকে সবাই সরিয়ে নিয়ে এল। আর জন কিছুতেই ছাড়া পেল না বন্ধুদের হাত থেকে।
পাগলের মত সে বলতে লাগল, মেরিডিথ, প্রভুর দোহাই দিয়ে বলছি, একটিবার আমাকে ছেড়ে দাও, আমি ওকে নামিয়ে নিয়ে আসি, না হয় দুজনে এক শিখায় প্রাণ বিসর্জন করি।
রেশমী ধূমনিরুদ্ধ কণ্ঠে বলল, জন, বড় দুঃখে মরতে যাচ্ছিলাম, এখন বড় আনন্দে মরছি। কখনও ভাবতে পারি নি, জীবন-পেয়ালার শেষ চুমুকে এমন অক্ষয় অমৃত ছিল। মরবার আগে জেনে গেলাম যে, তোমার ভালবাসা হায়াই নি। এর চেয়ে আর কি বেশি পেতাম বেঁচে থাকলে।
তখনও ছাড়া পাওয়ার আশায় জন ধস্তাধস্তি করছে। টুশকি মাথা কুটছে। ন্যাড়ার দৈহিক যাতনাকে ছাড়িয়ে গিয়েছে মানসিক দুঃখ, সে লুটিয়ে লুটিয়ে কাঁদছে। কেবল নিশ্চল কাষ্ঠপুত্তলিকাবৎ দণ্ডায়মান রামরাম বসু।
তখন শত্রু-মিত্র ভেদাভেদ ভুলে সেই প্রকাও জনতা অসহায় ভাবে তাকিয়ে রইল তেতলার ছাদের দিকে। মৃত্যুর অগ্নিনাগিনীর বলয়-বেষ্টন ক্ৰমে সংকীর্ণতর হতে হতে স্পর্শ করেছে রেশমীর অঙ্গে। তার পায়ের নখ থেকে মস্তকের প্রতি কেশ দেদীপ্যমান, তার তরুণ মুখচ্ছবির প্রত্যেকটি রেখা দৃষ্টিগম্য, মৃত্যুর রক্ত-পদ্মের মধু কোষের উপরে দণ্ডায়মান সে মূর্তির কি দিব্য কাত্তি। আকাশজোড়া অন্ধকারের পটে ঐ ভাস্বতী মূর্তিটি আজ যেন সমগ্র চরাচরের একমাত্র দর্শনীয় সামগ্রী।
