রাম বসু জনকে বলল, জন, এই মহিলাটি হচ্ছে রেশমীর আপন বোন। এদের জীবনে অনেক কমেডি অব এর, অনেক রোমান্স আছে, সে-সব একসময়ে খুলে বলব, আপাতত এইটুকুতেই সন্তুষ্ট থাক।
তার পরে সংক্ষেপে জানাল যে, টুশকি তাকে রেশমীর সন্ধান দেবার জন্যেই যাত্রা করেছিল।
জন টুশকিকে অভিবাদন করে জানাল যে, তার মুখে রেশমীর সঠিক সংবাদ পেয়ে অনেকটা নিশ্চিন্ত হল, কিন্তু সশরীরে তাকে পাষণ্ডটার কবল থেকে উদ্ধার না করা পর্যন্ত সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত হতে পারছে না।
তার পরে জন মেরিডিথ, অগলার ও প্রেস্টনকে সব খুলে বলে জানাল যে, এই মহিলাটি রেশমীর সহোদরা।
মেরিডিথ প্রেস্টন ও অগলারকে একান্তে ডেকে বলল, ঊষার সৌন্দর্য প্রভাতের সৌন্দর্যের সূচনা দিচ্ছে, জন ঠকে নি।
প্রেস্টন বলল, এরকম মেয়ের জন্যে লড়াই করে আনন্দ আহে।
অগলার বলল, শুধু লড়াই কেন, মরতেও আনন্দ, নইলে ইলিয়াড কাব্য লেখা হত না।
রাম বসু বলল, আর দেরি নয়।
জন বলল, নিশ্চয়।
তার পর সে হাঁকল, ব্যাটেলিয়ন, টেনশন-ব্যাটেলিয়ন, মা–র্চ।
মদনমোহনতলা ও বাগবাজার বিস্মিত উচ্চকিত করে বিচিত্র বাহিনী আবার যাত্রা শুরু করল সম্মুখে বাগবাজারের খাল।
রাম বসু বলল, টুশকি, তুই সঙ্গে যাবি?
বাঃ, সঙ্গে যাব না তো কি এখানে থাকব।
তুই যে ঘোড়ায় চড়তে পারিস না।
হেঁটেই যাব।
হেঁটে যাবি কি রে, ঘোড়ার সঙ্গে হেঁটে পারবি কেন?
তখন সমস্যার সমধান করে দিল কাদির মিঞা। সে বলল, বিবিজান যদি তার ‘ঘোড়ায়’ চাপে তবে সে ‘ঘোড়াটা দিতে পারে।
টুশকি বলে উঠল, কায়েৎ দা, এ কিরকম ঘোড়া!
কাদির আলী একগাল হেসে বলল, সোয়ারের গৌরবে বেটার গাধাজন্ম ঘুচে যাবে। মেহেরবানি করে চাপতে হুকুম হক।
রাম বসু বলল, মিঞাসাহেবের যৌবন যেন এখনও যায় নি।
বহুৎ আচ্ছা মুলীজি! বাহাদুর আদমীর যৌবন আর বীরত্ব কখনও যায় না।
অগত্যা টুশকি ‘ঘোড়া’য় চাপল।
রাম বসু বলল, যাঃ, বেটার গাধাজন্ম ঘুচে গেল, পরজন্মে উচ্চঃশ্রবার বাচ্চা হয়ে কার্তিক-গণেশকে পিঠে করে ছুটোছুটি করে বেড়াবে।
টুশকি বলল, কায়েৎ দা, এমন দুঃখের সময়েও এমন সব হাসির কথা মনে আসে তোমার!
ঐ যে শুনলি না কাদির আলীর কথা। বাহাদুর আদমীর রস আর রঙ্গ কখনও যায় না।
পথ শেষ হয়ে এল, সূর্য ডোবে-ডোবে, অদূরে কাশীপুরের বাগানবাড়ির প্রকাণ্ড সৌধ।
.
৪.২২ অগ্নিদেব
বাগানবাড়িতে একতলার প্রকাও নাচঘরের পাঁচটা ঝাড়ের আলোয় শুভ্র জাজিমে আসীন, শয়ান, অর্ধশয়ান “বাবু”দের সোনার চেন, হীরার আঙটি, কোচানো চাদর, গিলে করা জামা, কুঞ্চিত কেশদাম, মসৃণ টাক, নিমীল-উন্মীল রক্তাভ নেত্র অপূর্ব শোভা বিস্তার করছে। সেই সঙ্গে ফুলের মালার, আতর-গোলাপের আর সুরার গন্ধ টানাপাখার বাতাসের তালে তালে হিল্লোল্লিত। অদূরে উপবিষ্ট নিকি বাইজী তানপুরা নিয়ে গান করছে “বাজে পায়োরিয়া ঝনন নন।” অনেক বাবু ইতিমধ্যেই স্থান-কাল-পাত্র সম্বন্ধে গতসম্বিৎ; যাদের চৈতন্য এখনও মহাপ্রলয়ে নিমজ্জমান নয়, তাদের কেউ কেউ তাকিয়ার উপরে টোকা মেরে গানের সঙ্গে তাল দেবার চেষ্টায় নিযুক্ত, কেউ কেউ তাল রক্ষার চেষ্টায় সমে’ পৌঁছবার আগেই চুলে পড়ছে; কোন কোন বাবু খলিতবচনে কিছু বলবার চেষ্টা করছে, কিন্তু সুরবিকল বাগযন্ত্র অন্তরায়। এই বাবুসমাজের মাঝখানে উচ্চাবচ গিরিশৃঙ্গসমাজে কাঞ্চনজঙ্ঘার ন্যায় মোতি বিরাজমান। লোকট সুরার নীলকণ্ঠ, সকলের চেয়ে বেশি পান করেও এখনও পুরোপুরি সজ্ঞান। তার হাতের গোটা আষ্টেক আঙটিতে, হীরের বোতামে, সোনার চেনে, সুচিকণ টাকে বিদ্যুৎ খেলছে, রক্তাভ চক্ষুদ্বয় মঙ্গলগ্রহের মত নির্নিমেষ; ছয় রিপু তার সমস্ত মুখে অসংখ্য ছাপ মেরে দিয়েছে—হাত-ফিরতি চিঠিতে যেমন হয়ে থাকে। রাত্রি প্রথম প্রহর।
এমন সময়ে বেচারামবাবু বলে উঠল, রায়মশায়, এইসব পায়োরিয়া-টায়োরিয়া এখন থাকুক, এবারে বাঘের খেলা আরম্ভ করতে হুকুম দিন।
বাঘ শব্দটা জনৈক বাবুর সুপ্তচৈতন্যে সুড়সুড়ি দেওয়াতে সে জেগে উঠল। বাঘ শব্দটা তখনও তার মগজে ঘুরছে, চীৎকার করে বলে উঠল, “বাঘের বিক্রম সম মাঘের হিমানী।” তার সুরাজড়িত হুঙ্কারে অনেক বাবুর নিদ্রাভঙ্গ হল, বেচারামের দাবির সমর্থনে সবাই বলে উঠল, হাঁ হাঁ, বাঘের খেলা আরম্ভ হক, নিকি বাইজীর গান শুনতে আমরা আজ আসি নি।
বাঘের খেলা সার্কাসের শেষ খেলা। বর্তমান প্রসঙ্গে আসরে রেশমীর আগমন।
মোতি রায় বলল, আপনারা আর একটু অপেক্ষা করুন, মাধব রায় আগে আসুক।
বেচারাম বলে উঠল, কেন বাবা, মাধবের চেয়ে কি আয়ান ঘোষের দাবি কম?
আবার সকলে একযোগে বলে উঠল, হাঁ হাঁ, মাধবের চেয়ে আয়ান ঘোষের দাবি বেশি।
বেচারামবাবু গান ধরল, “রাধা তুই রেশমী হলি কলকেতাতে, জীবনে সুখ কি বল না পড়লি যদি আমার পাতে।”
সমবেত ঐকতানে সকলে গেয়ে উঠল, “রাধা তুই রেশমী হলি কলকেতাতে।”
বেডে ভাই, বেড়ে হয়েছে!
বলিহারি যাই!
তখন বাবুগণ রেশমীর রূপ, গুণ, বয়স ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা আরম্ভ করল।
কেউ বলল, এ চীজ মিলল কোথায়?
কেউ বলল, চোরের উপরে বাটপাড়ি আর কি!
কেউ বলল, মেয়েটা খাঁটি ফিরিঙ্গী, চন্দনগর থেকে চুরি করে আনা।
সকলে একসঙ্গে বলে উঠল, রায় মশায়, এবার আর সবুর সয় না, এবারে বের করুন আপনার রেশমী পুতুল।
