দেশে থাকতে হে-মার্কেট থিয়েটারের এক অভিনেত্রীর রুপে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। নাটকে সাজত সে গ্রীক পুরাণের দেবী। কি রূপ, কি পোশাক! অনেক অনুনয়-বিনয় ও অনেক বেশি অর্থব্যয় করে এক রাত তার কাছে থাকবার অধিকার পেয়েছিলাম।
থাক, থাক। বলে ওঠে জন।
থাকবে কেন! অনুবাদ মানে ভাষার পোশাক খুলে নেওয়া—এই তো? সেই গ্রীক দেবীর অনুবাদ করতে পেলাম কঙ্কালসার এক বুডি। আক্কেল-সেলামী রেখে সরে পড়লাম। সেই থেকেই অনুবাদের উপর আমার বিষম বিতৃষ্ণা, বিশেষ দেবদেবী সম্পর্কিত হলে।
সকলে হো হো করে হেসে ওঠে।
রামরাম বসু বলে-তবে না হয় থাক, কিন্তু সুরটা লাগছে কেমন?
খুব সামরিক। প্রত্যেক গিটকিরিতে সঙ্গিনের খোঁচা মারছে।
“আয় মা সাধন সমরে,
দেখি মা হারে কি পুত্র হারে!”
জনের সৈন্যদল জোড়াসাঁকোর একটি গলির মুখে এসে পড়তে একখানা সুদৃশ্য ব্রহাম গাড়ির বাধা পেল। গাডিখানা গলি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় পড়ছিল। সৈন্যদের হল্লায় ব্রহাম থেকে মুখ বার করে দিল দুইজন সুবেশ সুপুরুষ যুবক।
দ্বারিকবাবু, ব্যাপার কি?
কেমন করে বলব দেওয়ানজী!
তা বটে। কলকাতায় এ তোমাদের নিত্যকার ব্যাপার।
তা হলেও আজ কিছু বাড়াবাড়ি দেখছি, দেওয়ানজী।
যাই বল দ্বারিকবাবু, আমরা রংপুরে বেশ আছি, এমন নিত্য অশান্তি সেখানে নেই।
দেওয়ানজী, সাহেবগুলোর স্পর্ধা বেড়ে উঠেছে।
তার প্রতিকার কি জান? আমাদের স্পর্ধা তার চেয়েও বেশি বাড়িয়ে তোলা।
তেমন আশা করার মত বুকের পাটা নেই।
হবে হবে, কালে সব হবে দ্বারিকবাবু, একটা পাখী যখন ডেকেছে, হাজার পাখী ডাকবে। ভোর হতে আর বিলম্ব নেই।
সৈন্যবাহিনী চলে যায়, গাড়িখানা বড় রাস্তায় পড়ে একটা গলিতে মোড় ফিরে চলে যায় পূর্বদিকে।
কিছুক্ষণের মধ্যে জনরা সকলে মদনমোহন তলায় এসে পৌঁছয়।
রাম বসু জনকে মদনমোহনের মন্দিরের পরিচয় দিতে উদ্যত এমন সময় ন্যাড়া চীৎকার করে ওঠে, কায়েৎ দা, ঐ যে টুশকি দি!
টুশকি জনের অফিসের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল, এমন সময়ে জনতায় বাধা পেয়ে পাশ দিয়ে দাঁড়িয়েছিল, আর ঠিক সেই সময়ে পড়ে গেল ন্যাড়ায় চোখে।
সে উচ্চস্বরে হাঁকল, ব্যাটেলিয়ন, হ–ল্ট।
ঘোড়া থেকে নেমে রাম বসু যায় টুকরি কাছে। রেশমীর আশ্রয়দাত্রী টুশকির নামটা শুনেহিল জন রাম বসুর মুখে, কাজেই জন বুঝল যে, ঘটনা এবার চূড়ান্ত পরিণামের দিকে ঘনিয়ে উঠেছে।
.
মাধব রায় জলসার নিমন্ত্রণ-চিঠি পেয়ে ছুটে উপস্থিত হল শোভাবাজারে, রাধাকান্ত দেবের কাছে। বলল, হুজুর, আজ কাশীপুরের বাগানবাড়িতে মেয়েদের উপর অত্যাচার হওয়ার আশঙ্কা আছে, দেখুন চিঠি।
রাধাকান্ত দেব চিঠিখানা পড়ে বললেন, লোকটার আস্পর্ধা তো কম নয়! একবারে রোঘো ডাকাতের মতন নোটিশ দিয়ে অত্যাচার করে! আচ্ছা তুমি এক কাজ কর, আমার চিঠি নিয়ে যাও লাট কাউন্সিলের সেক্রেটারি ম্যাকার্থির কাছে।
রাধাকান্ত দেবের চিঠি নিয়ে মাধব রায় গেল ম্যাকার্থির কাছে। ম্যাকার্থি তখন স্পেকারের নামে চিঠি লিখে মাধব রায়ের হাতে দিল। চিঠিতে লিখে দিল যে, সে যেন অবিলম্বে পুলিস নিয়ে কাশীপুরের বাগানবাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হয়, মেয়েছেলের উপর অত্যাচার নিবারণ করতে হবে।
স্পেকারের তলে তলে সহানুভূতি ছিল মোতি রায়ের সঙ্গে। কিন্তু হলে কি হয়, লাট কাউন্সিলের সেক্রেটারির চিঠির মূল্য মোতি রায়ের গোপন অর্ঘ্য নিবেদনের চেয়ে অনেক বেশি। সে তখনই জন-পঁচিশেক পুলিস নিয়ে রওনা হল কাশীপুর অভিমুখে।
এতক্ষণে মাধব রায়ের দৌত্য সফল হল। এবারে সে ফিরে গেল নিজের বাড়িতে।
সবাই বলল, যাবে না আজ কাশীপুরের বাগানবাড়িতে?
মাধব রায় বলল, বাপ রে, মোতিদার নিমন্ত্রণ, না গেলে রক্ষে আছে!
তবে এত পাইক-বরকন্দাজ সঙ্গে নিচ্ছ কেন?
আরে বাপু, রাজার নিমন্ত্রণে রাজার মত যেতে হয়। তার পরে হেসে বলে, রাজা হই রাজার ভাই তো বটি!
মাধব রায় জনপঁচিশেক পাইক-বরকন্দাজ নিয়ে ব্রহাম গাড়ি চড়ে রওনা হয় বাগানবাড়ির দিকে।
সমস্ত কলকাতা শহর আজ কাশীপুর-অভিমুখী।
টুশকি রাম বসুর কাছে সংক্ষেপে গত একমাস কালের ঘটনা বর্ণনা করল। সৌরভী যে রেশমী, রেশমী যে তার সহোদরা, সে যে জোডামউ গাঁয়ের মেয়ে, সমস্ত খুলে বলল, কিছুই গোপন করল না, আর গোপন করার কারণও ছিল না।
স্বাভাবিক অবস্থা হলে এসব বর্ণনা ও ব্যাখ্যায় কিছু সময় লাগত, কিন্তু তড়িঘড়ি অবস্থা, তাই সমস্ত দ্রুত নিঃশেষ হল। সঙ্কটকালে মানুষ এক পদক্ষেপে দশধাপ অতিক্রম করে।
রাম বসু ও ন্যাড়া স্তম্ভিত হয়ে শুনল, কাহিনী শেষ হয়ে গেলেও কথা সরল না তাদের মুখে। ন্যাড়া প্রথমে কথা কইল, বলল, এ যেন একটা রূপকথা, কেবল সেই হারানো ভাইটিকে পাওয়া গেলেই আমার কথাটি ফুরোল নটে গাছটি মুড়োল’ হত।
বহুদর্শী রাম বসু দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলল, সংসারের রূপকথা অত শীঘ্ন ফুরোয়, আর সংসারের নটে গাছের ডালপালাগুলোও খুব জটিল।
তার পর বলল, চল, তোকে জন সাহেবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই।
ইতিপূর্বেই জনের পরিচয় ও তাদের সদলবলে আগমনের উদ্দেশ্য বর্ণনা করেছে রাম বসু। টুশকিও বলেছে যে, সে জনকে খবর দেবার উদ্দেশ্যেই রওনা হয়েছিল, তবে রাম বসুর সাক্ষাৎ যে পাবে এমন আশা ছিল না।
