এমন বিচিত্র সৈন্যবাহিনী চালনা করবার সৌভাগ্য ক্লাইভ বা নেপোলিয়নের ঘটে নি। জাত্যাংশে, শিক্ষায়, পোশাকে, অস্ত্রে, অশ্বের উৎকর্ষে বৈচিত্র্যের চরম। ইংরেজ, বাঙালী, হিন্দুস্থানী, খ্রীষ্টান, হিন্দু, মুসলমান-সাহেবী কাটা পোশাক, ধুতি, পাজামা বন্দুক পিস্তল লাঠি শড়কি-রেসের ঘোড়া, দামী আরবী, ফকিরের টাটু ঘোড়া। এমন কত বৈচিত্র্যের উল্লেখ করব। পাড়ার লোক অবাক, পথের কুকুরগুলো অবধিও ডাকতে ভুলে গেল বৈচিত্র্যের জলুসে।
কাদির আলীকে পাগড়ি বেঁধে প্রস্তুত হতে দেখে সবাই বলল, মিঞা সাহেব, তুমি আবার কেন, বয়েস হয়েছে ঘরে বসে থাক।
উত্তরে কাদির আলী একটি সামরিক হাসি হেসে বলল, ভাইজান, বুম বুড়ো হলেও রুস্তম, যুদ্ধের দামামা শুনে কি সে ঘরে বসে থাকতে পারে?
ঘোড়া পেয়েছ তো?
পেয়েছি একটা যেমন-তেমন।
যথাসময়ে দেখা গেল কাদির আলী একটি গাধার পিঠে চেপে প্রস্তুত।
এ কি রকম ঘোড়া মিঞা সাহেব?
আরে ভাইসাহেব, ঘোড়া আর গাধা একই জাত।
সকলে বলে, তা বটে, তা বটে।
কিন্তু পড়লে যে একবারে সকলের পিছনে!
ফেরবার বেলায় রইব সকলের আগে। বুঝলে না ভাই, আল্লা দুনিয়া সৃষ্টি করেছেন, মানুষে সৃষ্টি করেছে আগু আর পিছু। আল্লার চোখে সব সমান।
এমন তত্ত্ববজ্ঞানীর প্রতিবাদ সম্ভব নয়, সকলে চুপ করে থাকে। বিজয়ী কাদির আলী আবার সামরিক হাসি হাসে।
ন্যাড়া আর গঙ্গারামের বয়স অপেক্ষাকৃত অল্প। সাজপোশাক পাওয়ার পক্ষপাতিত্ব হবে আশঙ্কা করে পরিচিত এক যাত্রাওয়ালার কাছে গিয়ে দুজনে বর্মচম অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে এসেছে। যোদ্ধা বলতে যেমনটি বোঝায় ঠিক সেই রকম, চোখ ঝলসে যায়।
বাহিনীকে পর্যবেক্ষণ করে নিয়ে জন সঙ্কেত করতেই বিউগল বেজে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে ঘোষিত হল মার্চিং অর্ডার। একযোগে গোটা পঁচিশেক বন্দুকের আওয়াজ হল যাত্রা করল সৈন্যদল কাশীপুরের উদ্দেশে।
জন, মেরিডিথ, প্রেস্টন, অগলার সম্মিলিত কণ্ঠে গান ধরল
“None but the Brave,
None bui the Brave,
None but the Brave deserves the Fair.”
সাহেবরা গান ধরেছে, কাজেই অন্য সকলের কিছু গাওয়া চাই। তখন নানা কঠে নানা সুরে গান উঠল; সৈন্যবাহিনীর মত সঙ্গীত-বাহিনীও সমান বিচিত্র।
পলাশীর যুদ্ধ সম্বন্ধে একটা গান মুখে মুখে ছড়িয়েছিল, অনেকে আরম্ভ করল সেটা–
“ছোট ছোট তেলেঙ্গাগুলি
লাল কুর্তি গায়
হাঁটু গেড়ে মারছে তীর
মীরমদনের গায়।
পড়ে যদি মীরমদন
খাড়া মোহনলাল,
জাফর আলির বেইমানিতে
নবাবের হল কাল।”
কেউ আবার পলাশীর যুদ্ধের ইতিবৃত্তে সন্তুষ্ট না হয়ে ক্লাইভের সময় থেকে ওয়ারেন হেস্টিংসের কালে চলে এল। গান ধরল,
“হাতী পর হাওদা, ঘোড়া পর জিন,
জলদি যাও জলদি যাও ওয়ারেন হস্তিন।”
গানও চলে, পা-ও চলে, সৈন্যদল কসাইটোলা পেরিয়ে চিৎপুর রোডে পড়ে। পথের ধারের দরজা-জানলা খুলে যায় কোথায় চলেছে এরা সব?
কেউ বলে, সাহেবরা শিকার খেলতে যাচ্ছে, কেউ বলে, সুখচরে সাহেবদের ছাউনি পড়বে। অধিকাংশ কিছুই বলে না, চুপ করে তাকিয়ে থাকে।
এমন সময়ে তারস্বরে গঙ্গারাম গগয়ে উঠল,
“পামকিন লাউ কুমড়া, কোকোর শসা।
ব্রিঞ্জেল বার্তাকু, প্লাউমেন চাষা।”
গানটাকে ঠিক সামরিক সঙ্গীত বলা যায় না, কিন্তু সে বুঝে নিয়েছিল যে দেশকালপাত্র বিবেচনায় ইংরেজী গান কর্তব্য। তার ভাণ্ডারে এই গানটিই ইংরেজির নিকটবর্তী জ্ঞাতি। তার ইংরেজী জ্ঞানে আর-সকলে যতই বিস্মিত হয়, তার কণ্ঠস্বর তত উচ্চ থেকে উচ্চতর হতে থাকে–
ব্রিঞ্জেল বার্তাকু, প্লাউমেন চাষা
ইংরেজী-অনভিজ্ঞরা ঈর্ষায় কানাকানি করে—মুখস্থ করে এসেছে রে, নতুবা ওর বিদ্যের দৌড় তো আমাদের অজানা নেই।
বিশুদ্ধ ইংরেজী বা বাংলা গানের চেয়ে গঙ্গারামের মিশ্র-সঙ্গীত মিশ্র-বাহিনী কর্তৃক অধিকতর সংবর্ধিত হল দেখে ন্যাড়া ইংরি তালে খাম্বাজ রাগিণীতে গান ধরে দিল–
“Nigh কাছে, Near কাছে,
Nearest অতি কাছে।
Cut কাট, Cot খাট,
Following পাছে।”
বাঃ ভাই, বেশ, বেশ।
তোমরা না থাকলে কি এমন জমত!
চলুক দুজনে উতোর চাপান।
সার ভেঙে সবাই প্রায় দাঁড়ায় ওদের দুজনকে ঘিরে, যুদ্ধযাত্রা যাত্রাদলে পরিণত হওয়ার মত আর কি। এমন সময় জন এসে গর্জন করে ওঠে, চাবুক চালায়—তাতে আসর ভেঙে গেলেও গান চলতে বাধা থাকে না।
জন ফিরে গিয়ে বন্ধুদের বলে, জোড়া ফলস্টাফ খুব জমিয়েছে।
জন বলে, মুন্সী, তুমি চুপ করে আছ কেন, একটা কিছু গাও!
আমি তো তোমাদের মত জঙ্গী গান জানি নে, কি গাইব?
বল কি, তুমি জঙ্গী গান জান না! তোমাদের গডেস কালী হচ্ছে গ্রেটেস্ট ওয়ারিয়র। গডেস কালীর একটা গান ধর।
বেশ, তবে তাই হক, এই বলে বিশুদ্ধ রামপ্রসাদী সুরে সে গান–
“আয় মা সাধন সমরে
দেখি মা হারে কি পুত্র হারে।”
বাস্তব সমরসজ্জার সঙ্গে আধ্যাত্মিক যুদ্ধের সুর মিলে গিয়ে সে এক অপূর্ব আবহাওয়ার সৃষ্টি হয়। একশ ঘোড়ার চারশ পা তাল দেয় সেই সঙ্গীতে, সকলে তস্ময় হয়ে শোনে, ‘আয় মা সাধন সমরে।
জন, অনুবাদ করে বুঝিয়ে দেব নাকি?
মেরিডিথ বলে ওঠে, অমন চেষ্টাও কর না মুলী। এসব দৈব সঙ্গীত অনুবাদের ধোপ টেকে না।
কেমন করে জানলে? শুধায় প্রেস্টন আর অগলার।
তবে একটা অভিজ্ঞতা বর্ণনা করি শোন।
