বুদ্ধির প্রশংসায় খুশি হয়ে সে বলল—তা বাতুল্যি বটে।
তবে আর কি, ছেড়ে দাও। নাও এখন কোথায় স্নানের জায়গা দেখিয়ে দাও।
কি কারণে জানি না, দীনতম মানুষের মনও প্রাজ্ঞতম ব্যক্তির দুরধিগম্য, টুশকিকে ছেড়ে দিতে খুদিরাম সম্মত হল।
তবে তুমি এস টুশকিদিদি, বলে খুদিরাম এগিয়ে গেল।
শেষ মুহূর্তে টুশকি বেঁকে বসে, বলে, না, তোমাকে ছেড়ে আমি একা যাব না।
রেশমী বোঝায়, দুজনের একসঙ্গে যাওয়া সম্ভব নয়। তুমি যাও, গিয়ে জনকে সব খবর দাও, কায়েৎ দার সন্ধান পেলে তাকেও সব জানিও–আমার মুক্তি পাওয়ার এ ছাড়া উপায় নেই। নাও ওঠ, শীগগির কর, আবার কে কোথা থেকে এসে পড়বে, তখন সব মাটি হয়ে যাবে।
অনেক কষ্টে তাকে বুঝিয়ে পড়িয়ে জনের ঠিকানা বলে দিয়ে বিদায় করে দেয় টুশকিকে। সে কাঁদতে কাঁদতে বিদায় হয়ে যায়, বলে যায়, আমি এখনই ওদের নিয়ে ফিরে আসছি বোন, ততক্ষণ একটু সাবধানে থেকো।
রেশমী হেসে বলে, আমার জন্যে ভয় কর না দিদি, আমার কর্তব্য আমি স্থির করে ফেলেছি।
তার শেষ কথাগুলোর অর্থ তলিয়ে দেখে না টুশকি, রেশমীকে উদ্ধার করতে হবে এই সঙ্কম নিয়ে দ্রুত অনুসরণ করে খুদিরামের।
.
৪.২০ রেশমীর সঙ্কল্প
রেশমী স্থির করেছে মরবে। বাঁচবে কেন? ধাচে আশায়। কোন আশা আছে রেশমীর? মৃত্যুর সাক্ষী বা সঙ্গী করতে চায় না টুশকিকে—তাই তাকে কোন ছুতায় বিদায় করে দিয়েছে সে। জনের কাছে সাহায্যের আশা যে নেই, তার চেয়ে বেশি কে জানে। দীর্ঘকাল পরে, অপ্রত্যাশিত ভাবে ফিরে পেল হারানো বোনকে, কিন্তু এ যে না-পাওয়ারই সামিল। আর দুদিন, না, একদিন আগে ফিরে পেলেও পাওয়া হত। গতকাল পরস্পরের পরিচয় দানের কথা ছিল, তখন পেলেও পাওয়া হত। কিন্তু এ যে খাদের মধ্যে পতনশীল বাক্তির পাওয়া। সে-পাওয়া কি না-পাওয়া নয়? আর মদনমোহন! সে যে এমন করে দুঃসময়ে ফাঁকি দেবে কে জানত? সেই বুড়ি-মা বলেছিল, ও আমার দুইর শিরোমণি, ফাঁকি দিতে ওর জুড়ি নেই, সব ছেড়ে ওকে না ধরতে পারলে ও ধরা দেয় না। সব ছেড়ে ওকে ধরতে পারে নি রেশমী, ও জনের সন্ধান পাওয়া মাত্র আলগা হাত ফসকে মদনমোহন পালাল। জন, টুশকি, মদনমোহন—তিন কৃল গিয়ে তার কোন আশাটা রইল বাকি? বাঁচবে কেন? মৃত্যুর দিকেই যে হাতের পাঁচটা আঙুলের নির্দেশ।
মৃত্যুর কথায় তার ফুলকিকে মনে পড়ে। সে বলেছিল যে, মরতে চাই নে, আবার মরতে ভয়ও পাই নে। সে আকাশের দিকে দেখিয়ে বলেছিল যে, ঐ মেঘখানার মত কখন মিলিয়ে যাব-ভয়টা কিসের?
রেশমী বলেছিল, মৃত্যুর পর কি হবে ভেবে ভয় কর না?
ফুলকি হেসে বলেছিল, মৃত্যুর আগে কি আছে দেখলাম তো সব। মৃত্যুর পরে এর চেয়ে আর খারাপ কি হবে? না রেশমী, আমার ভয় করে না।
ফুলকির প্রসঙ্গে ওর আরও অনেক কথা মনে পড়ে। ফুলকি বলেছিল, পুরুষগুলো বড় লোভী, সন্দেশ দেখলেই খাই-খাই করে। কত আর পাহারা দিয়ে বসে থাকা যায়। দিই একটু হাতে তুলে, খুশি হয়ে বাড়ি ফিরে যায়।
রেশমী ভাবে, এমন করে তো সন্দেশ যার-তার হাতে তুলে দেওয়া যায় না, এ যে একজনের উদ্দেশে নিবেদন করা। আর অনিবেদিত হলেই কি যাকে-তাকে দেওয়া যায়? ফুলকির সঙ্গে এখানে মেলে না তার।
স্নানের ঘরে বসে বসে টবের জলের সঙ্গে চোখের জল মিলিয়ে ভেবে যায় রেশমী। এমন সময়ে দরজায় ঘা পড়ে।
ও রেশমী দি, হল? বেলা যে বয়ে গেল!
কাপড় ছেড়ে বেরিয়ে আসে রেশমী। খুদিরাম বলে, এবারে দুটো খেয়ে নাও।
রেশমী বলে, না, এবেলা আর খাব না।
আরও দু-একবার অনুরোধ করে ফিরে যায় খুদিরাম। দোতলার ঘরটা থেকে নীচেকার কর্মচাঞ্চল্যের আভাস পায় সে। ঘরে ঘরে ঝাড়লণ্ঠন জ্বালাবার ব্যবস্থা হচ্ছে, নাচ-ঘরটার যে অংশটা চোখে পড়ে, সেখানে সাদা জাজিম, জরির তাকিয়া, ফুলের হড়াছড়ি; একপাশে বারান্দার উপরে ভূপীকৃত আতসবাজি; পাশের হোট ঘরটায় দেখতে পেল কাঠের বাক্স থেকে বের করা মদের বোতলের সার। জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখল যে গাড়িবারান্দার কাছে ফিটন, ব্রাউনবেরি জুটতে আরম্ভ করেছে-হঠাৎ সমস্ত বাগানবাড়িটা যেন প্রকাণ্ড একটা বিলাসের দুঃস্বপ্ন দেখতে আরম্ভ করেছে।
এত আয়োজন রেশমীর জন্যে! মনে মনে সে হাসে, কিন্তু বুঝতে পারে না যে, তার অগোচরে একটুখানি গর্বের আভাস মিশ্রিত রয়েছে সেই হাসিতে।
এমন সময়ে খুদিরাম এসে একটা পেটরা রাখে তার সম্মুখে। কি আছে ওতে?
খুদিরাম বলে, পেশোয়াজ, কাঁচুলি, ওড়না, ঘুঙুর, আর যেমন মানায় সোনার গহনা।
এসব কেন?
শোন কথা একবার! তুমি কি এই পুরনো শাড়ি পরে আসরে বের হবে নাকি? আজ শহরের বড়লোক সব ভেঙে পড়বে যে তোমাকে দেখতে।
সংক্ষেপে রেশমী বলে, তা বটে।
তবে আর কি, এগুলো নিয়ে সাজতে আরম্ভ কর।
তার পরে বলে, অবশ্য এখনও দেরি আছে, আগে নিকি বাইজীর গান হবে, তার পরে পড়বে তোমার ডাক, সে রাত দশটার আগে নয়।
রেশমী বলে, আচ্ছা তুমি এখন যাও, আমি ঠিক সময়ে সেজে বের হব।
এই বলে পেটরা নিয়ে সে ঘরের দরজা বন্ধ করে।
৪.২১-২২ যুদ্ধযাত্রা
অপরায়ে বিউগ বেজে উঠল। অমনি দেখতে দেখতে জনের অফিসের সম্মুখে শ্বেতাঙ্গে, কৃষ্ণাঙ্গে শতাধিক লোক সমবেত হল। ঘোডাও শতাধিক, এ সৈন্যবাহিনীতে পদাতিক হতে কেউ রাজী নয়, সকলেই অশ্বারোহী। জন, মেরিডিথ, প্রেস্টন, অগলার ও রাম বসু মিলে সকলকে সারবন্দী দাঁড় করাবার চেষ্টায় নিযুক্ত হয়। জন, মেরিডিথ, প্রেস্টন, অগলার চারজন পাশাপাশি, রাম বসু তাদের ঠিক পিছনেই। তার পরে দুই সারিতে শ’খানেক অশ্বারোহী—দলের মধ্যে ন্যাড়া আর গঙ্গারামও বর্তমান।
