রেশমী কৃত্রিম বিস্ময়ে বলে, সে যে খ্রীষ্টান!
সত্যকার বিস্ময়ে টুশকি বলে, তাতে কি? খ্রীষ্টান জন কি খাঁটি হিন্দু মোতি রায়ের চেয়ে খারাপ?
আসল কথা রেশমী বলতে পারে না; জনের সঙ্গে তার বিয়ের আভাস দিয়েছিল সে, কিন্তু পরে জন যে তাকে ত্যাগ করেছে, অকথ্য দোষারোপ করেছে সে কথাটুকু বলে নি। ও কথা প্রকাশ করতে চায় কোন মেয়ের মন!
কিন্তু এখন জনের প্রসঙ্গে সঙ্কটমুক্তির একটা উপায় যেন সে দেখতে পেল। এতক্ষণ কথাবার্তার তলে তলে টুশকিকে মুক্ত করবার উপায় অনুসন্ধান করছিল। কাল রাত্রে টুশকি তার পরিচয় স্বীকার করে নিয়ে তাকে বাঁচিয়েছে—আজকে কি তাকে বাঁচাতে পারবে রেশমী?
জনের প্রসঙ্গে মনে হল, এবারে বোধ করি উপাযটা পাওয়া যাবে, তাই বলল, এতদিনে আমার খোঁজ না পেয়ে জন বোধ করি বিয়ের ইচ্ছা পরিত্যাগ করেছে।
টুশকি বলল, আবাৰ খোঁজ পেলেই সে ইচ্ছা প্রবল হয়ে উঠবে।
কিন্তু খোঁজ পাবে কেমন করে দিদি, কেমন করে জানবে যে আমরা এখানে বন্দী হয়ে আছি?
তা বটে। চুপ করে টুশকি, ভেবে পায় না জনকে সংবাদ দেওয়ার উপায়।
তখন রেশমী বলে, তুমি এক কাজ কর না দিদি, জনের ঠিকানা দিচ্ছি, তাকে গিয়ে সংবাদটা দাও না, তাহলে নিশ্চয় সে একটা উপায় করবে।
রেশমী জানত যে, জনের মনের যে অবস্থা তাতে কিছু আশা করা চলে না আর সে উদ্দেশ্যেও এ প্রস্তাব করে নি সে। তার ইচ্ছা ঐ ছুতোয় টুশকিকে বাইরে যেতে রাজী করা। তার নিজের কর্তব্য সে একপ্রকার স্থির করে ফেলেছে।
রেশমীর কথা শুনে টুশকি বলল, কিন্তু এখান থেকে বাইরে যাওয়ার পথ যে বন্ধ।
সে কি একটা কথা! যতক্ষণ খাস ততক্ষণ আশ। উপায় করতেই হবে, বাঁচতে হবে তো।
কিন্তু তুমি?
জন যদি তোমার কাছে খোঁজ পেয়ে আসে তো ভালই, আর না এলেও আমি পালাতে পারব।
টুশকির মুখে সংশয়ের ছায়া দেখে সে বলে, পালাতে আমি খুব অভ্যস্ত। চিতা থেকে পালিয়েছি, মোতি রায়ের গুদের হাত থেকে একবার পালিয়েছি-আবার পালাব।
সরল বিশ্বাসে কথাটা গ্রহণ করে টুশকি, তবু শুধায়, কিন্তু উপায়?
ঐ যে উপায় আসছে।
এমন সময়ে খুদিরাম প্রবেশ করে বলে, কি, নাওয়া-খাওয়া হবে নি? না খেয়ে চোখ মুখ বসে গেলে কর্তা আমাকে যে বকবে? সন্ধ্যাবেলা আবার যে দুজনে জুডি মিলবে ভাল।
এই বলে সে হেসে ওঠে।
টুশকি ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেয় কিন্তু রেশমীর ভাব অন্য রকম। সে সয়েহে হেসে বলে, তোমারও নাওয়া-খাওয়া হয় নি খুদিরাম দাদা?
খুদিরাম দাদা একটু নরম হয়, বলে, আমার আর নাওয়া-খাওয়া! তোমাদের পাহারা দিয়ে বসে আছি।
আহা, তোমার তবে তো বড় কষ্ট।
এই রকম চলেছে আজ কুড়ি বছর।
কি বল খুদিরাম দাদা, কুড়ি বছর খাও নি তুমি? তবে তো লক্ষণকেও ছাড়িয়ে গিয়েছ—সে তো কেবল বারো বছর না খেয়ে ছিল।
হেসে ওঠে খুদিরাম।
টুশকি এতক্ষণ নীরবে দেখছিল খুদিরামকে। তার মনে হল, উঃ, কি বীভৎস লোকটা! আগাগোড়া ঘোর কালো, একটা পা খোঁড়া-কিন্তু কালো রঙটা ঘনতর দেখায় মাথার সাদা সাদা চুলে, সাদা ভুরুতে, সাদা দাঁতগুলোয়–আর চোখের সাদা সাদা অংশ দুটোতে। ঐ সাদার আলোটুকু ফেলে কালো রঙকে দেদীপ্যমান করে তুলেছে।
টুশকি ভাবে, এই বীভৎস পাষটার সঙ্গে রেশমীর এ কি সদয় ব্যবহার!
খুদিরাম রসিকতার উত্তর দেয়, বলে, লক্ষ্মণ না হয় বারো বছর না খেয়ে ছিল, সীতা তো না খেয়ে ছিল না; এখন ওঠ, গান কর, খাও। ওদিকে আবার রাবণ আসছে।
রেশমী হেসে বলে, রাবণের জন্য প্রস্তৃত হয়েই আছি।
এই তো চাই। কিন্তু এ রাবণ আবার মুখ-চোখ-বসা সীতা পছন্দ করে না। তা ছাড়া তোমাকে দেখবার জন্যে শহরের বড়লোকদের আজ ভিড় লেগে যাবে-সকলকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে যে।
রেশমী সাগ্রহে বলে, তবে তো নাওয়া-খাওয়া করতে হয়। এতগুলো বড়লোকের সামনে শুকনো মুখে বের হলে কর্তা বোধ হয় তোমাকে মন্দ বলবে।
শুধু মন্দ বলা! চাবকে হাড়েমাসে আলাদা করে দেবে না। এই দেখ বলে পিঠে কয়েকটা দাগ দেখায়।
এবারে সত্যই দুঃখ হয় রেশমীর।
খুদিরাম বলে, আমাকে কেন রেখেছে জান দিদিমণি, এই কালো রঙটার জন্যে। কালো রঙ যে চাবুকের দাগ লুকিয়ে রাখে।
এ কাজ ছেড়ে দাও না কেন!
সাধ করে কে এমন কাজ করে?
তবে?
ছাড়তে গেলে কুকুরের মত গুলি করে মারবে।
কেন?
কেন কি! আমি যে বাগানবাড়ির অনেক রহিস্যি জানি। যতদিন এখানে আছি, মুখ বন্ধ আছে, কাজ ছেড়ে অন্যত্র গেলেই মুখ খুলব বলে ভয় করে কর্তাবাবু।
সত্যি তোমার বড় দুঃখ, দীর্ঘশ্বাস ফেলে রেশমী।
নররাক্ষস মোতি রায়ের সহকারী খুদিরামও কম রাক্ষস নয়। কিন্তু এ সংসারে কোন রাক্ষসই নিরেট রাক্ষস নয়। তাকে তৈরি করবার সময়ে সৃষ্টিকর্তার আঙুলের স্পর্শ যে লাগে রাক্ষসের দেহে-ঐটুকুতে বাঁধন আগা থেকে যায়। রেশমীর সদয় ব্যবহার ঐ বাঁধনগুলোকে আর একটু আগা করে দিল।
রেশমী বলল, উঠে নাওয়া-খাওয়া করতে হয়, নইলে আবার তোমার উপরে মারধোর হবে। কিন্তু এক কাজ কর না কেন খুদিরাম দাদা—এই টুশকিদিকে ছেড়ে দাও না কেন?
সে কেমন করে হয়?
কেন হবে না? কর্তার নিজের মুখে তো শুনেছ যে, আমি হচ্ছি আসল রেশমী।
তা শুনেছি বই কি।
তবে আর একে আটকে রাখা কেন?
ছাড়তে তো বলে নি।
না ছাড়তেও বলে নি-ওটা বুঝে নিতে হবে। বুঝলে না খুদিরাম দাদা, অন্য লোক হলে খুলে বলত, তোমার মত বুদ্ধিমান লোককে খুলে বলা বাহুল্য মনে করেই বলে নি।
