সে বলে, সংসারে কার ঋণ কে শোধ করে বোন, মানুষের এমন সাধ্য কি যে অপরের ঋণ শোধ করে!
ও সব তত্ত্বকথা জানি নে দিদি, কিন্তু এ নিশ্চয় জানি তুমি যেভাবে ঋণশোধ করলে রেশমীর আপন দিদিও তা করতে পারত না।
টুশকি দেখল আসল কথা পাড়বার এই হচ্ছে সুযোগ, কিন্তু মুখে কথা আসবার আগে চোখে যে জল আসে, ভেসে যায় দুই গাল।
রেশমী ভাবে, গতরাত্রের অভিজ্ঞতা অশ্রর হেতু। তারও চোখ ভরে ওঠে জলে, ভাবে তার জন্যেই এই অপমান টুশকির। ভাবে আর আত্মগোপন করে লাভ কি, এমন উপকারীর কাছে কি আত্মগোপন করতে আছে। ভাবে কাল রাতে পরিচয় দেবে বলেই তো স্থির করেছিল, তবে আর বাধা কি। তবু শেষ বাধাটুকু ঘুচতে চায় না।
তাকে দায়িত্ব থেকে মুক্তি দেয় টুশকি, বলে, কি করে জানলে যে তোমার আপন বোন থাকলে এমনভাবে ঋণশোধ করত না?
কেমন করে জানব বল, থাকলে কি হত!
কখনও কি ছিল না?
রেশমী দ্বিধামাত্র না করে বলে, না, ছিল না। টুশকি স্থির করেছিল ধীরে ধীরে কথার মোড়ে মোড়ে আঘাত সইয়ে সইয়ে আত্মপরিচয় দেবে। কিন্তু রেশমীর অস্বীকৃতিতে তার সমস্ত ধৈর্য ভেঙে পড়ল, কীটদষ্ট মহীরুহ একমুহূর্তে হল ভুমিসাৎ। মানুষ বোধ করি আর সব সহ্য করতে পারে, কেবল বেনামী কৃতজ্ঞতা ছাড়া।
সে একেবারে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
রেশমী বলল, কাঁদ কেন টুশকি-দি?
ওরে টুশকি নয়, টুশকি নয়, বল্ টুনিদি।
টুনি! রেশমী আমূল কেঁপে ওঠে, কি বলবে ভেবে পায় না, ও নাম কেমন করে জানল টুশকি?
দুর্লঙ্ঘ্য বাঁধে প্রথম বন্ধ দিয়ে এক অঞ্জলি জল যখন নির্গত হয়, কারিগরে ভাবে মেরামত করে নিলেই হবে, কিন্তু তখনই এখানে ওখানে ফাটল দেখা দেয়, ক্রমে ফাটলের সংখ্যা আর বিস্তার বাড়ে, কিছুক্ষণ পরে বাঁধের আর অস্তিত্ব থাকে না।
.
এবারে বাঁধের প্রকাণ্ড এক চাঙড় ভেঙে পড়ে। টুশকি বলে, ওরে আর ভাঁড়াস নে। কাল যখন পাষণ্ডটা ধরে আনল, ভাবলাম, ভগবান, এ কি পরীক্ষায় ফেললে! কিন্তু যখন শুনলাম যে, আমাকে রেশমী মনে করে এনেছে,–
সকলকেই তো তাই মনে করে আনে—
কিন্তু সকলে তো তার আপন বোন নয়—
কি বলছ তুমি!
এবারে চীৎকার করে টুশকি বলে ওঠে, ওরে রেশমী রেশমী, এতকাল কেন সৌরভী নাম নিয়ে ভাঁড়িয়ে ছিলি, কেন বলিস নি তুই আমার আপন বোন, তুই রেশমী!
রেশমীর মনে অভাবিতের চমক লাগে। বলে, এসব কি বলছ, খুলে বল, খুলে বল!
কিন্তু খুলে বলা কি সহজ! এ যে লজ্জার কথা, দুঃখের কথা। যে জীবন মাটির তলে চাপা পড়ে ছিল তা তুলে বলবার কথা! তবু বলতে হয়।
ওরে রেশমী, তোর টুনি নামে বোন ছিল মনে পড়ে?
বিদ্যুৎভরা নৈঃশব্দ্য নামে রেশমীর মুখে চোখে।
টুশকি সংক্ষেপে বলে, আমি সেই টুনি।
তুমি টুনি। আর কিছু বলতে পারে না রেশমী।
আমি টুনি, জোড়ামউ গাঁয়ের টুনি; তুমি বেশমী, জোডমউ গাঁয়ের রেশমী।
ঐ কথাগুলো বারংবার সে আবৃত্তি করে করে যায়, জীবমৃত ব্যক্তি যেমন বারে বারে দেহে আঘাত করে দেখে সত্যই জীবনের অনুভূতি আছে কি না।
বিস্ময় কাটে না রেশমীর। সে বলে, তুমি টুনিদি! তবে বাবা মা নাড় কোথায়? মনে পড়ে না তাদের কথা সত্য কিন্তু বাল্যকাল থেকে শুনে শুনে সমস্ত যেন পরিষ্কার দেখতে পাই।
কেউ নেই রে বোন। আমি না থাকলেও বোধ করি ভাল ছিল।
সুগভীর খাদের ধারে দাঁড়িয়ে পা পিছলে পড়বার ঠিক আগের মুহূর্তে এ কি অন্তিম রহস্যময় পরিচয়! আর দু’দণ্ড পরিচয়টা না হলে এমন কি ক্ষতি ছিল! আশ্চর্য এই জীবন!
এতদিন দুজনের জীবন এক বাড়িতেই সমান্তরালভাবে চলছিল, কোথাও দুই জলধারায় যোগাযোগ ঘটে নি। আজ দুঃখের বন্যায় তীর ছাপিয়ে দুই নদী একাকার হয়ে গেল।
তখন দুই বোনে নিরিবিলি বসে নিজ নিজ জীবন-বৃত্তান্ত বলে যায়। টুশকি আগে বলে গঙ্গাসাগর যাত্রা, বোম্বেটের আক্রমণ, আর সকলের মৃত্যু, টুশকির কলকাতায় আগমন। কলকাতার অভিজ্ঞতা বর্ণনার সময়ে বড় বড় ফাঁক রয়ে যায়, সে ফাঁকগুলো পূরণ করে নিতে কষ্ট হয় না রেশমীর, জীবনের সঙ্গে তারও ঘটেছে পরিচয়।
ওদিকে রেশমী বলে তার জীবন বৃত্তান্ত। মুমূর্যর সঙ্গে বিয়ে, চণ্ডী বীর লোভ, চিতা থেকে পলায়ন, কেরীর আশ্রয়, মদনাবাটির অভিজ্ঞতা, কলকাতায় প্রত্যাবর্তন, রোজ এলমার—সব বলে যায়। জনের সঙ্গে তার সম্বন্ধটা খসড়ায় আঁকে, বাদ দেওয়া চলে না, বাদ দিলে শ্রীরামপুরের কথা বাদ দিতে হয়, মোতি রায়ের কথাও বাদ পড়ে যায়।
টুশকি আর রেশমী আবিষ্কার করে যে, তাদের পরিচয় হওয়ার অনেক আগে। থেকেই দুটো সুতোয় তারা বাঁধা পড়ে গিয়েছে—রামরাম বসু আর ন্যাড়া।
দুজনেই মনে মনে ভাবে, মুখেও শেষ পর্যন্ত বলে, কায়েৎ দা থাকলে এর বোধ হয় একটা বিহিত হত, কিন্তু কোথায় যে গেল সে!
আর ভাবে, আহা, ঐ ন্যাড়া যদি তাদের হারানো ভাইটি হত! কিন্তু কেমন করে তারা জানবে যে, উপন্যাসে যেমন করে সমস্ত ছিন্ন সূত্রগুলো অনায়াসে জোড়া লেগে যায, জীবনে তেমনটি যায় না। দু-চারটে ছিন্নসূত্র শেষ পর্যন্ত অবলম্বনহীন হয়ে ঝুলতেই থাকে।
লজ্জায় আর দুঃখে ভরা দুজনের জীবনকাহিনী কখন একসময়ে শেষ হয়ে আসে, তখন সম্মুখে থাকে ভবিষ্যতের চিন্তা।
দুজনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে, তার পর হঠাৎ টুশকি বলে ওঠে, আচ্ছা রেশমী, তুমি জনকে বিয়ে কর না কেন?
