রাম বসু বলল, সদুদ্দেশ্যে কে কবে বন্দী করে রাখে। তার পরে বলল, তবে রেশমী যে তার আশ্রয়দাত্রীকে উদ্ধার করতে গিয়েছে আর গিয়ে বন্দী হয়েছে এ একপ্রকার নিশ্চিত।
তবে আমি চললাম, বলে টেবিলের দেরাজ থেকে পিস্তল বের করে নিয়ে জন উঠে দাঁড়াল।
ওকি, কোথায় চললে?
রেশমীকে উদ্ধার করতে।
দেখ জন, এ গোঁয়ার্তুমির সময় নয়, ধীরেসুস্থে ভেবেচিন্তে কাজ করতে হবে।
আর ইতিমধ্যে রেশমী অসম্মানিত হক!
না, আজ রাতের আগে সে আশঙ্কা নেই।
কিন্তু ততক্ষণ আমি অপেক্ষা করতে রাজী নই, বলে সে অধীরভাবে পায়চারি করে।
রাম বসু বলে, আমিও রাজী নই, কিন্তু একা তুমি কি করতে পার?
মোতি রায় লোকটাও তো একা।
না, সে একা নয়, তার অনেক বরকন্দাজ অনেক লাঠিয়াল আছে।
তা থাক, জেনে রেখো, আমি শ্বেতাঙ্গ, আর এটা কোম্পানির মুলুক।
তাতে কি লাভটা হবে? তুমি একা গেলে তোমাকে সে হত্যা করে ফেলবে। তার পরে তাকে বিচার করে ফাঁসি দিতে পারবে কোম্পানি; যেমন ফাঁসি দিয়েছিল নন্দকুমারকে। কিন্তু রেশমী কি তাতে রক্ষা পাবে?
জন যুক্তির সাববত্তা বোঝে, পিস্তলটা টেবিলের উপরে রেখে দিয়ে বলে, তবে কি করতে হবে বল?
অস্ত্রশস্ত্র দলবল নিয়ে বাগানবাড়ি ঘেরাও করে রেশমী আর তার আশ্রয়দাত্রীকে উদ্ধার করতে হবে।
রাম বসুর পরামর্শ শুনে জন বলে ওঠে, রাইট! এ অতি উত্তর পরামর্শ। তবে আমি সেই চেষ্টা দেখি।
এই বলে সে কাদির আলীকে ডেকে হুকুম দিল, আমার অফিসের আর বাড়ির যে-সব লোক ঘোড়ায় চড়তে পারে তাদের ডেকে বলে দাও, সব যেন তৈরী থাকে, আমি ঘোড়র ব্যবস্থা করছি।
কাদির আলী গঙ্গারাম ও রাম বসুর মুখে ঘটনা শুনেছিল, এখন ঢালাও হুকুম পেল, ‘জী হুজুর’ বলে সেলাম করে সে বেরিয়ে গেল।
জন বুঝেছিল যে, দু-চারজন শ্বেতাঙ্গ সঙ্গে থাকলে আক্রমণের গুরুত্ব বাড়বে, তার মনে পড়ল, মেরিডিথের নাম। তখনই সে মেরিডিথকে চিঠি লিখে পাঠিয়ে দিল, জানাল যে, তোমার লোকজনদের মধ্যে যারা ঘোড়ায় চড়তে পারে তাদের নিয়ে যত শীঘ্র সম্ভব আমার অফিসে এস-এখনই একটা অ্যাডভেঞ্চারে বের হতে হবে। আরও জানাল যে, উদ্দেশ্য অতিশয় মহৎ, কাজেই দ্বিধা কর না।
কিছুক্ষণের মধ্যেই মেরিডিথের উত্তর হাতে এসে পৌঁছল। মেরিডিথ লিখেছে “জন, যুদ্ধযাত্রার আহ্বান পেলাম। টিপু সুলতান তো পরাজিত, কার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা? পেশবার বিরুদ্ধে নাকি? না, স্বয়ং দিল্লীর বাদশার বিরুদ্ধে? যার বিরুদ্ধেই হক, আমি আহ্লাদের সঙ্গে প্রস্তুত আছি। মনে হচ্ছে যে, জন-পঞ্চাশেক লোককে ঘোড়ায় চাপাতে পারব। তবে আশঙ্কা হচ্ছে, পঞ্চাশটা ঘোড় যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে পৌঁছলেও পঞ্চাশজন সওয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে না পৌঁছতেও পারে, অনেকেই মাঝপথে পড়ে আহত হবে; তবে তাদেরও যুদ্ধে আহত বলে ধরতে হবে, রণশাস্ত্রের এই হচ্ছে বিধি। যাই হোক, তুমি নিশ্চিত হও, অপরাহ্নের আগেই তোমার অফিসে গিয়ে পৌঁছব। মেরিডিথ।”
পরে ‘পুনশ্চ’ দিয়ে লিখেছে—”যদি দু-চারজন উদ্যমী শ্বেতাঙ্গ পাই, তাদের সঙ্গে নেব।”
মেরিডিথের পত্র পেয়ে জনের ভরসা বাড়ল, বুঝল সে একা নয়।
ইতিমধ্যে জনের লোকজন জমায়েৎ হতে শুরু করেছে। বাড়ি থেকে আরদালি, চাপরাসী, ভিস্তি প্রভৃতিদের ডেকে আনা হয়েছে। সকলকে প্রচুর বকশিশ কবুল করা হয়েছে। জনদের গোটা-পঁচিশেক ঘোড়া ছিল, আরও গোটা-পঁচিশেক ভাড়া করে আনবার ব্যবস্থা হয়েছে। ঢাল, তলোয়ার, শডকিও তূপীকৃত হল, বন্দুকগুলো জন নিজের হেফাজতে রাখল, বাছা বাছা লোকের হাতে দেবে।
রাম বসু খবর পাঠিয়ে ন্যাড়াকে জানিয়ে দিল। সমস্ত খবর শুনে ন্যাড়া মস্ত এক পাগড়ি বেঁধে ঢাল-তলোয়ার হাতে প্রস্তুত হল।
ন্যাড়াকে খুঁজতে গিয়ে রাম বসু আবিষ্কার করল যে, ন্যাড়া ও গঙ্গারাম দুজনে যথারীতি সুসজ্জিত হয়ে তলোয়ার নিয়ে যুদ্ধের মহড়া দিচ্ছে, তাদের দুজনেরই দৃষ্টিতে অপরে মোতি রায়।
রাম বসু বলল, ওরে এখন থাম, সে সময়ে দেখা যাবে কে কত বড় ওস্তাদ!
দুজনেই একসঙ্গে বলে উঠল, দাঁড়াও কায়েৎ দা, আগে মোতি রায় বেটাকে নিকেশ করে ফেলি।
এমন সময়ে অদূরে অনেকগুলো ঘোড়ার পায়ের শব্দ উঠল। ব্যাপার কি?
সকলে ছাদে উঠে দেখল চৌরঙ্গির পথ দিয়ে একদল ঘোড়সোয়র আসছে—সকলের আগে মেরিডিথ ও জন-দুই শ্বেতাঙ্গ। তাদের দেখে জনের লোকজন আনন্দে চীৎকার করে উঠল। ও পক্ষ থেকেও উঠল আনন্দধ্বনি—দুই পক্ষে বিউগ উঠল বেজে। দু চার মিনিটের মধ্যেই সদলবলে মেরিডিথ এসে পৌঁছল।
জন এগিয়ে গিয়ে মেরিডিথের করমর্দন করল।
মেরিডিথ সঙ্গী দুজনের পরিচয় করিয়ে দিল, মিঃ প্রেস্টন, মিঃ অগলার—আর এ হচ্ছে মিঃ স্মিথ, এই যুদ্ধের কম্যাডার-ইন-চীফ।
বাপার কি জন?
চল ভিতরে চল, সব খুলে বলছি। এই বলে জন তিনজনকে নিয়ে তার খাস কামরায় গিয়ে বসল; আবদার দু বোতল ব্র্যাঙি আর চারটে গেলাস টেবিলের উপর রেখে সেলাম করে বেরিয়ে গেল।
মেরিডিথ বলল, বল এবার সব খুলে। জন বলল, দাঁড়াও, আগে বোতলের মুখ খুলি, তার পরে খুলছি নিজের মুখ।
.
৪.১৯ পরিচয়
অপ্রত্যাশিত মিলনের প্রথম বিস্ময় কাটলে রেশমী আগে কথা বলল। বলল, দিদি, অবশেষে তোমাকেও ঋণশোধ করতে হল, সেই রেশমী নামে মেয়েটার জন্যে!
টুশকি বুঝল যে রেশমী এখনও তার যথার্থ পরিচয় পায় নি। সে ভাবল কিভাবে আসল পরিচয় দেওয়া যায়। হঠাৎ ভেবে পায় না, তার পরে ভাবে, যাক গে, কথার মুখে আপনি বেরিয়ে পড়বে, আগে থেকে চেষ্টা করে লাভ নেই।
