হঠাৎ সচেতন হয়ে উঠে মোতি রায় বলল, ওঃ, তোমার বুঝি আবার লজ্জা করছে।
তখনই সান্ত্বনা দিয়ে বলল, আরে তোমার সঙ্গে তো রক্তের সম্বন্ধই নেই, তা এত লজ্জা কিসের?
চণ্ডী কি বলতে যাচ্ছিল, মোতি রায় থামিয়ে দিয়ে বলল, আচ্ছা, ও প্রসঙ্গ না হয় থাক। এখন বল তো বক্সী, কি পারিতোষিক চাও? শাল-দোশালা আর টাকা— না খানিকটে ব্রহ্মত্র জমি?
চণ্ডীর উপযুক্ত শিক্ষা হয়ে গিয়েছে, এখন সে পালাতে পারলে বাঁচে, তাই সে সংক্ষেপে বলল, হুজুরের যা ইচ্ছে হয় দেবেন।
এ অতি উত্তম কথা, না হয় দুই-ই পাবে, কিন্তু রেশমীকে পাচ্ছ না, মেয়েটা থাকবে আমার কাছে, অমন মেয়ে কালে-ভদ্রে মেলে।
চণ্ডী চুপ করে বসে রইল, হাঁ না বলবার সাহস তার নেই, কোন্ কথার কি অর্থ হবে বুঝতে পারে না সে।
এমন সময় দেউড়ির কাছে একটা শোরগোলের মত শুত হল-হাঁ রোখো, রোখো, অন্দর যানা মানা হ্যায়; একেলা নেহি, ক্যায়সে যায়গা?
সকালবেলাতেই কি আবার হাঙ্গামা, বলে অত্যন্ত বিরক্তির সঙ্গে উঠে বসবার চেষ্টা করল মোতি রায়, কিন্তু সম্পূর্ণ সফল হওয়ার আগেই খলিতকেশ, শ্ৰস্তবসন আবেগে ও রৌদ্রে রক্তিম মুখমণ্ডল রেশমী এসে সম্মুখে দাঁড়াল, দুঃখে কশাহত হয়ে তার সৌন্দর্য যেন সহস্রনয়নে জেগে উঠছে। রৌদ্রপ্রতিফলিত হীরকের দীপ্তির মত বিচছুরিত হচ্ছে সৌন্দর্যের সূচীমুখ, চেয়ে থাকা কঠিন, চোখ ফিরিয়ে নেওয়া কঠিনতর।
হাঁ করে তাকিয়ে রইল মোতি রায়।
আমি জোড়ামউ গাঁয়ের রেশমী। আমার সন্ধান করছেন আপনি, কি চান বলুন? আমি এসেছি।
বাক্যস্ফূর্তি হল না মোতি রায়ের। সে দুই চোখ দিয়ে গিলতে লাগল সেই অগ্নিসম রূপের মদিরা।
ক্রোধে, অপমানে, লজ্জায়, পরিশ্রমে খুন চেপে গিয়েছিল রেশমীয় মাথায়। চরিত্রের সমস্ত শক্তি তাকে ঠেলে নিয়ে এসেছে এই প্রচণ্ড দুশ্চেষ্টায়। এখন ঐ নির্বাক লুব্ধ দৃষ্টি তার শক্তির শেষ অঞ্জলিকে তরঙ্গিত করে তুলল, সে বলে উঠল, নারীর রূপ কি কখনও দেখেন নি? তবে এই দেখুন! এই বলে, কি করছে ভাল করে বোঝবার আগেই সে অপসারিত করল বক্ষের অঞ্চল। দোভাসমসৃণ মাণিক্যকঠিন সবুর্ণচিক্কণ, স্তনাগ্রযুগলের সেই সহজ স্বগীয় কান্তিতে এমন একটা সপ্রতিভ পবিত্রতা ছিল যে, পাষণ্ডটাও তাকিয়ে থাকতে পারল না। চোখ নামিয়ে নিল।
রেশমীর ঘরে প্রবেশ করবার পরে মিনিট দুই কালের মধ্যে এই সব কাণ্ড ঘটে গেল। ক্রমে সম্বিৎ ফিরে এল মোতি রায়ের, এতক্ষণ ঘটনার আকস্মিকতায় সে বিগতসম্বিৎ ছিল। মোতি রায়ের কিছুমাত্র সন্দেহ রইল না যে, যে মেয়ের সন্ধান সে করছিল এ ই সেই মেয়ে। কিন্তু এখন কি কর্তব্য স্থির করবার অবকাশ পেল না সে, তার চিন্তা বারে বারে শিথিল হয়ে যায় রেশমীর কথার তোড়ে।
বিস্মিত হয় মোতি রায়। তবে কাল রাতে কাকে উপভোগ করল সে রেশমী ভেবে?
অধিকতর বিস্মিত হয় চণ্ডী বক্সী। তবে কাল রাতে কাকে সে ধরিয়ে দিয়েছিল রেশমী বলে?
কিন্তু বেশিক্ষণ তারা চিন্তা করতে পারে না, রেশমীর অনর্গল বাক্যে ছিন্ন হয়ে যায় চিন্তার সূত্র।
এই নারীদেহটা ভোগ করতে চান, এই তো? পাবেন। কিন্তু তার আগে আমার বোনকে মুক্তি দিন। কোথায় রেখেছেন তাকে বলুন। কেমন আছে সে বলুন। তার বদলে তৃপ্ত হবে আপনার রাক্ষসী ক্ষুধা।
মোতি রায় পাষণ্ড, আর পাষণ্ড বলেই নির্বোধ নয়। ক্ষণকালের জন্য সে হতবুদ্ধি হয়ে গেলেও বেশিক্ষণ সে ভাব থাকল না তার। সে বুঝল যে, চণ্ডী বগী বাজে মাল দিয়ে তাকে ঠকিয়েছে, আর বাড়ি যাওয়ার আগ্রহটার অর্থও স্পষ্ট হল এতক্ষণে, ধরা পড়বার আগেই সে সরে পড়তে চায়।
মোতি রায় গর্জন করে উঠল, বুধন সিং!
দরজায় এসে সেলাম করে দাঁড়াল বুধন সিং।
এই হারামজাদকে লাগাও পঞ্চাশ জুতি। আর শালালোগকো মৎ ভাগনে দেও।
জী হুজুর।
বুধন সিং টেনে নিয়ে গেল চণ্ডী বক্সীকে।
এই প্রথম রেশমী সচেতন হল যে, ঘরে অপর ব্যক্তি হিল আর সে স্বয়ং চণ্ডী বক্সী।
ইতিমধ্যে রেশমীরও মরীয়া ভাব ক্রমে কমে এসেছে। সে বুঝেছে যে, হঠকারিতায় প্রবেশ করেছে পিঞ্জরে, বিষফল গলাধঃকরণ না করে আর উপায় নেই। বুকের আঁচল তুলে দিয়ে শিলামূর্তির মত সে দাঁড়িয়ে রইল।
মোতি রায় ডাকল, খুদিরাম!
কালো, খোঁড়া, কুৎসিত একটা বুড়ো লোক এসে দরজায় দাঁড়াল। খুদিরাম মোতি রায়ের খাস খানসামা, সমস্ত দুস্কার্যের সহায়ক ও সাক্ষী।
খুদিরাম বলল, বাবু!
এই মেয়েটাকে পালকি করে বাগানবাড়িতে নিয়ে যা। সেখানে স্নানাহারের বন্দোবস্ত করে দিবি, কড়া পাহারা রাখবি। দেখিস পালাতে না পারে, ভারি শয়তান।
তার পরে রেশমীকে লক্ষ্য করে বলল, পালাতে চেষ্টা করলে ডালকুন্তায় ছিঁড়ে ফেলবে, সে চেষ্টা ক’র না। আর তোমার বোনকে ব’ল—তার দেখা ওখানেই পাবে বাজে মাল দিয়ে মোতি রায়কে ঠকালে মোতি রায় সহজে ভোলে না। শুনছ তো বাজে মাল সরবরাহ করলে কিরকম ব্যবস্থা হয়।
অদূরে কোনখানে চণ্ডী বক্সী আর্তনাদ করছে।
আজ সন্ধ্যাবেলায় দেখা হবে, তখন যাচাই করে নেব তোমাদের দুজনের মধ্যে কে রেশমী আর কে সুতী!
তার পরে খুদিরামের উদ্দেশে আর একবার সতর্কবাণী উচ্চারণ করে মোতি রায় গৃহান্তরে প্রস্থান করল।
.
৪.১৮ জনের যুদ্ধোদ্যম
রাম বসুর মুখে আদ্যন্ত বৃত্তান্ত শুনে জন বলে উঠল, তবে কি তুমি বলতে চাও যে ঐ মোতি রায় নামে লোকটা অসদুদ্দেশ্যে রেশমীকে বন্দী করে রেখেছে?
