এই বলে গঙ্গারামকে সঙ্গে নিয়ে রাম বসু বেরিয়ে এল।
টুশকির বাড়ির পাশে রাম পণ্ডিতের মুদির দোকান। রাম পঙিত চাণক্যশ্লোক, দাতাকর্ণ উপাখ্যান, শুভঙ্করী, এবং প্রকাণ্ড টাক ও সুদীর্ঘ নাকের মাহাত্ম্যে মুদির দোকানের একান্তে পাঠশালা খুলে পণ্ডিতি করেন। রাম পঙিত জাত্যংশে ব্রাহ্মণ ও রাম বসুর দীর্ঘকালের আলাপী। রাম বসু জানত, পাড়ার সাকুল্য বিবরণ রাম পণ্ডিতের মুদির দোকানে এসে জমে। তাই সে রাম পণ্ডিতের মুদির দোকানে এসে উপস্থিত হল।
প্রাতঃপ্রণাম পণ্ডিত মশাই।
আরে মিতে যে! এস, এস, অনেকদিন পরে, এতদিন হিলে কোথায়?
তার পর, সব মঙ্গল তো?
রাম বসু আসন গ্রহণ করতে করতে অবান্তর প্রশ্নের যথাস উত্তর দিল।
ওরে ঐ কায়স্থের হুঁকোটা দিয়ে যা। একজন পোভড়া প্রজ্বলন্ত কল্পে বসিয়ে হুঁকো এগিয়ে দিল রাম বসুর কাছে।
তার পর-পাড়ার খবর কি বল তো মিতে।
আর খবর! এখন পাড়ায় সুভদ্রা-হরণ পালা চলছে! বলে হো হো করে হেসে ওঠে রাম পণ্ডিত। নাকটা তাল রক্ষা করে হাসির সঙ্গে সঙ্গে কাঁপে।
কি রকম, সব শুনি?
এদিক ওদিক তাকিয়ে নিয়ে গলা খাটো করে রাম পণ্ডিত বলে, সমস্তর মূলে ঐ মোতি রায়। জান তো লোকটাকে।
বসু বলে, ওকে না জানে কে। অতবড় পাষণ্ড ভূভারতে নেই।
তবে তো জানই। মাসখানেক আগে রেশমী নামে একটা ছুঁড়িকে কোত্থেকে নিয়ে আসে ওর লোকজন।
রাম বসু কান খাড়া করে শুনে যায়। শুধায়, কোত্থেকে কি জান?
নিশ্চয় করে জানি নে, তবে শুনলাম যে শ্রীরামপুরের পাদ্রীরা নাকি ওকে খ্রীষ্টান করবার জন্যে চুরি করে নিয়ে যাচ্ছিল, এমন সময় মোতি রায়ের লোকজন চুরির উপরে বাটপাড়ি করে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে আসে।
ঘটনাগুলো ক্রমে শৃঙ্খলিত হয়ে দেখা দেয় রাম বসুর মনে।
তার পারে?
মেয়েটা গঙ্গার ঘাট থেকে পালিয়ে যায়।
মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে রাম বসু, বাহবা দেয় রেশমীর সাহসকে।
এ যে সত্যি সুভদ্রা-হরণের কাহিনী। তার পরে কি হল বল?
এদিকে মেয়েটা পালাল, ওদিকে মাধব রায় দুয়ো দিয়ে বলতে লাগল, মোতি রায়ের আর সেদিন নেই, নইলে মেয়েটা পালাবার পথ পায় কি করে? তাই না মোতি রায় গর্জে উঠল।
মোতি রায়ের কাল্পনিক গর্জনের অনুকরণে রাম পণ্ডিত হঠাৎ এমন বাস্তব গর্জন করে উঠল যে পোডোর দল আঁতকে উঠল, গোটা দুই ছেলে তো ডুকরে কেঁদে উঠল।
না রে না, তোদের বলি নি, তোরা পড়বলে আশ্বাস দিয়ে বলে যেতে লাগল রাম পণ্ডিত।
বুঝলে কিনা মিতে, সেই থেকে পুলিসের সঙ্গে যোগসাজসে আরম্ভ হল পাড়ায় অত্যাচার।
পাড়ায় অত্যাচার আরম্ভ হতে যাবে কেন?
আরে মেয়েটাকে খুঁজে বার করতে হবে তো!
পাড়ার লোকে কি জানে রেশমীর?
নইলে আর অত্যাচার বলছি কেন? কচি বয়সের মেয়ে দেখলেই ধরে নিয়ে যায় সেই ‘ড়িটা মনে করে।
রাম বসু বলে, এ যে দেখছি বিশল্যকরণী না পেয়ে গন্ধমাদন-বহন!
ঠিক তাই ভায়া, বলে রাম পণ্ডিত। তার পরে বলে, কাল রাত থেকে নাকি তোমায় টুশকিও উধাও হয়েছে।
আমিও তাই শুনলাম।
তবে আর সন্দেহ নেই, ধরে নিয়ে গিয়েছে কাশীপুরের বাগানবাড়িতে।
এখন উপায়? নিরুপায় ভাবে জিজ্ঞাসা করে রাম বসু।
আর যাই কর মিতে, ঝোঁকের মাথায় কাশীপুরের বাগানবাড়ির দিকে যেয়ো না, সঙীন খাড়া করে পাহারা দিচ্ছে মোতি রায়ের বরকন্দাজের দল।
যতদূর যা জানবার জেনে নিয়েছে রাম বসু, তাই সে এবারে বিদায় নিয়ে উঠে পড়ল, আর গঙ্গারামকে নিয়ে দুত রওনা হল জনের অফিসের মুখে।
সে বুঝল যে, সৌরভীই রেশমী, ঘটনাক্রমে রেশমী পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল টুশকির বাড়িতে। আরও বুঝল যে, কাল রাতে মোতি রায়ের লোকে ধরে নিয়ে গিয়েহে টুশকিকে কাশীপুরের বাগানবাড়িতে। সে ভাবল যে, রেশমী ব্যাপার অনুমান করে রওনা হয়ে গিয়েছে কাশীপুরে, কিংবা হয়তো খোদ মোতি রায়ের কাছে গিয়েই উপস্থিত হবে সে। রেশমীর চরিত্র ও সাহস, তার চেয়ে বেশি কেউ জানে না। সে বুঝল যে, এখন টুশকি ও রেশমীকে রক্ষা করা তার সাধ্যের অতীত-এক ভরসা জন, সে যে শেতাঙ্গ।
হেঁটে যেতে বিলম্ব হবে দেখে একটানা ফিটন গাড়িতে দুজনে চেপে বসল, জলদি চল কসাইটোলা।
.
৪.১৭ রেশমী আবির্ভাব
মোতি রায়ের খাস কামরায় মোতি রায় আলবোলার নল মুখে তাকিয়ার উপরে ভর দিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। পাশে নীচু একটা জলচৌকির উপরে চণ্ডী বলী উপবিষ্ট। চণ্ডী বক্সী ইতিপূর্বে দেশে ফিরে যাওয়ার আবেদন পেশ করেছে, সঠিক উত্তর পায় নি; এবারে আবার প্রসঙ্গটা উত্থাপন করল, বলল, হুজুর, এবারে দেশে ফিরে যাওয়ার হুকুম করে দিন।
মোতি রায় বার দুই নড়ে-চড়ে বলল, সে কি কথা বী, আজ তো যাওয়া হতেই পারে না। আজ বাগানবাড়িতে নাচ-গান আছে, শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তি সব আসবে, আমাদের মেধোটাকেও নিমন্ত্রণ করেছি, তার পরে আড়াই হাজার টাকার বাজি পুড়বে। এসব না দেখে কোথায় যাবে? তা ছাড়া তোমার পারিতোষিকের কথাটাও ভেবে দেখতে হবে, কি দেওয়া যায় না যায় এখনও স্থির করি নি।
চণ্ডী সবিনয়ে বলল, কিন্তু হুজুর, অনেককাল দেশছাড়া, ওদিকে সব নষ্ট হয়ে যাওয়ার উপম হল বলে খবর পেয়েছি।
তা বটে, কিন্তু আর একটা দিন বই তো নয়, এর মধ্যে আর কত কি হবে।
তার পরে প্রসঙ্গ পাটে আরম্ভ করল, যাই বল বী, তোমাদের রেশমী মেয়েটা খুব তোয়ের মেয়ে। প্রথমে খানিকটা গুই-গাঁই করেছিল, বুঝলে না বী, প্রথমে অমন একটু আপত্তি না করলে দর বাড়ে না, কিন্তু শেষে…এই বলে গতরান্ত্রির অভিজ্ঞতার যে বাস্তব ও বিস্তারিত বিবরণ দিতে লাগল, তাতে বীর মত পাষঙও অধোবদন হয়ে গেল, সে নীরবে বসে ঘরের কার্পেটের নয়াগুলো পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।
