আরও বারকয়েক পায়চারি করে সে আরম্ভ করে, রেশমীর সন্ধান পেয়ে তাকে যখন আনবার ব্যবস্থা করছি, তখন সেই চাপা শয়তানী লিখে পাঠাল যে সে আসবে না, মদনমোহনকে বিয়ে করবে। লিখে পাঠাল, এখন মদনমোহনই তার আশ্রয়, তার শান্তি, তার স্বামী। চিতাতে ওর পুড়ে মরাই উচিত ছিল, ওকে বাঁচিয়ে তোমরা অন্যায় করেছ। এমন জঘন্য জীবের বেঁচে থাকবার অধিকার নেই। শুনলে তো। হল তো? দেখলে তো তোমাদের রেশমী কি বস্তু?
রাম বসু বলল, দেখ জন, মানুষের পক্ষে সবই সম্ভব, তবু রেশমীর ক্ষেত্রে এসব বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না।
কেন বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না? ওর মুখটা সুন্দর বলে?
না, ওর মনটা সরল বলে।
ওর সরলতা সাপের সরলতা, বড় মারাত্মক। কিন্তু তোমার যখন এতই বিশ্বাস সেই কুলটার উপরে, নাও পড়ে দেখ এই চিঠিখানা।
এই বলে সে টেবিলের কাছে গিয়ে সযত্ন-রক্ষিত রেশমীর চিঠিখানা ঘৃণাভরে দুই আঙুলে তুলে রাম বসুর দিকে ছুঁড়ে দিল।
চিঠিখানা পরম আগ্রহে এক নজরে পড়ে বসু বলে উঠল, জন, এ চিঠির উত্তর দিয়েছ?
নিশ্চয় দিয়েছি।
তা জানি। কি লিখেছ?
যা লেখা উচিত। লিখেছি, তুমি বাজারের বেশ্যা, তোমার উপপতি মদনমোহন একটি লম্পট। লিখেছি, এবারে যেন উপপতির সঙ্গে পুড়ে মরতে পার। এর আগেই তোমার পুড়ে মবা উচিত ছিল।
হতবুদ্ধি বসু বলে, লিখেছ এইসব মর্মান্তিক কথা?
লিখব না!
কি সর্বনাশ করেছ জন!
কেন?
কেন কি! এ চিঠির অর্থ তুমি ভুল বুঝেছ!
বসুর অটলতায় জনের বিশ্বাসে টোল খায়, বলে, চিঠিখানা তো খুব দুরূহ নয়।
তোমাদের মত শ্বেতাঙ্গের কাছে দুরূহ বই কি।
কি ব্যাখ্যা তুমি করতে চাও এ চিঠির! তুমি দেখছি শয়তানের উকিল!
জন, আমি শয়তানের উকিল নই, নির্বুদ্ধিতারূপ শয়তান ভর করেছে তোমার ঘাড়ে। মদনমোহন কোন মানুষ নয়, এক দেবতার নাম, মদনমোহন একটা deity, কলকাতার যে-কোন হিন্দু তার নাম জানে। মদনমোহন শব্দটি বললে যে কোন হিন্দু মিত্র জমিদারদের সেই deity বা দেবতাকে বুঝবে।
জনের মন বিচলিত হয়, তবু ভাঙে না; বলে, তুমি হয়তো ভুল বুঝেছ। আচ্ছা, মদনমোহন যদি deity হবে তবে তাকে বিবাহ করবার কথা বলে কি করে?
ও সমস্ত রুপক, অ্যালিগরি। ভগবানকে আমরা কখনও পিতা বলি, কখনও মাতা বলি, আবার কখনও স্বামীরূপে কল্পনা করি। এ ভাবের কথা কি কখনও শোন নি?
শুনেছি বটে। বলে জন।
তোমার চিঠি কি পৌঁছেছে রেশমীর হাতে?
গঙ্গারাম গিয়ে তার স্বহস্তে পৌঁছে দিয়ে এসেছে। বে
শ করেছে, খুব করেছে। নির্বোধ, নির্বোধ, তুমি কি করেছ জান না।
জন এবারে বোঝে যে, প্রকাণ্ড ভুলে করেছে সে।
কোথায় আছে সে?
গঙ্গারাম জানে।
ডাক গঙ্গারামকে।
গঙ্গারাম আসে।
রাম বস শুধায়, কোথায় আছে রেশমী?
আজ্ঞে মদনমোহন-তলায়।
মদনমোহন-তলায়! চমকে ওঠে রাম বসু। চল এখনই আমার সঙ্গে, দেখিয়ে দেবে। জন বলে, মুন্সী, আমিও যাব, ক্ষমা প্রার্থনা করব তার কাছে।
ক্ষমা প্রার্থনা করবে! ভারি উদারতা দেখানো হচ্ছে। কিন্তু তোমার ক্ষমাপ্রার্থনা শোনবার জন্যে সে এতদিন বেঁচে আছে কিনা সন্দেহ।
কেন?
আবার জিজ্ঞাসা করছ কেন? ও রকম চিঠি পেয়ে কোন মেয়ে কি আর বেঁচে থাকে? বিশ্বাস না হয়, জিজ্ঞাসা করে দেখ তোমার বোন লিজাকে?
এই বলে সে গঙ্গারামকে নিয়ে বেরিয়ে যায়।
জন ঘরের মধ্যে ঢুকে কান্নায় ভেঙে পড়ে বিছানার উপরে। কি আনন্দময় দুঃখ!
.
মদনমোহন-তলায় একটা বাড়ির সম্মুখে এসে গঙ্গারাম দাঁড়াল।
রাম বসু চমকে উঠল, একি, এ যে টুশকির বাড়ি!
গঙ্গারাম বলল, টুশকি কি খুসকি জানি নে, এই বাড়িতেই মেয়েটা আছে।
দরজা খোলা-টুশকি, টুশকি ডাকতে ডাকতে রাম বসু ঢুকে পড়ল।
রাধারানী সম্মুখে এসে দাঁড়াল, একি, আপনি? এতকাল পরে?
রেশমী বেরিয়ে যাওয়ার অল্পক্ষণ পরেই রাম বসু এসে উপস্থিত হয়েছে, তখনও রাধারানী ঘরের কাজ সারছিল। আর কি করা উচিত তা ভেবে পায় নি সে।
ভাল আছিস রাধারানী? কই টুশকি কই?
বসুন, সব বলছি। আজ সকালে এসে শুনলাম যে, তিনি সেই কাল কোথায় আরতি দেখতে বেরিয়ে গিয়েছিলেন, আর ফেরেন নি।
ফেরেন নি! বলিস কি রে? রেশমী কোথায়।
রেশমী আবার কে?
সেই যে-মেয়েটি এ বাড়িতে থাকত?
ও, সৌরভী দিদিমণি?
ক্ষিপ্রবুদ্ধি রাম বসু বুঝলে যে, ঐ নামের পরিচয় দিয়েছিল রেশমী।
বলল, হাঁ, কোথায় গেল সৌরভী?
তিনি তো এখনই বেরিয়ে গেলেন।
বেরিয়ে গেলেন! কোথায় গেলেন?
এ কেমন করে বলব। সকালবেলায় কাজ করতে এসে দেখি যে, দিদিমণি শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। শুধালাম, কি দিদিমণি, এমন অবস্থা কেন? তিনি বললেন যে, টুশকি দিদি কাল সন্ধ্যেয় গিয়েছেন, এখনও ফেরেননি।
তাই খুঁজতে বেরিয়ে গেল?
মনে তো হল তাই।
কিন্তু কোথায় গেল কিছু বলে গেল না?
সে অনেক কথা কায়েৎ দা, আপন বসুন বলছি।
না, আমি বেশ আছি, তুই কি জানিস বল।
তখন সে মোতি রায়ের দৌরাত্ম্যের কথা যেমন জানত বলল। কিন্তু রেশমীই যে তার লক্ষ্য না জানায় পরিষ্কারভাবে বোঝাতে পারল না টুশকির অন্তর্ধান ও রেশমীর অকস্মাৎ গৃহত্যাগের রহস্য।
রাম বসু বুঝল যে রাধারানীর কাছ থেকে আর বেশি কিছু জানবার সম্ভাবনা নেই। সে স্থির করল, অন্যত্র সন্ধান নিতে হবে। তখন সে বলল, রাধারানী, তুই ঘরের কাজ সেরে দরজা বন্ধ করে চলে যা। আমি পরে আবার ফিরব।
