তার পরে তার আরম্ভ হল দুঃখের জীবন, দুঃখের আর লজ্জার। লোকটা তাকে বিক্রী করে দিল চিৎপুরে এক বাবুর কাছে। বাবুটি তাকে তৈরি করে দিয়েছিল এই বাড়িটা, দিয়েছিল কিছু টাকা আর এই টুশকি নামটা। টুনি চাপা পড়ে গেল টুশকির তলায়। ভালই হল। টুনি তো মরেছে। কিছুদিন পরে বাবুটি মারা গেল। তখন টুশকি হল স্বাধীন। ইচ্ছা করলে জোডামউ গায়ে ফিরে যেতে পারত, কিন্তু সে ইচ্ছাকে প্রশয় দিল না সে। মৃত টুনির আর পুনর্জীবন লাভ সম্ভব নয়। এমন সময় পরিচয় হল রাম বসুর সঙ্গে বসু হল তার কায়েৎ দা। কলকাতায় এসে এই প্রথম স্নেহের স্বাদ পেল, মেহের মিশ্রণ। ঘটেছিল বলেই তাদের যৌন সম্পর্কটা বিকৃত হয়ে ওঠে নি। মেয়েরা স্নেহ-ভালবাসা অবশ্যই চায়, কিন্তু সবচেয়ে বেশি চায় এমন লোক যার উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করতে পারে তেমন পুরুষকে অদেয় কিছু থাকে না নারীর। তার পরে সৌরভীর ছদ্মবেশে এল রেশমী, তার বোন। সে ভাবে তাদের ভাইবোন সকলেরই কি এক দুঃখের ভাগ্য!
আবার দ্বিগুণ বেগে কান্না চেপে আসে। জলে গাল ভেসে গিয়ে কাপড় ভিজে যায়। কিন্তু যে দুঃখ স্তম্ভিত হয়ে আছে মনের মধ্যে, তার তুলনায় এ কতটুকু। হিমালয়ের সব তুষার গললে কি এক ছটাক জমিও জেগে থাকত!
তার মনে পড়ে—অদৃষ্টের কি নিদারুণ পরিহাস! আজ সন্ধ্যাতেই সৌরভী তার পরিচয় দেবে বলেছিল, সে-ও স্থির করেছিল নিজের পরিচয় দেবে। আর দু ঘন্টা সময় পেলেই দুই বোন মুখোমুখি হত ভিন্ন পরিবেশে। আর এখন? আর কি সে ফিরে যেতে পারবে ঘরে? মোতি রায়ের শাসন যেমন দুর্লঙ্ঘ্য, বাসনা তেমনি দুর্জয়।
শিউলির গন্ধ প্রবলতর হয়ে উঠেছে। সে ভাবে, ফুটেছে এতক্ষণে সব ফুলগুলো। তাকিয়ে দেখে, তাই তো, আলোতে গিয়েছে আকাশ ভরে। ভোরের আলোর সম্মুখে সে লজ্জায় এতটুকু হয়ে যায়। সে ভাবে যে, এর চেয়ে রাত্রির অন্ধকার ভাল ছিল। রাত্রিটা মোতি রায়ের কামনা দিয়ে তৈরি সত্যি, কিন্তু সে মজাকে ঢেকে দেবার জন্যে অন্ধকারেরও তো অভাব হয় না। হঠাৎ মনে পড়ে সৌরভীর কথা–না জানি কি করতে সে এতক্ষণ!
.
বিনিদ্র রেশমীর চোখের উপরে দিনের আলো ফুটে ওঠে। সে ভাবে, কাকে জিজ্ঞাসা করবে, কোথায় সন্ধান করবে টুশকি-দির।
বেলা আটটা নাগাদ আসে রাধারানী।
তার শুকনো মুখ দেখে রাধারানী শুধায়, কাল রাতে ঘুমোও নি দিদিমণি?
না।
অসুখবিসুখ হয়েছিল?
টুশকি-দি আরতি দেখতে গিয়েছিল, এখনও ফেরে নি।
বল কি! ভয়ে বিস্ময়ে বলে রাধারানী।
কোথায় গেল বলতে পারিস?
রাধারানী কপালে হাত ঠেকিয়ে বলে, কপাল পুড়লে যেখানে যায়, বোধ করি সেখানেই।
গম্ভীরভাবে শুধায় রেশমী, তার মানে?
আরও খুলে বলতে হবে নাকি? বোধ করি মোতি রায়ের লোকের হাতে পড়েছে।
অবিশ্বাস করবার কিছু নেই। রেশমী বোঝে যে, এতদিন যে আগুনে পাড়াপড়শীর ঘর পুড়ছিল, এবারে তার ফুলকি এসে পড়েছে নিজেদের ঘরে। সে একদণ্ড নিশ্চল গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তার পরে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হয়।
ওকি, কোথায় চললে? শুধায় রাধারানী।
উত্তর না দিয়ে, পিছনে ফিরে না তাকিয়ে, অবিচলিত পায়ে রেশমী চলতে থাকে উত্তর দিকে।
৪.১৬-২০ রাম বসুর প্রত্যাবর্তন
যেদিন রেশমী টুশকির বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেল, সেদিনই খুব ভোরবেলা রাম বসু জনের অফিসে এসে উপস্থিত হল। সে আগেই খোঁজ নিয়ে জেনেছিল যে, জন এখন অফিসে থাকে।
তাকে দেখে জন বিস্মিত হয়ে শুধাল, একি, মুন্সী যে! এক যুগ পরে কোথা থেকে এলে! তোমার আশা তো একরকম ছেড়েই দিয়েছিলাম!
রাম বসু বলল, এক যুগ না হলেও মাসখানেক হল নিশ্চয়।
কোথায় ছিলে এতদিন, কি করলে এতদিন?
রাম বসু বলল, দাঁড়াও, একে একে সব উত্তর দিই। তার পর আরম্ভ করল, তোমরা তো চলে এলে, আমি কিন্তু আশা ছাড়লাম না রেশমীর। যেখানে যেখানে তার যাওয়ার সম্ভাবনা, গেলাম সব জায়গায়—এমন কি মদনাবাটি অবধি যেতে ত্রুটি করি নি। কিন্তু না, সব বৃথা; পেলাম না তাকে।
জন বলে, যেখানে নেই সেখানে পাবে কি করে? কিন্তু মুন্সী, রেশমী সম্বন্ধে আমার আর কোন আগ্রহ নেই।
সেটা আশ্চর্য নয়। যাকে পাওয়া গেল না তার সম্বন্ধে আগ্রহ পরিত্যাগ করাই। শ্রেয়।
পাওয়া গেল না একথা সত্য নয়। পাওয়া গিয়েছে রেশমীর সন্ধান।
আনন্দে বিস্ময়ে বসু বলে ওঠে, পাওয়া গিয়েছে রেশমীর সন্ধান! কোথায়, কোথায় সে? কি করে পেলে সন্ধান, সব খুলে বল?
জন বলে, তার আগে বল মদনমোহন কে?
হতবুদ্ধি রাম বসু বলে, মদনমোহন! কেমন করে জানব কে সে?
এবারে সে ভাল করে জনের মুখ দেখে বলে, তোমাকে এমন ক্লিষ্ট দেখাচ্ছে কেন? কি হয়েছে বল দেখি?
জন রুষ্টভাবে বলে, আগে বল মদনমোহন নামে কোন রাঙ্কেলকে তুমি জান কি
রাম বসু কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলে, কই না, ও নামে কোন লোক তো মনে পড়ছে না। কিছু হঠাৎ এর মধ্যে মদনমোহন এল কেন? রেশমীর কি জান বল?
জন দাঁড়িয়ে উঠে পায়চারি করতে করতে বলে, রেশমী আস্ত একটি বেশ্যা। আর ঐ মদনমোনহ আস্ত একটি লম্পট।
কিছু বুঝতে না পেরে রাম বসু নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে। জন বলে যায়, তবে শোন, অনেক সন্ধান করে রেশমীর সন্ধান পাই, কিন্তু না পেলেই বোধ করি ভাল ছিল।
বসু কিছু বলতে যাচ্ছিল, বাধা দিয়ে জন বলল, থাম, আগে সবটা শোন, বুঝতে পারবে কি শয়তানী সেই মেয়েটা।
