.
৪.১৫ প্রভাতচিন্তা
শেষ রাতে টুশকি জেগে ওঠে। দেখে—বিছানা শূন্য, দরজা খোলা, ঘর অন্ধকার। কোথায় আছে মনে পড়ে না তার। খোলা জানালা দিয়ে শরতের ভোর-রাতের শীতল বাতাস, অস্ফুট স্বচ্ছতা তাকে সম্বিৎ দেয়। মনে পড়ে ক্রমে ক্রমে রাতের অভিজ্ঞতা, কাপড় সামলে নিয়ে সে উঠে বসে।
প্রথমে মনে হল পালিয়ে চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু তখনই স্মরণ হল মোতি রায়ের সতর্ক নিষেধ, পালাতে চেষ্টা কর না, মারা পড়বে। পাহারা তো আছেই, বাড়ির মধ্যে আছে দুটো ডালকুত্তা। তারা রেশমী পশমী বুঝবে না, ছিঁড়ে কুটি কুটি করে ফেলবে। ক্রমে অনেক কথা মনে পড়ে তার। নেশার ঝোকের মধ্যেও মোত রায় মর্যাদার কথা ভোলে নি; বলেছিল, রেশমী, তুমি পালিয়ে যাওয়ায় আমার জ্ঞাতি-ভাই-লোকটা বরাবর আমার শরটিয়ে বেড়াচ্ছিল যে, সাহেবরা তোমাকে লুটে নিয়ে গিয়েছে। এর পরে আমার মানসম থাকে কেমন করে? তোমাকে খুঁজে বার করবার জন্যে বিস্তর খরচা করেছি, ঢালাও হুকুম দিয়েছি—যত টাকা লাগে নাও, রেশমীকে খুঁজে বার কর।
টুশকি নীরবে সব শুনে গিয়েছে।
মোতি রায় বলে চলে, আজ তোমাকে পাওয়া গেল। আগামী কাল এখানে মস্ত মাইফেলের আসর বসবে। শহরের গণ্যমান্য লোক সকলকে নিমন্ত্রণ করব, আমার সেই জ্ঞাতি-ভাইটিও বাদ যাবে না। নাচ গান বাজনা কিছু বাদ পড়বে না, নিকি বাইজিকে বায়না দিয়ে রেখেছি একশ মোহর, নূতন চালান বিলিতি মদে নীচের তলার একটা ঘর ভর্তি, আতসবাজিরও ব্যবস্থা আছে। সবই আছে, কেবল ছিল তোমার অভাব—এবারে সে অভাবটাও পূর্ণ হল, বুঝলে?
টুশকি চুপ করে শোনে।
একবার সকলে এসে দেখে যাক যে, বাঘের মুখের শিকার ছিনিয়ে নিলেও নেওয়া যায়, কিন্তু মোতি রায়ের মেয়েমানুষেকে ছিনিয়ে নেয় এমন কার সাধ্য! বুঝলে তো, বড়লোকের মান-মর্যাদা রক্ষা করা কত কঠিন। তা পরদিন ইচ্ছা করলে তুমি চলে যেও জোড়ামউ, চণ্ডী আর মোক্ষদা বুড়ি তো কাছেই রইল।
এমন কত কথা মাতালটা বলে যায়। নিরুত্তরে শোনে টুশকি, উত্তর দেয় না। কেবল এইটুকু বোঝে নিদারুণ ভবিতব্যের শেষ ধাপ পর্যন্ত না গিয়ে তার নিস্তার নেই।
এখন শেষরাতে জেগে উঠে মনে পড়ে সেই সব কথা—আর মনে পড়ে পূবস্মৃতির ছিন্ন টুকরোগুলো। সেগুলোকে গুছিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে বিছানা ছেড়ে খোলা জানালার কাছে এসে বসে।
শরৎতের প্রদোষান্ধকারে প্রায়ফুট শিউলিফুলের গন্ধে স্মৃতির মলমল অবারিত হয়ে যায়, মাতৃঅঞ্চলের মত তার প্রান্ত এসে স্পর্শ করে টুশকির গায়ে। সারা গা ওঠে কাঁটা দিয়ে। মোতি রায়ের মুখে রেশমীর যে পরিচয় পেয়েছে, তাতে এখন সে নিঃসন্দেহ যে, সৌরভীই রেশমী, আর তারা দুইজনে সহোদরা। চাপাপড়া অতীতের ঢাকনা খুলে। যায় তার মনে। বাল্যকালে বাড়ির বাগানে শিউলিফুল কুড়োতে যেত সে, পিছন পিছন চলত খলিত-পদে শিশু রেশমী। মা পিছন থেকে নিষেধ করত-ওরে এত ভোরে ঘাসের মধ্যে যাস নি, নিওর লেগে অসুখ করবে। কে কার কথা শোনে। অচল ফুলে ভরে উঠলে রেশমীকে ভাগ দিতে হত, নইলে সে কিছুতেই ছাড়ত না। বারান্দার উপরে ছোট্ট ভাইটি হামা দিত, ফুল দেখলেই খিল খিল করে হেসে তার উপরে এসে পড়ত। আরে রাখ রাখু—রেশমী, ওকে টেনে সরিয়ে নে, এ যে পূজোর ফুল।
দূর থেকে মা হাসত। বলত, টুনি খুব ধার্মিক হবে, ঠাকুর বলে এত টান।
আজকের ভোরের শেফালির গন্ধ কেন কে জানে-টান দিল মনের কোন্ নিভৃতে, সেদিনের স্মৃতি অবারিত হয়ে পড়ল। গন্ধে গন্ধে এ কি নিগুঢ় যোগাযোগ!
টুনি তার আসল নাম, জীবনস্রোত নূতন খাতে এসে পড়লে নামটা বদলে নেয়, করে টুশকি, কেবল আদ্যক্ষরটুকু মাতৃ-আশীর্বাদী নির্মাল্যের মত মাথায় খুঁজে রাখে।
নূতন জীবন আরম্ভ করবার পর মায়ের ভবিষ্যদ্বাণী স্মরণ করে কাঁদত সে, মেয়ে আমার ধার্মিক হবে, ঠাকুর বলে এত টান! আজ আবার বুক ফেটে কান্না এল, দুই চোখ গেল ভেসে। দুর আজ যে হঠাৎ নিকটে এসে পড়েছে।
সেদিনটার কথা আজও স্পষ্ট মনে পড়ে টুশকির, যেন এই সেদিন মাত্র ঘটেছে। কত আগে—তবু কত কাছে। সময়ের বাঁধা মাপে কি মানুষের মন চলে।
শীতের শেষরাত্রে গঙ্গাসাগরে স্নানের জন্য নৌকা করে রওনা হয়েছিল তারা–বাপ মা, টুনি আর ছোটভাই নাড়। রেশমীকে কিছুতেই দিদিমা ছাড়ল না; বলল, ঐ রোগা মেয়ে পথেই মারা পড়বে। টুশকির বাপের বাড়ি আর মামার বাড়ি এক গ্রামেই। সঙ্গে গায়ের আরও কয়েকজন লোক ছিল। টুশকি এতদিন এসব কথা ভাবতে চায় নি, মনের অতীতের দরজাটা জোর করে বন্ধ করে রেখেছিল। আজ স্মৃতির উত্তরে হাওয়ায় হঠাৎ দরজা খুলে গিয়ে হু-হু করে বেরিয়ে আসছে চাপা ঘটনার প্রবাহ। গঙ্গাসাগরে স্নান করে ফেরবার পথে সন্ধ্যাবেলা নৌকা তোলপাড়। সবাই একসঙ্গে জেগে উঠে ভাবল, এ কি, হঠাৎ বান এল নাকি? বান নয়, বোম্বেটে। তার পর দু-চার মুহূর্তের মধ্যে কোথা দিয়ে যে কি হয়ে গেল, অন্ধকারের মধ্যে বুঝতে পারা গেল না। হাত-পা-মুখ-বাঁধা অবস্থায় পড়ে রইল সে বোম্বেটের নৌকার এক কোণে। দুদিন বাদে কলকাতার কলিঙ্গাবাজারে একটা লোকের বাড়িতে তার স্থান হল। শুনল এখানেই নাকি তাকে থাকতে হবে। সেই লোকটা-উঃ কি বিষম কালো আর মোটা বলে দিল, পালাবার চেষ্টা ক’র না—কেটে দু টুকরো করে ফেলব। তার আগে সে কলকাতাও দেখে নি, কলিজাবাজারের নামও শোনে নি। কি হল তার বাপ-মায়ের, কি হল নাড়র জানতে পেল না। বোম্বেটেদের চাপা কথাবার্তা থেকে মনে হয়েছিল তারা সবই ডুবে মারা গিয়েছে, গায়ের যে তিনজন লোক সঙ্গে ছিল তারাও মারা পড়েছিল বাধা দিতে গিয়ে। সেদিনের কথা মনে পড়ে চোখ জলে ভেসে যায়, যেমন সেদিন চোখ ভেসে যেতে জলে। চোখের জলের উপরে কালের চিহ্ন পড়ে কি?
