কিছুক্ষণ পরে নৌকা গিয়ে তীরে ভিডল। আততায়ীরা টেনে নামাল টুশকিকে, নিয়ে চলল সঙ্গে। দু-চার মিনিটের মধ্যেই তারা এসে পৌঁছল একটা বাগানবাড়িতে। টুশকি বুঝল, এই সেই বহুত মোতি রায়ের বাগানবাড়ি। কোন কথা এ পর্যন্ত সে বলে নি, নীরবে সব দেখছিল। তাকে নীচের তলায় দাঁড় করিয়ে একজন উঠে গেল দোতলায়। ফিরে এসে লোকটা ইঙ্গিত করল, সকলে মিলে নিয়ে চলল টুশকিকে দোতলায়। একটা বড় হলঘরের মধ্যে তাকে ঢুকিয়ে দিয়ে দরজা বন্ধ করে তারা সরে পড়ল।
প্রদীপের তিমিত আলোতে সে দেখতে পেলে একখানা পালকের উপরে অর্ধশায়িত অবস্থায় পড়ে আছে মোতি রায়। মোতি রায়কে সে চিনত।
মোতি রায় সুরা-বিজড়িত কণ্ঠে বলল, কি দাঁড়িয়ে রইলে কেন, ঐ চৌকিখানায় বস।
টুশকি বসল না, যেমন ছিল তেমনি দাঁড়িয়ে রইল।
মোতি রায় তাকিয়া আশ্রয় করে একটু নড়েচড়ে উঠে বলল, বস রেশমী।
এবারে টুশকি কথা বলল–এই প্রথমবলল, আমি রেশমী নই।
গদগদ কণ্ঠে মোতি রায় বলল, রেশমী নও, পশমী তো?
ওটাও আমার নাম নয়।
আচ্ছা রেশমী না হও, পশমী না হও, সুতী তো?
খুব একটা রসিকতা করা হল মনে করে হেসে উঠল মোতি রায়।
শিউরে উঠে টুশকি ভাবল, কি বিকট হাসি, যেন নরকের দরজার শিকল খোলার ঝনঝন ধনি।
তবে তোমার নাম কি?
টুশকি।
বাঃ, বেশ মিষ্টি নামটি তো! দাঁড়াও দেখি কি কি মিল পাওয়া যায় তোমার নামের সঙ্গে-টুশকি, খুস্কি, ঘুষকি…আজ মাথাটা বেশ খুলেছে, হরু ঠাকুর থাকলে খুশি হত। দেখি আর কিছু পাওয়া যায় কিনা। মুচকি? উঁহু, ওটা চলবে না।
এতক্ষণ মোতি রায় নিজের মনেই বলে চলছিল, এবারে টুশকিকে লক্ষ্য করে বলল, বুঝতে পারছ না নিশ্চয়, ভাবছ লোকটা কি সব বাজে বকছে। তবে শোন, আমি হর ঠাকুরের কাছে গান-বাঁধা শিখছি। হরু ঠাকুর বলে যে, গান বাঁধতে হলে আগে হাতের কাছে মিলগুলো গুছিয়ে নিয়ে বসতে হয়। ঠাকুরের উপদেশ এমনি মনে ধরেছে যে, একটা শব্দ শুনলেই মিলগুলো আপনি মনে পড়ে যায়। টুশকি, খুস্কি, ঘুষকি—কিন্তু উঁহু-মুচকি চলবে না।
তার পরে হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে বলে ওঠে, কেন চলবে না, একশ বার চলবে। হরু ঠাকুর আপত্তি করলে তার মাসোহারা বন্ধ করে দেব না! আলবৎ চলবে, বাপ বাপ বলে চলবে। শোন না, ইতিমধ্যেই কেমন একটা গান বেঁধে ফেলেছি–
ঐ যে পাড়ার ঘুষকি,
নামটি তাহার টুশকি,
মাথা ভরা খুস্কি,
হেসে চলে মুচকি।
নিজেই নিজেকে উৎসাহিত করে বলে ওঠে, বাঃ বাঃ, বেড়ে হয়েছে! কাল ঠাকুরকে দিয়ে একটা সুর বসিয়ে নিতে হবে। কি বল?
হঠাৎ টুশকিকে লক্ষ্য করে বলে, কি, বসলে না?
এবারে টুশকি সাহস সঞ্চয় করে বলে, আপনি যে মেয়ের সন্ধান করছেন, আমি সে মেয়ে নই।
সে মেয়ে নও? চালাকি ক’র না চন্দ্রবদনী। ঐ কথা শুনতে শুনতে এই কদিনে কান পচে গিয়েছে—আজকে আসল মানুষটিকে পাওয়া গিয়েছে।
তার পর গুনগুন সুরে গেয়ে উঠল, ‘আজু রজনী হাম ভাগে পোহায়নু পেখনু পিয়ামুখ চন্দা’! তার পরে বলল, নাঃ কেবলই মাঝরাত, তা হক, পিয়ামুখ-চন্দা তো মিথ্যা নয়।
টুশকি স্থির কণ্ঠে বলল, আমি রেশমী নই, আমি মদনমোহনতলার টুশকি।
গম্ভীর কণ্ঠে বলে ওঠে মোতি রায়, আলবৎ তুমি জোড়ামউ গাঁয়ের…
স্মৃতির ক্ষীণ পর্দা নডে ওঠে টুশকির মনে।
আলবৎ তুমি জোড়ামউ গাঁয়ের রেশমী, চণ্ডী বক্সী তোমায় সনাক্ত করেছে…
স্মৃতির পর্দাখানা সবেগে আন্দোলিত হয় টুশকির মনে।
আলবৎ তুমি জোড়ামউ গাঁয়ের রেশমী, চণ্ডী বক্সী করেছে তোমাকে সনাক্ত। আর এতেও যদি বিশ্বাস না হয়, মোক্ষদা বুডিকে দিয়েও সনাক্ত করিয়ে দিতে পারি। এবারে বিশ্বাস হল তো যে, ঠিক মানুষটি এতদিনে পেয়েছি?
স্মৃতির পর্দাখানা আদ্যন্ত অপসারিত হয় টুশকির মনে।
আরও শুনতে চাও? খ্রীষ্টানরা তোমাকে শ্রীরামপুরে নিয়ে গিয়েছিল, খ্রীষ্টান করে বিয়ে করবে বলে। আমার লোকের সঙ্গে চণ্ডী বক্সী গিয়ে তোমাকে ছিনিয়ে নিয়ে আসে। তার পরে গঙ্গার ঘাট থেকে সেই যে পালালে—আজ এতদিনে পেখনু পিযামুখচন্দা। কি, আদ্যন্ত ইতিহাস জানি কিনা—কি বল?
টুশকির মনের মধ্যে আর একখানা সন্দেহের পর্দা নড়ে ওঠে। ঐ যে মেয়েটি অকস্মাৎ একদিন তার বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে নিয়েছিল, নাম বলেছে সৌরভী, বলেছে ডাকাতের হাত থেকে পালিয়ে এসেছে—তবে সেই সৌরভীই কি রেশমী? জোড়ামউ গাঁয়ের রেশমী? মোক্ষদা বুড়ি, চণ্ডী বক্সী, জোড়ামউ গ্রাম—নামগুলি স্মৃতির স্বর্ণময় ঘন্টা বাজাতে থাকে তার মনে। তবে তো সৌরভী তার আপন বোন। তখনই মনে পড়ে দু-জনার চেহারার সাদৃশ্য। রাধারানী চেহারার মিল দেখে জিজ্ঞাসা করেছিল, মেয়েটি কে হয় মা তোমার? ওরা নিজেরাও আয়নায় পাশাপাশি দুখানা মুখ দেখে কতবার চমকে উঠেছে। ঐ সৌরভীই তাহলে রেশমী, তার বোন! তার মনের মধ্যে স্মৃতির বিদ্যুৎ চমকাতে থাকে, দিগন্তের পর দিগন্ত উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। আসন্ন বিপদকে ছাপিয়ে যায় পূর্বস্মৃতির গুরুভার। সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, চৌকিখানায় বসে পড়ে।
মোতি রায় বলে ওঠে, এই তো চাই। আগে দণ্ডায়মান, তার পরে উপবেশন, সবশেষে শয্যাগ্রহণ। সে হাত বাড়িয়ে টুশকির আঁচল ধরে আকর্ষণ করে, টুশকি বাধা দেয় না।
টুশকি পালঙ্কে উঠতে উঠতে ভাবে কতজনকেই তো কতদিন দেহদান করতে সে বাধ্য হয়েছে, আজ না হয় নির্দোষ বোনকে রক্ষা করবার জন্যে দেহদান করল, ক্ষতি কি। হয়তো সব অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত হবে আজ। সে শুয়ে পড়ে। বাতি নিভে যায়।
