টুশকিকে নিরুত্তর দেখে বলে, কি, তাড়িয়ে দেবে নাকি?
শোন একবার কথা! মামলা না শুনেই রায়?
রায় কি হবে তা বুঝতে পারছি, কিন্তু তবু বলব।
যদি মনে খুঁত থাকে, না-ই বললে।
দিদি, আর এত ভার একা বইতে পারি নে।
বেশ, এস না তবে, ভাগ দাও। আমিও কিছু ভাগ দেব তোমাকে। তুমি কি ভাব দুঃখ একতরফা?
রেশমী বলে, এতদিন বোনের মত মায়ের মত আশ্রয় দিলে আর তোমার কাছে সত্য গোপন করে বসে আছি, বড় দুঃখ হত। কতবার ভেবেছি, বলব সব কথা তোমাকে। তখনই ভয় হয়েছে, যদি সে সব কলঙ্কের কথা শুনে তাড়িয়ে দাও, যাব কোথায়?
টুশকি বলে, আরে পাগলী, মানুষ কি দোষগুণ বিচার করে ভালবাসে? আগে ভালবেসে ফেলে তার পরে খুঁজে খুঁজে গুণ বের করে। ভালবাসা এমনই যে তাতে দোষকেও গুণ মনে হয়। দেখ নি মাঘের শিশিরে সূর্যের আলো পড়লে মুক্তো বলে মনে হয়!
রেশমী বলে, আজ সন্ধ্যাবেলা খুলে বলব সব, তার পরে যা থাকে কপালে।
বেশ তো, ভাগাভাগি করা যাবে দুঃখের, আমিও নেব দুঃখের ভার। দেখি কার দুঃখের ভার বেশি, কার কলঙ্কের রঙ বেশি গাঢ়।
তখন দুজনে স্থির করে যে, রাত্রে শুনবে তারা পরস্পরের কথা।
সন্ধ্যাবেলা মদনমোহনের আরতি দেখবার জন্যে টুশকি একাকী গেল। ইদানীং কয়েক দিন রেশমী যাওয়া বন্ধ করেছে, তাই টুশকি আর পীড়াপীড়ি করে না। আজকে রেশমীর মনটা অনেকটা হালকা, তবু সে গেল না। তার ইচ্ছা যে, দুজনে মুখোমুখি হওয়ার আগে মনটাকে গুছিয়ে প্রস্তুত করে নেবে। মনের মালখানায় সব ভূপাকারে অগোছালে পড়ে আছে—একটু সাজিয়ে-গুছিয়ে না নিলে নিজেরই যে পথ করে চলা কঠিন, অপরে ঢুকবে কি উপায়ে?
ভাবতে ভাবতে রেশমী ঘুমিয়ে পড়েছিল। যখন জাগল, দেখল বাতিটা কখন নিভে গিয়েছে, বুঝল রাত নিশ্চয় অনেক। ভাবল টুশকি নিয়মিত সময়ে নিশ্চয় ফিরেছে আর ঘুমের ঘোরে কখন হয়তো ওরা খেয়ে নিয়েছে, মনে না পড়বারই কথা। পাশে হাতড়িয়ে দেখল টুশকির বিছানা শূন্য। শূন্য? কোথায় গেল?
রেশমী উঠে বাতি জ্বালল। দেখল যে, বাড়ির মধ্যে কোথাও টুশকি নেই দেখল রান্নাঘরে দুজনের ভাত ঢাকা পড়ে রয়েছে, দরজা বাইরে থেকে বন্ধ। সে বুঝল টুশকি ফেরে নি। এমন সময়ে মদনমোহনের বাড়িতে ডঙ্কা বেজে উঠল। রেশমী বুঝল যে, রাত শেষ প্রহর। নিঃশব্দ আকাশের তলে প্রদীপ হাতে মূঢ়ের মত সে দাঁড়িয়ে রইল। সে রাত্রে টুশকি ফিরল না।
.
৪.১৪ রেশমী(?)-হরণ
সেদিন বিকাল থেকে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল, সন্ধ্যাবেলায় চেপে এল। টুশকি যখন মদনমোহনের বাড়িতে এসে পৌঁছল, দেখল আঙিনা জনশূন্য, নাট-মন্দিরের মধ্যে সামান্য কয়েকজন মাত্র লোক। আরতি শেষ হওয়াব আগে বৃষ্টিতে আবার জোর লাগল, বৃষ্টি কমবে আশায় অপেক্ষা করে রইল টুশকি। তখন মন্দির প্রায় জনশূন্য। অবশেষে বৃষ্টি কমে এল। রাত্রি অনেক হয়েছে, আর অপেক্ষা করা উচিত নয় মনে করে সে যেমন মদনমোহনের বাড়ি থেকে বেরিয়ে অন্ধকারের মধ্যে রাস্তায় নেমেছে, অমনি নিঃশব্দে তিন-চারজন লোক তার ঘাড়ের উপর এসে পড়ল। একজন একখানা গামছা দিয়ে তার মুখ বেঁধে ফেলল, আর জনদুই মিলে তাকে ধরাধরি করে নিয়ে যাত্রা করল। মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত রহস্য পরিষ্কার হয়ে গেল তার কাছে, বস্তুত রহস্যজনক কিছু ছিল না এতাদৃশ ব্যাপারে। টুশকি বুঝল, এরা মোতি রায়ের লোক, বুঝল সেই মেয়েটা মনে করে তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কাশীপুরের বাগানবাড়িতে। গুণ্ডাদের হাত থেকে উদ্ধার পাওয়ার চেষ্টা সে করল না, সাধ্য ছিল না—ইচ্ছাও বুঝি ছিল না; নীরবে বিনা আয়াসে সে আত্মসমর্পণ করল ভবিতব্যের কাছে। তাকে নিয়ে একখানা নৌকার উপরে তোলা হল, মুখ তখনও গামছায় বাঁধা, কিন্তু চোখ খো।লা, দেখতে বাধা ছিল না। সে দেখল যে আততায়ী তিনজন নৌকায় উঠল, চতুর্থ ব্যক্তি তীরে দাঁড়িয়ে রইল। জোয়ারের মুখে নৌকো ছুটে চলল উজানে। আকাশের অসীম অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে সে পড়ে রইল, মনে হল সৌরভী না জানি তার জন্যে কত রাত্রি পর্যন্ত জেগে অপেক্ষা করে থাকবে।
অপস্রিয়মাণ চতুর্থ ব্যক্তি চণ্ডী বক্সী। মোতি রায়ের প্ররোচনায় ও শাসনে রেশমীকে দেখিয়ে দিতে সে সম্মত হয়েছিল। চণ্ডী জানত যে, রেশমী কলকাতাতেই আছে, আর সাহেব-পাড়াতে না গিয়ে এদিকেই কোথাও লুকিয়ে আছে। মদনমোহনের বাড়িতে তার দেখা পাওয়া যাবে বলে তার যে ধারণা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তা সত্য বলে প্রমাণিত হল। মোতি রায়ের লোকের সঙ্গে আজ দুদিন মদনমোহনের বাড়িতে সে এসেছে, সাক্ষাৎ পায় নি রেশমীর। আজকে বৃষ্টির মধ্যে সে এসেছিল, চণ্ডী জানত দৈবদুর্যোগ এসব কাজের পক্ষে প্রশস্ত। তবে তার একটুখানি ভুল হয়ে গেল, সে ভুল দিনের খর আলোতেও অনেকে করছে, আর এ তো রাতের অন্ধকার। টুশকিকে রেশমী বলে ভুল করেছিল। চণ্ডী বলেছিল যে, সে দূর থেকে মেয়েটাকে ইশারায় দেখিয়ে দেবে, সামনাসামনি উপস্থিত হতে পারবে না; হাজার হক, গায়ের মেয়ে তো বটে।
রাস্তার উপরে দাঁড়িয়ে থেকে নাট-মন্দিরের আলো-আঁধারির মধ্যে টুশকিকে দেখে সে চমকে উঠল। এই তো রেশমী! তখন একবার ভাবল যে, দূর ছাই, না-ই ধরিয়ে দিলাম, ধরিয়ে দিলে মেয়েটার কি গতি হবে, সে বিষয়ে তার কোন প্রান্ত ধারণা ছিল না! তার পরে ভাবল, হুঁ, ওর জন্যে আবার এত চিন্তা কেন; ওকে বাঘে খেলেও খাবে, কুমীরে খেলেও খাবে। তা ছাড়া চিতা থেকে যে পালিয়েছে তার আবার সতীত্ব, তার আবার কুমারীত্ব। চণ্ডীর দৃঢ় প্রত্যয় হল যে, রেশমীর পক্ষে জনের শয্যায় আর মোতি রায়ের শয্যায় কোন প্রভেদ নেই। তবু মনের মধ্যে কেমন খচখচ করতে লাগল। তখনই মনে পড়ল, মোতি রায়ের সুরা-বিঘূর্ণিত চক্ষু আর শাসন। প্রাণের ভয় তুচ্ছ করে সৎ কাজ করতে যারা পারে, চণ্ডী বক্সী সে দলের নয়। রেশমীকে দূর থেকে দেখিয়ে দিয়ে সে আড়ালে গেল, তার পরে নির্বিঘ্নে সে নৌকায় নীত হলে অন্ধকারের মধ্যে সরে পড়ল।
