তবে এখন উঠি কর্তা।
আহা উঠবে কোথায়? আমার বাড়িতে কি তোমার একটু স্থান হবে না?
সে দায় আমার। তুমি এখানেই থাকবে।
এই বলে মোতি রায় খানসামার হাতে চণ্ডীর ভার অর্পণ করে।
চণ্ডী বোঝে যে, আগে ছিল নজরবন্দী, এবারে সত্যকার বন্দী।
তার পরে মোতি রায় রতনকে ডেকে হুকুম দেয়, দেখ মেয়েগুলোকে ধরে শহরের মধ্যে দিয়ে যেন টেনে নিয়ে যাওয়া না হয়, ওতেই চেঁচামেচি করে লোক জানাজানি হয়ে যায়। এবারে ধরেই ঘাটে নিয়ে গিয়ে নৌকায় তুলবে-আর সোজা নিয়ে যাবে কাশীপুরে। নদীর ধারেই বাগানবাড়িটা, জানাজানি হওয়ার ভয় থাকবে না।
রতন সরকার বলে, সেইরকম হুকুম করে দেব হুজুর।
আর বাড়িটা রঙ করা শেষ হয়েছে তো?
রতন সরকার জানায়, হয়েছে।
তবে আর কি, জলসার সব ব্যবস্থা ঠিক রেখ। মেয়েটা ধরা পড়লে…
কথা শেষ করে না, প্রয়োজন হয় না। না বোঝবার কিছু নেই।
তার পরে শুধায়, নিমন্ত্রণের তালিকা ঠিক করে রেখেছ?
হাঁ হুজুর।
দেখ, মাধব রায় যেন বাদ না পড়ে। দেখি তার মেম্বর স্বশুর কি করতে পারে!
এই বলে মুখ থেকে আলবোলার নল সরিয়ে হো হো শলে হেসে ওঠে মোতি রায়। ভয় পেয়ে কার্নিসের পায়রাগুলো ঝাঁক বেঁধে আকাশে ওড়ে।
.
৪.১৩ মুখোমুখি
মানুষের আর সব সম্বল যখন ফুরিয়ে যায়, তখন হাতে থাকে চোখের জল। ওর আর অন্ত নেই, কোন দুঞ্জেয় চির-হিমানী-শিখরে ওর উৎস। চোখের জলে ঝাপসা হয়ে সূর্য ওঠে রেশমীর, আবার চোখের জলের কুয়াশাতেই হয় তার অন্ত। চোখের জলের স্রোতে নিঃশব্দ প্রহরগুলো ভেসে চলে যায় রেশমীর জীবন থেকে। ঝরা শ্রাবণের পূর্ণিমার চাঁদের মত ও চোখের জলের বর্ষণ ঠেলে কোনরকমে এগোয়। এতদিনে ও বুঝতে পেরেছে সংসারে কাঁদবার অবসর অপ্রচুর নয়। গঙ্গায় ডুব দিয়ে কাঁদে, জলে জল মিশে যায়; ধোঁয়ার ছলনা করে কাঁদে, বাষ্পে বাষ্প মিশে যায়; আয়নার সম্মুখে দাঁড়িয়ে কাঁদে, ছায়াতে কায়াতে বেশ মিশে যায়; বালিসে মুখ লুকিয়ে কাঁদে, বিছানায় জল মিশে যায়; কিন্তু স্বপ্নের মধ্যে যখন কেঁদে ওঠে সে, ভাবে, ভগবান কি করলে, নিতান্ত হতভাগ্যকেও তুমি স্বপ্নসুখের বরাদ্দ করে থাকসেটুকুও কেড়ে নিলে আমার।
এত চোখের জল তো লুকানো থাকে না। টুশকি শুধায়—কি হয়েছে বোন, কিসের এত দুঃখ, বল খুলে আমাকে।
কি বলবে রেশমী? বলতে হলে আস্ত একখানা রামায়ণ বলতে হয়, ইচ্ছা হয় না রেশমীর, অথচ চোখের জলের একটা কারণ দর্শানো তো চাই।
সে বলে, দিদি, বাড়ির কথা মনে পড়ছে।
এটা অসঙ্গত কথা নয়।
টুশকি বলে, নিতান্ত যাওয়ার ইচ্ছা হয় তো বল, দেখি সেথো-সঙ্গী পাওয়া যায় কিনা।
রেশমী তো প্রকৃত তথ্য গোপন করেছে, তাই সেখো-সঙ্গীর জন্য আগ্রহ দেখায়।
টুশকি বলে, আচ্ছা না হয় এখন না-ই গেলে, দেখি তোমার গায়ের দিকে কোন লোক যায় তো তার হাতে একখানা চিঠি পাঠিয়ে দাও।
তাতেও বড় আগ্রহ প্রকাশ করে না রেশমী। দাবানলের হরিণী যেদিকে এগোেয় সেদিকেই আগুন।
অবশ্য আত্মসমর্পণ না করে উপায়ও থাকে না। টুশকি বলে, শোন বোন, তোমার চেয়ে আমার বয়স বেশি, সংসারটা দেখলামও বেশি, দুঃখ এমন জিনিস যা ভাগ করে নিলে কমে, আর সুখ এমন জিনিস যা ভাগ করে নিলে বাড়ে।
রেশমী বলে, দিদি, সুখের ভাগ নেবার লোকের অভাব হয় না, দুঃখের ভাগ নেবে
টুশকি বলে, আরে পাগল, সংসারটা বড় অদ্ভুত জায়গা, দুঃখের ভাগ নেবার লোকেরও অভাব হয় না এখানে।
তার পর একটু থেমে বলে, সে রকম লোক না গড়েই কি দুঃখ গড়েছেন বিধাতা!
নেবে তুমি আমার দুঃখের ভাগ? শুধায় রেশমী।
যদি দাও।
কেন নিতে যাবে পরের দুঃখ?
যদি চাও তো আমার দুঃখের ভাগও না হয় তোমাকে দেব।
তার পর হেসে বলে, সংসারে দুঃখের অভাব কি বোন?
তবে একটা গল্প শোন, বলে পুনরায় আরম্ভ করে টুশকি : সেবার গিয়েছিলাম সুন্দরবনে, তা সে আজ অনেক দিনের কথা হল, গাঁয়ের নাম ন’পাড়া, গাঁ আর বন পাশাপাশি, কোথায় গাঁয়ের শেষ আর কোথায় বনের শুরু বোঝবার উপায় নেই। আমি ভাবি, তা উপায় না থাকে না থাক, আমার তো ভালই হল, বন দেখতে এসেছি বন দেখি। এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াই। তাই দেখে বুড়িমা—যে বাড়িতে গিয়েছি সেই বাড়ির কত্রী-বলল, মা, অমন কাজটি ক’র নি, অমন একা একা যেখানে সেখানে যেও নি।
কেন মা? শুধাই আমি।
এখানে যে প্রত্যেক ঝোপে-ঝাডে বাঘ।
দিনের বেলাতেও?
দিনের বেলাতেও বইকি। দিনের বেলায় বাঘগুলো যাবে কোথায়।
তার পরে টুশকি দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে বলে, সংসারে প্রত্যেক ঝোপে-ঝাড়ে দুঃখ, জাগরণেও দুঃখ, ঘুমন্তেও দুঃখ। লোকে যখন বলে যে, ঘুমোলে দুঃখের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে, তখন আমার বুড়িমার কথা মনে পড়ে-দিনের বেলায় বাঘগুলো যাবে কোথায়? ঘুমোলে দুঃখগুলো যাবে কোথায়? তখন তারা স্বপ্নে গুঁড়ি মেরে এসে নিঃশব্দে ঘাড়ে লাফিয়ে পড়ে।
হঠাৎ নিজের মনটাকে সবলে ঝাঁকুনি দিয়ে জাগ্রত করে তুলে রেশমী বলে, শুনবে দিদি আমার সব কথা?
টুশকি বললে, শুনব বইকি।
শুনলে তাড়িয়ে দেবে না তো?
বিস্মিত টুশকি বলে, তাড়াতে যাব কেন?
হয়তো বাড়িতে রাখবার অযোগ্য মনে করবে।
টুশকি মনে মনে হাসে। মনে মনে বলে, তুমি এইটুকু জীবনে এমন কি পাপ করেছ জানি না, কিন্তু আমার সব কথা শুনলে এখনই এ বাড়ি ছেড়ে না যাও তো কি বলেছি।
