রতন সরকার সেইরূপ প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিদায় নিল।
মাঝখানের ঘটনা এখন প্রকাশ করে বলবার সময়। মাধব রায় মোতি রায়কে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে নিরস্ত করতে না পেরে সোজাসুজি রাধাকান্ত দেবের কাছে গিয়ে উপস্থিত হল। রাধাকান্ত দেব তখন নিতান্ত তরুণ যুবক। কিন্তু হলে কি হয়, শোভাবাজারের রাজপরিবারের ছেলে তো—ইংরেজ সরকারে তার অবারিত গতি, প্রচুর সম্মান।
মাধব রায় বলল, হুজুর, আপনি মুখ তুলে না চাইলে তো হিন্দুসমাজ তলিয়ে যায়।
রাধাকান্ত দেব আনুপূর্বিক জানতে চাইলে যা ঘটেছে, যা ঘটতে পারে এবং যা ঘটা অসম্ভব—সমস্ত একযোগে ঘটে গিয়েছে বলে নিবেদন করল মাধব রায়।
রাধাকান্ত বললেন, তোমাদের পাড়ায় যে এমন পৈশাচিক কাও চলেছে, তা তো জানি নে। যাক, ভয় কর না, আমি কাউন্সিলের মেম্বারকে জানাচ্ছি।
রাধাকান্ত দেবের নালিশ কাউন্সিলের মেম্বারের কানে পৌঁছল এবং তখন টনক নড়ল স্পোকারের। তার পরের ঘটনা হচ্ছে স্পোকার ও রতন সরকার সংবাদ।
রতন সরকার ফিরে গিয়ে সব জানাল মোতি রায়কে। মোতি রায় খেদবৈরাগ্য মিশ্রিত স্বরে বলে উঠল, মাধবটা সংসারে টিকতে দিল না দেখছি।
তার পর বলল, রতন, এখন তুমি যাও, একটু ভেবে দেখি।
পরদিন মোতি রায় বলল, দেখ, ঐ চণ্ডী বক্সীকে খুঁজে বার করতে হবে। এরা কেউ সেই মেয়েটাকে চেনে না, বকশিশের লোভে যাকে-তাকে ধরে গোল বাধাচ্ছে। যাও, খুঁজে বার কর চণ্ডীকে।
চণ্ডী কলকাতা ত্যাগ কবে নি। খোঁজাখুঁজির পরে তাকে পাওয়া গেল, মোতি রায়ের লোকজন তাকে হুজুরে হাজির করল।
নিভৃতে চণ্ডীকে ডেকে মোতি রায় জানিয়ে দিল যে, তোমার কোন ভয় নেই, বৃথা তুমি পালিয়েছিলে।
চণ্ডী জিভ কেটে বলল, পালাই নি হুজুর, সম্মুখে একটা যোগ পড়েছিল, তাই শব-সাধনার জন্যে শ্মশানে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলাম, আমরা তিন-পুরুষের তারিক কিনা।
বেশ বেশ, আমি তো এইরকম নির্ভয় লোককেই পছন্দ করি, বলে মোতি রায়।
দেখ চণ্ডী, তোমাদের মেয়ে স্নেচ্ছের হাতে পড়ে থাকবে, এটা কি উচিত হচ্ছে?
হুজুর, তারই প্রতিকার আশাতেই তো আমার শবসাধনা।
তার পরে সে নিজের মনে বলে ওঠে, এবারে মরবে বেটা ম্লেচ্ছ!
নিশ্চয় মরবে, বিশেষ তুমি যখন ক্রিয়া করেছ; কিন্তু সমস্ত ভার দৈবের উপর ছেড়ে দিলে তো চলে না, পুরুষকারের সাধনাও করতে হয়।
হয় বই কি হুজুর, দুটি চক্র না হলে কি গাড়ি চলে?
কী বলেছ চণ্ডী, গাড়ি চলতে দুটি চক্র চাই। আর মনে কর সে চক্র যদি রজত চক্র হয়, তবে গাড়ি কেমন চলে!
এই পর্যন্ত বলে হঠাৎ গম্ভীরভাবে বলে ওঠে মোতি রায়, বক্সী, এখানে খামকা বসে থেকে কি করবে, কিছু টাকা রোজগার কর, মেয়েটাকে সনাক্ত করে দাও।
একটু থেমে আবার শুরু করল, আর তা যদি না কর তবে মনে রেখ যে, আমিও শবসাধনায় বসতে জানি, জ্যান্ত মানুষের গর্দান স্বহস্তে কেটে শব প্রস্তুত করে নেওয়া আমার বিধান।
পরমুহূর্তেই হাসিতে মুখখানা প্রসন্ন করে বলল, নাও নাও বক্সী, মেয়েটাকে সনাক্ত করে দাও, একটু আমোদ-আহ্লাদ করা যাক। বুঝতেই তো পারছ, একদিন তোমারও তো ছিল আমার মত বয়স।
এই বলে হাঁক দিয়ে উঠল মোতি রায়, ওরে কে আছিস, ভাল হুঁকোয় করে অম্বুরী তামাক সেজে নিয়ে আয় বক্সীর জন্যে।
কিন্তু হুজুর, মেয়েটা যদি এখানে না থাকে?
এটা কি একটা কথা হল বক্সী? এখানে না থাকলে তুমি এখানে বসে আছ কোন্ আশায়?
মুহূর্তে প্রসঙ্গ পাল্টে বলে, নবাবী আমলের কিরিচ দেখেছ বক্সী? এক কোপে হাতীর গর্দান নামিয়ে দেওয়া যায়। আমার তোষাখানাতে খান-অষ্টেক আছে। দেখবে?
চণ্ডী বক্সী উত্তর দেয় না, কিন্তু তার ভাব-গতিকে স্বীকৃতি প্রকাশ পায় যে, এতদিনে তার জুড়ি মিলেছে। যেমন কাঠ তেমনি কাঠুরে। এ হেন যুগল যেখানে মিলিত হয়, সে স্থান সংসার-রসিকের তীর্থ।
চণ্ডী সবিনয়ে বলে, হুজুর, আমার বাড়ির মেয়েকে আমি ধরিয়ে দেব, লোকে বলবে কি?
নিশ্চয় নিশ্চয়। বলে প্রচুর সুগন্ধি ধূম উদগিরণ করে মোতি রায়। তার পর অনেকক্ষণ কুণ্ডলীকৃত ধোঁয়ার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে, যেন ওখানে সমাধান আছে এই জটিল সমস্যার। তার পর তাকিয়ার উপরে ভর দিয়ে দেহটাকে ঈষৎ উত্তোলন করে বলে, জানছে কে বক্সী, জানছে কে?
একটু পরে বলে, তাহলে তুমি স্বীকার করলে! বেশ, বেশ। ওরে কে আছিস, বক্সীর নাহারের ব্যবস্থা করে দে। কি বল বক্সী, কোথায় আর যাবে এত বেলায়?
তার পরেই মুখখানায় শাণিত গাম্ভীর্য এনে বলে, নবাবী আমলে একটি সুন্দর রীতি ছিল, আসামীকে ডালকুত্তা দিয়ে খাওয়ানো হত। কর্তাদের আমলে আমাদের বাড়িতেও সে রীতি দেখেছি। কোম্পানির আমলে সেসব সুন্দর প্রথা লোপ পেল। তবে এখনও গোটা দুই ডালকুত্তা আছে আমার। দেখবে নাকি বক্সী?
মোতি রায়ের মেদ-মেদুর মুখমণ্ডলে যুগপৎ স্নিগ্ধ আভা ও খরবিদ্যুৎ কি চমৎকার মানায়, বিস্মিত হয়ে দেখছিল চণ্ডী। সে বুঝল, স্বীকার না করলে নিতান্ত ডালকুত্তার পেটে যদি বা না যেতে হয়, বেঘোরে গুম-খুন হতে কতক্ষণ! সে বলল, হুজুরের কথার অবাধ্য আমি নই, তবে জানাজানি না হয়। ছুঁড়িটার দেখা পেলে আমি দূর থেকে দেখিয়ে দেব-আপনার লোকজন ধরে নিয়ে যাবে-এইটুকু দয়া আমাকে করতে হবে।
সে তো করতেই হবে। তুমি দেখিয়ে দিয়েই খালাস—তার পরে আমার লোকজন আছে।
