–জন স্মিথ।”
চিঠি লিখবার পরে মনের ভার খানিকটা হাল্কা হলে ঘুমিয়ে নিল সে ঘণ্টা দুই। তার পরে ভোরবেলায় গঙ্গারামকে চিঠি দিয়ে জন বলে দিল, জলদি দিয়ে এস—জবাব আনতে হবে না।
সন্ধ্যাবেলায় শারীরিক অসুস্থতার অজুহাতে রেশমী আরতি দেখতে গেল না, টুশকি একাই গেল। কিন্তু অসুস্থতার কোন লক্ষণ ছিল না রেশমীর শরীরে বা মনে। আজ সারাটা দিন একটি সু-গীত সঙ্গীতের মত তার কেটে গিয়েছে। মাঝে মাঝে খোঁপায় হাত দিয়ে দেখেছে চিঠিখানা লুকোনো আছে কিনা; অদৃশ্য ফুলের গন্ধে বনতল যেমন আমোদিত হয়ে ওঠে, সমস্ত অন্তর তার আজ তেমনি পূর্ণ। বিকালবেলায় চুল আঁচড়াবার জন্যে আয়নার সম্মুখে দাঁড়িয়ে সে চমকে উঠল, মুখে এ কি দিব্য কান্তি। চাঁদ পড়েছে মেঘে চাপা, তবু লাবণ্য টষ্টল করছে। সেই চাপা চাঁদের স্মরণে আজ শাড়িটি বিশেষ ভঙ্গীতে পরল, কপাল খয়েরের টিপটি আঁকল, তার পরে গোধূলির আলো-আঁধারিতে গঙ্গার পশ্চিম তীর যখন রসিয়ে তুলেছে, শুক্লা তৃতীয়ার চাঁদের ক্ষীণ ওষ্ঠাধর যখন আকাশের প্রান্তে কৌতুক-বর্ষণে উদ্যত, তখন প্রদীপটি জ্বেলে নিয়ে চিঠিখানা কোলের উপরে মেলে ধরল, মিলল কালো-পঙক্তির দুই চোখে আর তার সন্নত দুই চোখে। কি বহুপ্রতীক্ষিত মিলন চারি চক্ষুর!
এক নজরে চিঠিখানা পড়ে নিয়ে সর্পদষ্টবৎ অস্ফুট আর্তনাদ করে উঠল রেশমী। ফুলের মালায় ছিল সাপ, এতক্ষণ যে ফুলের মালাকে সযত্ন প্রশ্রয়ে বহন করছিল সে খোপার নিভৃত আশ্রয়ে। কিন্তু নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয় না রেশমীর, বার বার ফিরে ফিরে সে পাঠ করে; তার পরে কেমন যেন রোখ চড়ে যায় মাথায়, উচ্চস্বরে পাঠ করে চিঠিখানা; এতক্ষণ যা চোখে দেখছিল, এবারে শোনে তাই কানে; কোন কোন কথা আছে যা একটিমাত্র ইন্দ্রিয়ের সাক্ষ্যে বিশ্বাসযোগ্য হয় না—তাই একাধিক সাক্ষীর তলব পড়ে।
‘এমন করে একজনকে উপপতিরূপে বরণ করতে না।’….’এবারে উপপতির সঙ্গে পুড়ে মরবার সাহসে যেন বঞ্চিত না হও’…’তুমি বাজারের বেশ্যা’…ছত্রগুলো ছুরির ফলার মত আঘাত করে বুকে। আত্মঘাতপ্রয়াসীর যখন রোখ চড়ে যায় তখন যেমন সে বারংবার নিজেকে আঘাত করে উৎকট উল্লাস অনুভব করে, তেমনি অনুভূতি হতে লাগল ঐসব ছত্র পড়ে পড়ে রেশমীর-সে উপপতি গ্রহণ করেছে, সে যেন পুড়ে মরে, সে বাজারের বেশ্যা!
তার চিন্তাশক্তি এককালে লোপ না পেলে কথাগুলোর সত্যাসত্য বিচার করে দেখত সে, হয়তো তখন বুঝতে পারত যে, এর মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝি আছে, জনশ্রুতির হস্তক্ষেপ আহে। কিন্তু বিচারের শক্তি তার ছিল না। পূর্বাপরের সূত্র ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল তার জীবনে, সে যেন অতর্কিতে অত্যুচ্চ শিখর থেকে অতলস্পর্শ খাদে নিক্ষিপ্ত হয়েছে—দুঃসহবেগে ক্রমাগতই পড়তে পড়তে চলেছে, এর চেয়ে অনেক শ্রেয় ভূপৃষ্ঠে সংঘাত ও মৃত্যু।
কতক্ষণ সে এইভাবে মূঢ়ের মতন বসে ছিল জানে না, যখন সম্বিৎ পেল, শুনল টুশকির কণ্ঠস্বর। তাড়াতাড়ি চিঠিখানা আবার খুঁজল খোঁপার গুচ্ছে, ভাবল, পরীক্ষিতের মত তক্ষককে ধারণ করলাম মস্তকে, তার মতই যেন মুহূর্তে একমুঠি ভস্মমাত্র হয়ে অস্তিত্বের প্রান্তে মিলিয়ে যাই কোথাও একটুকু চিহ্ন যেন না থাকে যে রেশমী বলে কেউ কখনও কোথাও ছিল।
.
৪.১২ যেমন কাঠ তেমনি কাঠুরে
একদিন কলকাতার পুলিস সুপারিনটেন্ডেন্ট মিঃ পোকার মোতি রায়ের দেওয়ান রতন সরকারকে ডাকিয়ে বলল, সরকার, বড় বাড়াবাড়ি হচ্ছে, একটু সামলে চলতে হবে।
রতন সরকার বলল, হুজুর, আমরা খুব সাবধানে চলছি, কেবল মেয়েগুলো বে আক্কেলে, চীৎকার করে পাড়া মাথায় করে।
তাদের কাছে তুমি কি আশা কর? তাদের পাকড়াও করে নিয়ে যাবে, আর তারা চুপ করে থাকবে?
রতন সরকার অপ্রস্তুত হওয়ার লোক নয়, জমিদারের নায়েবি করলে মানুষে যমকে ভয় করে না, বলল, তাই তো উচিত হুজুর। খামকা চীৎকার করে লজ্জার কথা প্রচার করে লাভ কি?
স্পোকার বলল, সে কথা মিথ্যা নয়, তাছাড়া লোকের চীৎকারকে ভয় করা চলে, কিন্তু ইতিমধ্যে যে বড়লোক এসে জুটেছে।
বড়লোকের হস্তক্ষেপ শুনে রতন সরকারও উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে, কে আবার এল এর মধ্যে?
মাধব রায়-বলে স্পোকার।
হুজুর, মাধব রায়ের কথা বিশ্বাস করবেন না, লোকটা ঘোর মিথ্যাবাদী।
রতন সরকারের অভিযোগ এমনই সত্যভাষণে পূর্ণ যে, পুলিস সুপারিনটেন্ডেন্টের মুখেও হাসি ফুটল। সে বলল, অবশ্যই আমি তার কথা বিশ্বাস করি নি। কিন্তু মুশকিল কি জান, লোকটা আমার কাছে আসে নি, লাট কাউন্সিলের মেম্বারদের ধরেছে; জানিয়েছে যে, মোতি রায়ের দৌরাত্ম্যে পাড়ার মেয়েদের সম্প্ৰম গেল, পুলিস নিষ্ক্রিয়।
স্পোকারকে উত্তেজিত করবার আশায় রতন সরকার বলল, এ যে ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়া।
শুধু ঘোড়া ডিঙিয়ে নয় সরকার, ঘোড়র আস্তাবল সুদ্ধ ডিঙিয়ে। কিন্তু নিরুপায়। এবারে বন্ধ কর তোমাদের দৌরাত্ম্য, নইলে আমার সমূহ বিপদ।
রতন সরকার দীর্ঘ সেলাম করে বলল, এই কথা? এখনই হুকুম দিয়ে দিচ্ছি।
এই বলে চৌকি ছেড়ে উঠতেই পোকার কাছে গিয়ে মৃদুস্বরে বলল, একবারে সব থামিয়ে দিতে হবে না, কারণ আমি জানি যে, মোতি রায়ের সম্মান আহত হয়েছে, এখন মেয়েটাকে খুঁজে বার করে সকলের সামনে দেখাতে না পারলে তার গৌরব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে না, কিন্তু যা রয় সয়, তা-ই কর, বেশি জানাজানি না হয়।
