চিঠিখানা বুকের মধ্যে চেপে ধরে রেশমী বিছানায় এসে শুয়ে পড়ে হাঁপাতে লাগল, প্রত্যাশার চাপা আনন্দের উদ্দাম ছন্দে তখন হাতুড়ি পিটছিল হৃৎপিণ্ডটা।
চিঠিখানা মুঠোয় নিস্পিষ্ট করে সে অনুভব করছিল জনের কোমল হাতখানাকে— অনেক দিন পরে জনের সান্নিধ্য লাভ করল ঐ ক্ষুদ্র পত্রপুটে। মাধুর্যে, করুণায়, প্রেমে, প্রত্যাশায় তার মনের কানায় কানায় গেল ছাপিয়ে, বয়ে গেল অমর্ত্য সুরধুনীর প্রবাহ। এক একবার প্রচণ্ড আগ্রহ হচ্ছিল চিঠিখানা পড়বার, আবার তখনই সংযত করছিল ঔৎসুক্য। কি হবে পড়ে? জন চিঠি পাঠিয়েছে এই কি যথেষ্ট নয়? তার পর অনেকক্ষণ পরে যখন চিঠিখানা পড়া মনস্থ করলে, বাইরে পদশব্দ উঠল টুশকির। দ্রুত হয়ে চিঠিখানা খোঁপার মধ্যে লুকিয়ে প্রিয়-সমাগম-সঞ্জাত-রক্তাভ মুখে যখন সে বেরিয়ে এল, টুশকি তার দিকে চেয়ে মুগ্ধভাবে বলল, সৌরভী ভাই, আজ তোমাকে বড় সুন্দর দেখাচ্ছে।
রেশমী অস্বীকার করে বললে, আমি কি আগে কুশ্রী ছিলাম?
তা কেন, তবে আজ একটু বিশেষ দেখছি।
হবেও বা।
তখন দুইজনে গৃহকার্যে নিযুক্ত হল, প্রসঙ্গটা ঐখানেই চাপা পড়ে গেল।
৪.১১-১৫ পত্র পাঠ
রেশমীর চিঠি নিয়ে জন সেই যে ঘরের মধ্যে ঢুকেছিল তার পর সন্ধ্যার আগে বের হয় নি। দুপুর বেজে গেল, জনের অন্তর্ধান অফিসের লোকজনের আলোচনার বিষয় হয়ে উঠল, কেউ কেউ উদ্বেগ প্রকাশ শুরু করল। তখন বৃদ্ধ কাদির আলী ভুলে-যাওয়া যৌবনের হাসিতে প শশুগুফ আলোড়িত করে বলল, তোমরা বেবাক বেআকৃষ্ণ।
সে বলল যে, প্রিয়জনের চিঠি পেলে অমন মস্তানা দশা হয়েই থাকে। উদাহরণ স্বরূপ উল্লেখ করল নিজের দৃষ্টান্ত। যৌবনে সে যখন ‘জরু’র চিঠি পেত, সারারাত কাটিয়ে দিত চিঠিখানা বুকে ধরে; না খেত খানা, না যেত নিদ্রা।
গঙ্গারাম নিরক্ষর, তার জরুও নিরক্ষর, তাই এমন ঘটনা তার অভিজ্ঞতার বহির্ভূত। সে ভাবল, বাল্যকালে লেখাপড়া শিখলে না জানি জীবনে আরও কত রস পেত। বড়লোকের জীবনে কত রস ভেবে তার বিস্ময় প্রায় চরমে পৌঁছল। কিন্তু সে বিস্ময় একেবারে চূড়া স্পর্শ করল যখন সন্ধ্যাবেলায় হঠাৎ দরজা খুলে বেরিয়ে এল জন, গঙ্গারাম সময়োচিত হাসি দিয়ে করল অভ্যর্থনা। অমনি জন সগর্জনে বলে উঠল, হাতা কাহে উ? সঙ্গে সঙ্গে ছুঁড়ল লক্ষ্যভ্রষ্ট এক লাথি।
পলাতক গঙ্গারাম গিয়ে জানাল ব্যাপারটা কাদির আলীকে। কাদির দাডিতে হাত বুলিয়ে বলল, বেটা, এমন হয়েই থাকে, সাহেব এখন প্রেমে মস্তানা।
গঙ্গারাম স্থির করল সাহেব মস্তানাই হক আর বাউরাই হক, কাছে না ঘেঁষাই বুদ্ধির কাজ।
জন চিঠিখানা নিয়ে ঘরে ঢুকে একটানে ফেলল খুলে, এক নিমেষে ফেলল পড়ে; সংক্ষিপ্ত, সুতীক্ষ্ণ ভাষণ শাণিত ছুরিকার মত আমূল বিদ্ধ হয়ে গেল বুকে। সে শয্যা গ্রহণ করল-সন্ধ্যার আগে উঠল না।
তার মনে হল পরিচিত সুবিন্যস্ত জগৎ যেন ভূমিকম্পে ওলট-পালট হয়ে গিয়েছে, প্রবেশ ও বহির্গমনের পথ রুদ্ধ, ভূ-ভারে চাপা পড়েও কোনরকমে সে যেন বেঁচে রয়েছে।
তার মনে হল, এই সেই রেশমী, এই তার চিঠি! তবে তো লিজার অনুমান মিথ্যা নয়! লিজা বহুবার তাকে সতর্ক করে দিয়েছে, বলেছে, নেটিভ মেয়ে কখনও আপন হয় না; বলেছে, প্রথম সুযোগেই সে পালাবে, একবার ছাড়া পেলেই স্বজনগণের মধ্যে গিয়ে উপস্থিত হবে।
জন বলেছে, তা কেমন করে সম্ভব? বিয়ে যে হল—সে সম্বন্ধ ছিড়বে কি করে?
লিজা বলেছে, ছোঃ, হিদেনদের আবার নীতিজ্ঞান! দেখ নি ওরা একসঙ্গে দশগও বিয়ে করে!
অস্বীকার করতে পারে নি জন এসব যুক্তি। তখন বলেছে, অন্য হিদেন মেয়ে যেমনই হক রেশমী সে দলের নয়। অনেকদিন আছে ও পাদ্রীদের সঙ্গে, ওর মনটা সংস্কারমুক্ত হয়ে গিয়েছে।
পাগলামি রাখ জন। হিদেনের মন কুকুরের লেজের মত, ছাড়া পেলেই বাঁকা হয়। তোমার রেশমী আর দশজনের মতই।
জনের মনে হল, লিজার অনুমান বর্ণে বর্ণে সত্য। নতুবা জনের বাগদত্তা হয়ে কিভাবে সে ত্যাগ করে জনকে, কিভাবে নির্লজ্জের মত গ্রহণ করে মদনমোহনকে স্বামীরূপে। ইস্ আবার দেখ না, লিখেছে, এখন ঐ মদনমোহনই তার আশ্রয়, শান্তি, স্বামী। তার নীতিজ্ঞান কানে কানে বলে দিল, বাগদত্তার আবার পত্যন্তর হয় কি করে? মদনমোহন তার উপপতি! সে ভাবল, আজ মদনমোহন মরে তো বেশ হয়, রেশমীকে চিতায় পুড়ে মরতে হবে, এবারে আর রক্ষা করবার জন্যে কেরী থাকবে না। এইরকম কত কি অসম্ভব, অসংলগ্ন চিন্তা করতে লাগল সে। উদভ্রান্ত প্রেমিকের মস্তিষ্ক কুয়াশার জগৎ, সেখানে সমস্তই কিম্ভুত, অবাস্তব, অসম্ভব, সমস্তই কার্যকারণের সঙ্গতিশূন্য।
অনেক কয়বার চিঠিখানা ছিঁড়ে ফেলবার জন্যে উদ্যত হয়েও সে হেঁড়ে নি। তার পরে সযত্নে রেখে দিল, ভাবল, থাক একখানা দলিল, আমার মত বিড়ম্বিত ব্যক্তিকে সতর্ক করে দেবার প্রয়োজন লাগবে। তার পরে সে বসে গেল রেশমীর চিঠির উত্তর লিখতে। অনেক কাগজ ছিঁড়ে, অনেক কাটাকুটি করে, মনের অনেক বিস্তারিত বিদ্বেষকে ঘনীভুত আকার দিয়ে, শাণিত ছুরির ফলার নিক্ষিপ্ত আলোকের ভাস্বরতা অর্পণ করে করে অবশেষে এক সময়ে সমাপ্ত হয় পত্র-রচনা।
সে লিখল—
“ডিয়ার লেডি,
লিজার অনুমান মিথ্যা নয়, হিদেনদের নীতিজ্ঞান বলে কিছু নেই। যদি থাকত তাহলে তুমি আজ এমন করে একজনকে উপপতিরূপে বরণ করতে না। ভূতপূর্ব স্বামীর চিতায় তোমার পুড়ে মরাই উচিত ছিল। এবারে উপপতির সঙ্গে পুড়ে মরবার সাহস থেকে যেন বঞ্চিত না হও। আশা করি, এবারে আর তোমার মত ঘৃণ্য জীবকে কেউ বাঁচাবে না। কারণ তুমি একটি বাজারের বেশ্যা, আর তোমার উপপতি একটি আস্ত লম্পট। তোমার মত ডাকিনীর কুহক থেকে শেষ মুহূর্তে যে রক্ষা পেয়েছি, সেজন্য ঈশ্বরকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
