রেশমী বলল, সত্যি দিদি, ছেলেটা কি নেমকহারাম!
শুধু ঐ ছেলেটা নয় বোন, পুরুষ জাতটাই নেমকহারাম। তোমার ভাগ্য ভাল যে, এমন নেমকহারামদের পান্নায় তোমাকে পড়তে হয় নি।
ততক্ষণে তারা বাড়ি এসে পৌঁছেছে। গল্প শেষ হয়ে গেল, বেশ বাজতে লাগল রেশমীর মনে। হঠাৎ মনের অবাধ্যতার কারণ পেল সে খুঁজে-জনও তো কম নেমকহারাম নয়। হবেই বা না কেন, পুরুষমানুষ তো বটে। সাধারণভাবে পুরুষমানুষের সুত্রে তখন একটি মাত্র পুরুষ এসে তার মনের রঙ্গমঞ্চে দাঁড়াল। ধিক্কার, ঘৃণা, ক্রোধ, কৃপা পাঁচমিশেলি ভাব অনুভব করল সে জনের প্রতি। রেশমী যদি মনস্তাত্বিক হত, তবে বুঝত যে, ঐসব প্রতিকূল ভাবের সিধকাঠি দিয়েই সুড়ঙ্গ কাটা হয় মনের দেয়ালে। রেশমীর বদ্ধদ্বার মনের সুড়ঙ্গপথে প্রবেশ করল জন। সে স্থির করে রেখেছিল যে জনের সঙ্গে সম্বন্ধ চুকিয়ে দিয়েছে কিন্তু এখন দেখল, কি আপদ-মনের সর্বত্র জন। অনধিকার তার প্রবেশ সন্দেহ নেই, কিন্তু যে দুর্বল, কেমন করে সে ঘোষণা করবে ঐ সত্যটা আততায়ীর কাছে। নিদ্রাভঙ্গে ভীত যেমন নিদ্রিতবৎ পড়ে থেকে চোরের গতিবিধি লক্ষ্য করে, ভাবে দেখা যাক কত দূর কি করে, ভরসা রাখে শেষ পর্যন্ত সিন্দুকের চাবিটা খুঁজে পাবে না, অসহায়ভাবে রেশমী পর্যবেক্ষণ করতে লাগল জনের পদসঞ্চার।
নেমকহারাম, নেমকহারাম!
মনের নীচের তলার অধিবাসী বলে ওঠে, তার দোষ কি, তুমিই তো সব সম্বন্ধ চুকিয়ে চিঠি লিখে দিয়েছ।
কিন্তু চিঠিখানার জবাব দিতেও তো পারত।
ও চিঠির জবাব পেলে কি খুশি হতে? বৃঢ় জবাব ছাড়া আর কি সম্ভব ও চিঠির?
কেন, এমন কি রূঢ় কথা আমি লিখেছি।
না, এমন আর কি! মরার বাড়া যে গাল নেই, তা-ই দিয়ে মাত্র।
সে-ও না হয় তা-ই দিত।
ঝগড়া করা সকলের স্বভাব নয়।
জন বুঝি কম ঝগড়াটে? বোনের সঙ্গে ঝগড়া করে বাড়ি ছেড়ে যায় নি সে?
কার জন্যে ঝগড়া করেছিল? কার জন্যে বাড়ি ছেড়েছিল? নেমকহারাম কে?
জন, জন, জন!
ও তো রাগের কথা হল।
করব না রাগ? কেন ঢুকেহে আমার ঘরে?
জন হয়তো এটাকে নিজের ঘর মনে করে।
নিজের ঘর! দেখছ না দরজা বন্ধ!
আর দরজা বন্ধ হলেই কি মালিক ফিরে যায়?
তাই বলে সিঁধ কেটে ঢুকবে?
অগত্যা। তা ছাড়া হাতের কাছে সিঁধকাঠি যুগিয়ে দিলে কেন?
সিঁধকাঠি? কি বলছ?
ঐ রাগ, দ্বেষ, ঘৃণা—ঐ তো সুড়ঙ্গ খোডবার অস্ত্র।
বেশ করেছি।
তবে ঘরে ঢুকে জনও বেশ করেছে।
রেশমী স-কৌতূহলে লক্ষ্য করছিল যে তার মনটা দুইখানা হয়ে জন সম্বন্ধে সওয়াল জবাব করছে আর সে নিরপেক্ষ বিচারকের মত নির্বিকারভাবে বসে কৌতুক অনুভব করছে। তার ভারি মজা লাগছিল। মনের সুক্ষ্ম গতিবিধি সম্বন্ধে এই তার প্রথম অভিজ্ঞতা। বাদী-প্রতিবাদীর উকিল কিছুক্ষণের জন্য বিতণ্ডা থামালে নিরপেক্ষ বিচারক একটি ছোট্ট প্রশ্ন করল, আচ্ছা, চিঠির উত্তর পাওয়ার সময় কি সত্যই অতিক্রান্ত হয়েছে? জন। চিঠিখানা পেয়েছে, পড়বে, ভাল-মন্দ যা হক একটা উত্তর লিখবে, তার পর তো পাঠাবে।
তার মনের মধ্যে জনের উকিল বলে উঠল, ঠিক কথা। তাছাড়া চিঠি রেশমীর হাতে এসে পৌঁছবার একটা সময় নির্দিষ্ট আছে, টুশকি যখন ভোরবেলা বাজারে যায়। সেই সময়, এদিক ওদিক হলেই বিপদ। রেশমী তাকে সমর্থন করে বলল, তবে? তবে অযথা কেন জনকে দুষছ?
তখন তার মনটা সবলে জনের অনুকূলে প্রতিক্রিয়াবান হয়ে উঠল, জনকে অন্যায়ভাবে দুষেছে ভেবে অনুতাপ দেখা দিল। জন হঠকারিতা করে অসময়ে চিঠি পাঠিয়ে তাকে বিপন্ন করে নি ভেবে সে কৃতজ্ঞতা অনুভব করল জনের প্রতি। জন সম্বন্ধে প্রতিকূল মনোভাব মুহূর্তে লোপ পেল। আশার পূর্বাগে মনের দিগন্ত দেখতে দেখতে রাঙা হয়ে উঠল।
মানুষের মন চরাচরের সবচেয়ে আশ্চর্য পদার্থ, ভগব-অস্তিত্বের এটাই বোধ হয় সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
রেশমী কল্পনায় দেখল তার চিঠিতে মর্মাহত জন যন্ত্রণায় ছটফট করছে। এই দৃশ্য কেমন যেন তাকে আনন্দিত করে তুলল, শিকারী যেমন আনন্দ পায় স্ব-শরাহত শিকারের যন্ত্রণা দেখে। ঐ যন্ত্রণাই কি প্রমাণ করে না যে জন তাকে কত ভালবাসে। তার পরে সে কল্পনায় দেখল যে, বিনিদ্র জন সারারাত ধরে লিখল সুদীর্ঘ চিঠি; সে চিঠি অনুনয়ে, অনুরাগে, সাধ্যসাধনায়, প্রতিশ্রুতিতে পূর্ণ। তার পরে দেখল চিঠিখানা গঙ্গারামের হাতে দিয়ে জন বলে দিল, জলদি গিয়ে দিয়ে এস, বিবিজি পুরস্কার দেবে।
রেশমী ভাবল, গঙ্গারামকে কি পুরস্কার দেবে, কিছুই তো নেই তার।
এই ভাবে রাত কেটে গেল। দুঃখের রাতও কাটে, সুখের রাতও কাটে।
টুশকি বাজারে চলে গেলে দরজায় দাঁড়িয়ে সে অপেক্ষা করতে লাগল, গঙ্গারামের আগমন সম্বন্ধে কোন সংশয় ছিল না তার মান।
যথাসময়ে অপ্রত্যাশিতের আবির্ভাব সংসারে বড় ঘটে না, কিন্তু এক্ষেত্রে ঘটল, দেখা গেল পথের মোড়ে গঙ্গারামকে।
সারারাত কেটে গেল, এইটুকু সময় আর কাটে না, কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে গঙ্গারামকে সে বলল, চিঠি কই?
চিঠি বের করে দিল গঙ্গারাম। চিঠি দিয়েই ফিরছিল, রেশমী বলল, দাঁড়া।
এই বলে ভিতর থেকে কয়েকটা মোয়া নিয়ে এসে তার হাতে দিয়ে বলল, পথে খেতে খেতে যাস বাবা, আর কাল সকালে একবার নিশ্চয় আসিস।
গঙ্গারাম তো অবাক। কাদির আলীর কাছে শুনেছিল যে পুরস্কার চাওয়া চলবে, ভাল খবর নেই চিঠিতে। এখন এই অপ্রত্যাশিত আনুকূল্যের অর্থ বুঝতে না পেরে সে ভাবল, কি জানি বাবা, বড়লোকের কথাই আলাদা, তারা যে কিসে চটে আর কিসে খুশি হয় মা গঙ্গাই জানেন। সে দ্রুত অদৃশ্য হল।
