ঠিক ধরেছ, ঠিক যেন কোমল আঙুলে হীরের আঙটি।
জনের বিস্ময়ের অবধি থাকে না, রেশমী এতও জানে!
কাল সকালে গঙ্গারাম আনবে রেশমীর চিঠি। অপেক্ষায় দীর্ঘায়িত রাতটা আর কাটতে চায় না জনের। বারে বারে ঘড়ি দেখে, বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয় না ঘড়ির উপরে, হাজার হক মানুষের তৈরি তো, নির্ভুল নয়; জানালার ফাঁকে তাকিয়ে দেখে আকাশের তারাগুলো, ওগুলোর ভুল হওয়ার কথা নয়। কোথাও সমর্থন পায় না তার মন। মানুষ থেকে শুরু করে গ্রহনক্ষত্র সমস্ত যেন ষড়যন্ত্র করেছে তার বিরুদ্ধে। অবশেষে বিরক্ত হয়ে একখানা বই তুলে নেয়। দু পৃষ্ঠা পড়বার পরে কাহিনীর দেয়ালে ফাটল ধরে, ফাটল ক্রমে চওড়া হয়ে দেখা দেয় করুণা-কৌতুকে সমুজ্জ্বল একখানি মুখ।
কি দেখছ রেশমী?
দেখছি মানুষ কত বোকা হতে পারে।
সারাদিন আমাকে বোকা বলে টীজ কর কেন? এমন কি নির্বোধ আমি সত্যি করে বল তো?
ও বলে বোঝানো যায় না।
তাহলে বুঝিও না। আর বলে যদি খুশি হও তবে না হয় বল, আমি আর বাধা দেব না।
যাক এটা তবু বুদ্ধিমানের মত কথা, বলে রেশমী।
তবে তো ভুল হয়ে গেল দেখছি, আবার বোকার মত ব্যবহার করা যাক
এই বলে সে রেশমীর হাত ধরে টান দেয়, রেশমী পিছিয়ে যেতে চায়, কিছুক্ষণ দুজনের খুব টানাটানি চলে। অবশেষে এক সময়ে রেশমী আত্মসমর্পণ করে। সে ইচ্ছা কিছু কম হলে অনেকক্ষণ আগেই ধরা দিত। বাধা দিয়ে জনের মনকে ফেনায়িত করতে চায় সে।
আঃ কি কর, কি কর, হাড়।
রেশমী যখন ছাড়া পায়, ঝড়ে দোল-খাওয়া বসন্তের পুষ্পবনের মত তার চেহারা। গাছতলায় বিন্যস্ত রঙ্গন, পলাশ, রক্তকরবী; বিতান-পরিত্যক্ত মাধবীলতা ভূলুষ্ঠিত; পল্লবনিলীন পুষ্পস্তবক দস্যু হাওয়ার করক্ষেপে মর্দিত, পাণ্ডুকপেলি চমুকদল ছিন্নভিন্ন, বনানীর পত্রলেখা অবলুপ্ত, বসনাঞ্চল বিস্ত আর তার বক্ষের শিখরিণী হল তখন শার্দুলবিক্ৰীড়িতের উৎকট তালে সংস্পন্দিত।
জন ভাবে রেশমী ফিরে এলে কলকাতাতেই হবে তার দীক্ষা, আর লুকিয়ে-চুরিয়ে শ্রীরামপুরে বা অন্যত্র নয়। আর তার পরে বিয়েটা হবে সেন্ট জনের গির্জায়, কলকাতা শহরের বুকের উপরে, শ্বেতাঙ্গ সমাজ ও দেশী সমাজের চোখের সামনে। সে ভাবে, দেখুক সকলে। দেখি কার সাধ্য বাধা দেয়। আর বিয়ের পরেই দুজনে চলে যাবে রিষড়ায়, আগেই ভাড়া করে রাখবে ওয়ারেন হেস্টিংসের বাগানবাড়িটা, সেখানে গিয়ে কাটাবে হনিমুনের পক্ষকাল।
জেগে জেগে স্বপ্ন সৃষ্টি করে জন। দিবা আর রাত্রির মত স্বপ্ন আর বাস্তবে মানুষের জীবন যে নিত্য ভাগাভাগি।
অবশেষে প্রভাত হয়।
গঙ্গারামের অপেক্ষায় হলঘরে অধীরভাবে পায়চারি করে জন। এমন সময়ে বেলা দশটা নাগাদ গঙ্গারাম ঘরে ঢুকে সেলাম করে একগাল হাসি হেসে দাঁড়ায়।
বিবিজি চিঠি দিয়া?
জী হুজুর।
গঙ্গারাম এগিয়ে দেয় চিঠি।
চিঠিখানা লুফে নিয়ে একটা মোহর ছুঁড়ে দেয় জন গঙ্গারামের দিকে, তার পরে। দ্রুতপদে ঘরে ঢুকে সশব্দে দরজা বন্ধ করে দেয়।
.
৪.১০ শতু সরাব (২)
মনের গতিবিধি মানুষের সম্পূর্ণ পরিজ্ঞাত হলে সংসার বুঝি এমন দুঃখের উপত্যকা হত না। বিধাতা-পুরুষ যখন বিশ্ব-সৃষ্টি করে আত্মপ্রসাদ অনুভব করছেন, তখন কোন্ শয়তান সকলের অগোচরে তার মধ্যে এক ফোঁটা মন ফেলে দিয়ে অনর্থক জটিলতার সৃষ্টি করে তুলল। সুখের শিখর দেখতে দেখতে দুঃখের উপত্যকায় হল পরিণত।
জনকে চিঠি লিখে দেওয়ার পরে রেশমী খুব একপ্রকার আত্মপ্রসাদ লাভ করেছিল, ভেবেছিল, যাক সব চুকিয়ে দিলাম; ভেবেছিল, এখন অনন্যমনা হয়ে আত্মসমর্পণ করলাম মদনমোহনের পায়ে।
কিন্তু সেদিন সন্ধ্যায় মদনমোহনের বাড়িতে গিয়ে মনে কেমন খটকা অনুভব করল, দেখল অন্যদিনের মত মন লাগছে না, কেমন যেন ক্ষণে ক্ষণে অবাধ্য মনটা খাঁচার ফাঁক দিয়ে উড়ে উড়ে নায়। তখনও সে বুঝতে পারে নি মনের অবাধ্যতার কারণ। তার চঞ্চলতা লক্ষ্য করে সেই বুড়িটা পিছন থেকে বলল, আজ বুঝি মন লাগছে না মা?
রেশমী স্বীকার করল, বলল, না মা, মন লাগছে না।
তবে বুঝি মনে এখনও ভাগাভাগি আছে!
রেশমী চমকে উঠল, তবে কি সত্যি মনে এখনও ভাগাভাগি আছে? কিন্তু কে বসাল ভাগ? তখন যদি কেউ বলত যে, আর কেউ নয়, জন ভাগ বসিয়েছে তার মনে, তাহলে কিছুতে বিশ্বাস করত না সে।
আরতি শেষ হয়ে গেলে টুশকি বলে, চল সৌরভী, এবারে ফিরি।
পথে আসতে আসতে টুশকি বলল, পুরুষমানুষ বড় নেমকহারাম।
হঠাৎ একথা মনে হল কেন?
টুশকি বলল, আজ বাজারে গিয়ে ক্ষান্ত দিদির কাছে একটা গল্প শুনলাম, সারাদিন সেই কথাটা মনে পাক দিয়ে উঠছে।
কি গল্প বল না দিদি?
ক্ষান্তদিদি বাপের বাড়ি থেকে সবে কালকে ফিরেছে, তার কাছে শুনলাম। গল্পটা শুনে বুক ফেটে যাচ্ছে।
খুলে বল দিদি।
গোবিন্দ জোয়াদ্দার গাঁয়ের মধ্যে বর্ধিষ্ণু গৃহস্থ। অনেকদিন আগে একটা ভবঘুরে হেলে তার বাড়িতে এসে আশ্রয় নেয়। জোয়াদ্দার তাকে নিজের ছেলের মত মানুষ করে। ছেলেটি বড় হলে জোয়াদ্দার ভাবল যে, তার মেয়ের সঙ্গে ছেলেটার বিয়ে দেবো-পাটি ঘর, কোন বাধা ছিল না। মেয়েটাও মনে মনে স্থির করেছিল, বাপ-মায়ের যখন ইচ্ছা, ওকেই বিয়ে করবে। সব যখন প্রায় ঠিকঠাক, ছেলেটা পালিয়ে গিয়ে পাশের গায়ের এক মেয়েকে বিয়ে করল। জোয়াদ্দারের মেয়ে ঘেন্নায় দুঃখে গঙ্গায় ডুবে মরল।
