কি কাদির আলী, খবর কি?
প্রশ্নটা নিতান্ত গতানুগতিকভাবেই করল, তার আশ্বাস জন ভুলেই গিয়েছিল।
হুজুর, রেশমী বিবির সন্ধান মিলেছে।
কথাটা শুনেও অর্থবোধ হল না জনের, শুধাল, কি মিলেছে?
হুজুর, রেশমী বিবিজির পাত্তা মিলেছে।
জন মূঢ়ের মত শব্দগুলোর আবৃত্তি করল, রেশমী বিবিজির পাত্তা মিলেছে!
জী হুজুর।
দু-চার মুহূর্ত গেল জনের শব্দগুলোর অর্থ গ্রহণ করতে, তার পরেই ব্যাকুলভাবে চীৎকার করে উঠল, কোথায় সে? এনেছ তাকে? শীগগির বল কোথায়?
তখন কাদির আলী বিস্তারিতভাবে অনুসন্ধানপর্বের বর্ণনা শুরু করল। সে যে বৃথা সান্ত্বনা দেয় নি, বিবির সন্ধানে কলিঙ্গাবাজার, ডিঙিভাঙা, ডিহি ভবানীপুর, পটলডাঙা, বাগবাজার সব জায়গায় লোক পাঠিয়েছিল তা বলল; বলল, অনেক তকলিফ করেছে তার লোকজন; বলল, আজ কদিন তাদের আহার নিদ্রা বন্ধ।
জন অকালে তার বর্ণনা থামিয়ে দিয়ে বলল, ও সব কথা থাক, এখন বল কোথায় আছে বিবি?
কাদির আলী আবার বর্ণনা শুরু করল। গঙ্গারাম দেখল যে তার কৃতিত্ব মিঞা গ্রাস করবার চেষ্টায় আছে, হয়তো বা বকশিশটাও গ্রাস করবে, তাই সে বলে উঠল, হুজুর, বিবিজি বাগবাজারে আছে।
কে দেখেছে?
কাদির আলী মুখ খুলতেই গঙ্গারাম বলে উঠল, হুজুর, আমি দেখেছি।
তাকে নিয়ে এলে না কেন?
এ প্রশ্নের হঠাৎ কি উত্তর দেবে ভেবে পায় না গঙ্গারাম।
কাদির আলী তার মৃঢ়তার সূত্র কুড়িয়ে নিয়ে আরম্ভ করে, হুজুর, অমনি কি বিবিজানকে আনা যায়? সে এখন ডাকুলোকের কাছে নজরবন্দী হয়ে আছে।
জনের কাছে সে শুনেছিল যে ডাকুলোক রেশমীকে জোর করে কেড়ে নিয়ে এসেছে।
ডাকুলোকের কাছে নজরবন্দী!
জনের রক্ত গরম হয়ে ওঠে। টেবিলের দেরাজা থেকে পিস্তলটা বের করে নিয়ে সে বলে, এখনই যাচ্ছি আমি।
কাদির আলী বলে, তাতে দাঙ্গাহাঙ্গামা হবে, ডাকুলোকেও গুলি ছুঁড়বে—
জন গর্জে ওঠে, ননসেন্স।
কাদির বলে, বিবির গায়েও গুলির লাগতে পারে।
জন টেবিলের উপরে পিস্তলটা রেখে দিয়ে বলে, তবে উপায়?
উদ্যতবচন গঙ্গারামকে থামিয়ে দিয়ে কাদির আলী বলে, একটু কৌশল করতে হবে।
কি কৌশল?
সেটা বিবি কাল চিঠি লিখে জানাবে।
চিঠি লিখবে এইটুকু জানিয়েছিল গঙ্গারাম, বাকিটুকু কাদির আলীর মস্তিষ্কপ্রসূত। দোষ দেওয়া যায় না তাকে। বিবি যখন চিঠি লিখবে বলেছে তখন তাতে পলায়নের ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কি থাকবে, ভেবেছিল কাদির আলী।
জন সরাসরি গঙ্গারামকে শুধায়, বিবি আস্থা হ্যায়?
গঙ্গারাম বলে, তবিয়ত আচ্ছা হয়, লেকিন—
কি বলবে ভেবে পায় না, কাদির আলী সমস্যা পূরণ করে বলে, লেকিন দিল তো বহুত খারাপ হ্যায়।
উজ্জ্বল হয়ে ওঠে জনের মুখ।
জন গঙ্গারামকে বলে, কাল খুব ভোরে গিয়ে বিবির চিঠি নিয়ে আসবে, বকশিশ মিলবে।
বকশিশটা মধ্যপথে লুফে নিয়ে কাদির আলী বলে, হুজুরকে সেজন্য ভাবতে হবে, আমার হাতে দিলে সব ঠিক ঠিক দিয়ে দেব।
গঙ্গারাম বিদায় নিতে নিতে ভাবে, কি আপদ! সংসারে সুবিচার বলে কিছু নেই। কাজ করে একজন, বকশিশ পায় অপরে।
তারা বিদায় হয়ে গেলে দরজা বন্ধ করে দেয় জন, তার পরে নতজানু হয়ে প্রার্থনা শুরু করে। কিন্তু কি বলে প্রার্থনা করবে সে! জন হচ্ছে মেরিডিথের দলের লোক; গির্জা, ভগবান, প্রার্থনা, ধর্ম এসব তাদের কাছে দূরত কিংবদন্তী। সে হঠাৎ আবিষ্কার করে যে প্রার্থনার রীতিপ্রকৃতি তার জ্ঞানের অতীত। বাইবেলখানা খুলে মুটের মত পাতা ওলটাতে থাকে, হঠাৎ খুলে যায় পরবাসবন্দিনী রুথের কাহিনী।
মূঢ়ের মত আবৃত্তি করে যায় কাহিনীটি, শব্দাবলী মুখে মুখে এগিয়ে যায়, অর্থ খুঁড়িয়ে চলে পিছনে পিছনে, মুখে মনে মিল ভেঙে গিয়েছে জনের। বিদেশে বিয়ে হয়েছিল সুন্দরী রুথের। অল্পদিন পরে স্বামী গেল মারা। শাশুড়ী বলল, বাছা, আমার সাধ্য নেই তোমাকে ভরণ-পোষণ করবার, যাও তুমি স্বদেশে তোমার স্বজনগণের মধ্যে। রুথ বলে, সেখানে কোথায় আমার স্থান? তখন দুজনে কাজ করে অপরের শস্যক্ষেত্রে। ক্ষেত মালিকের ছেলের ইচ্ছা রুথকে করে বিয়ে।
কোন্ দুয়ে নিয়মে পৌরাণিক কাহিনী মিলে যায় আধুনিক বাস্তবের সঙ্গে। রুথ হয়ে দাঁড়ায় রেশমী; জন মুখে বলে-বুথ, মনে ভাবে-রেশমী। হঠাৎ কখন মন ছাপিয়ে গিয়ে ওষ্ঠাধর গুঞ্জরণ করে ওঠে-রেশমী। শব্দটি কানে প্রবেশ করবামাত্র সজাগ হয়ে ওঠে জন। বাইবেল রেখে দিয়ে উঠে দাঁড়ায় সে, ছায়া পড়ে আয়নায়।
পোশাকের অবস্থা দেখে শিউরে ওঠে—এতদিন এই বেশে শহরে ঘোরাঘুরি করেছে সে! কোট প্যান্টালুন শার্ট সমস্ত মলিন, সমস্ত দীন, সমস্ত কেমন লক্ষ্মীছাড়া! পোশাক বদলাতে চলে যায় তখনই।
কিছুক্ষণ পরে যখন পোশাক বদলে আয়নার সম্মুখে এসে দাঁড়ায়, মুখে তার হাসি। তাকে দেখলে রেশমীর মুখে যে হাসি ফুটত এ তারই প্রতিচ্ছবি। মনে পড়ে তার রেশমীর কথা।
রেশমী বলত, জন, তোমার হাসিটি বড় মিষ্টি।
তোমার চেয়েও? শুধাত জন।
নিশ্চয়, মেয়েদের চেয়ে পুরুষের হাসি অনেক বেশি মিষ্টি।
এ যে দেখি উল্টো কথা! মোটেই উল্টো নয়, বলে রেশমী।
সে বলে যায়, মেয়েরা স্বভাবতই মিষ্টি, হাসি আর বেশি মিষ্টি হবে কি করে? স্বভাব-কঠিন পুরুষের মুখে হাসি অপ্রত্যাশিত, তাই মিষ্টি।
আর স্বভাবকোমল মেয়েদের মুখে রাগটি বুঝি বেশি মিষ্টি? শুধায় জন।
