.
৪.০৯ শক্ত সরাব
কাদির আলীর প্রতিশ্রুতিকে জন গতানুগতিক প্রবোধবাক্য মাত্র মনে করেছিল তাই তার উপরে বিশেষ আস্থা স্থাপন করে নি। সত্য বলতে কি, কথাটা ভুলেই গিয়েছিল সে। এ কয়দিন সে অফিসেই রাত্রিযাপন করেছে, দিনমান তো বটেই। লিজা তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে দু-তিন দিন এসেছে, ক্ষমা প্রার্থনা করেছে, বাড়ি ফিরে যেতে অনুরোধ করেছে, কিন্তু জন সে কথায় কর্ণপাত করে নি।
লিজা বলেছে, জন, তুমি আমার কথা ভুল বুঝেছ।
জন বলেছে, লিজা, আমার ভাষাজ্ঞান মোটামুটি রকম সাধারণের মত, অতএব ভুল বোঝবার সম্ভাবনা কোথায়?
লিজা বলেছে, ভাষাজ্ঞানের অভাবে নয়, তোমার মনটা বিকল্প ছিল বলে ভুল বুঝেই।
মন বিকল থাকবার কথায় তার মনটা অধিকতর বিকল হয়ে গিয়েছে, বলেছে, মন বিকল কেন হতে যাবে, আর কি করেই বা তা বুঝতে তুমি?
লিজা বুঝেছে এ পথে তর্ক চললে আবার তা কলহে পরিণত হবে। তাই সে নিজের ত্রুটি স্বীকার করে বলেছে, স্বীকার করছি আমি ভুলে বুঝছিলাম, এখন বাড়ি ফিরে চল, বাড়ি তোমার।
বাড়ি আমার!
বিক্ষুব্ধ হয়ে জন বলে ওঠে, যে বাড়িতে আমি অপম্মনিত হই সে বাড়ি আমার!
লিজা বলে, ধর তুমি যদি অপমানিত হয়েই থাক, বাড়ির কি দোষ?
কি মুশকিল, বাড়ির দোষ দিচ্ছে কে? বাড়ি কি কথা বলে?
আমার যদি দোষ হয়েই থাকে, আমি তো বারংবার ক্ষমাপ্রার্থনা করেছি।
জন তার ক্ষমাপ্রার্থনার উপর জোর না দিয়ে বলে ওঠে, যদি তুমি দ র থাক।
নিশ্বাসের সবটা জোর গিয়ে পড়ে ‘যদি’ শব্দটার উপরে। তার পরে সে একটা সিগারেট ধরায়। জ্বলন্ত সিগারেট অনেক সমস্যাকে চাপা দিতে পারে।
সেদিন ঐ পর্যন্ত।
পরে আরও দুইদিন ভাইবোনে এইভাবের কথাবার্তা হয়েছে কিছু জনের মন টলে নি।
জনের মন সত্যই বিকল হয়ে গিয়েছিল, নইলে সে এমন কঠোর প্রকৃতির নয়। জন অব্যবস্থিতচিত্ত যুবক। ও গুণটার প্রকৃতি এই যে যখন কঠোর হয় অস্বাভাবিক ভাবেই
নিরুপায় লিজা মেরিডিথের কাছে গিয়ে পরামর্শ চেয়েছে। মেরিডিথ সব শুনে বলেছে, থাকতে দাও না, দু-চার দিন থাকুক, সে তো আর জলে পড়ে নি।
তাই বলে বাড়ি ছেড়ে থাকবে?
ক্ষতি কি, অফিসে আরামের সব ব্যবস্থাই তো আছে।
তা অবশ্য আছে। কিন্তু বাড়িছাড়া হয়ে থাকলে লোকে আমাকে বলবে কি?
জনকে লোকে যা বলছে তার চেয়ে খারাপ বলবে না।
লিজা শুধায়, লোকে জনকে নিয়ে বলাবালি শুরু করেছে?
করবে না? এমন একটা সুযোগ পেয়েছে!
কি বলছে বল, এ কদিন আমি কোথাও যেতে পারি নি।
মেরিডিথ বলে, আর গেলেও কি তোমার সম্মুখে কিছু বলত!
তোমার সম্মুখে তো বলেছে। এখন বল আমাকে।
লোকে বলেছে, মেরিডিথ আর লিজা মিলে চক্রান্ত করে জনকে বাড়ি থেকে বিদায় করে দিয়েছে।
চমকে ওঠে লিজা। তোমার সঙ্গে চক্রান্ত করে? কিন্তু তোমার সঙ্গে চক্রান্ত করতে যাব কেন?
আমি নাকি তোমাকে বিয়ে করতে উদ্যত হয়েছি, এখন জনকে তাড়াতে পারলেই সম্পত্তিটা দুজনে মিলে ভোগ করতে পারব।
লিজা রাগের মাথায় বলে, যারা এমন বলে তারা নরকস্থ হক।
বিয়ের কথাটা সুদ্ধ?
লিজা বলে, তুমি তাদের প্রশ্রয় দিয়েই।
বিয়ের কথায় অবশ্যই প্রশ্রয় দিই নি।
তবে সম্পত্তি ভোগ করবার কথায় দিয়েছ।
বিয়ে না হলে সম্পত্তি ভোগ করবার কথাই ওঠে না।
মেরিডিথ, এখন লঘু পরিহাস রাখ।
পরিহাস কোনটা?
সবটাই।
বিয়ের কথাটা সুদ্ধ? ও মাই গড!
হেসে ফেলে লিজা বলে, তবু ভাল যে, তোমার মুখে গড় শব্দটা বের হল!
জান তো লিজা, প্রয়োজনকালে শয়তানও শাস্ত্র আওড়ায়।
তুমি কি শয়তান?
সে যোগ্যতা কই! তবে তার চেলা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা রাখি বটে!
বিস্মিত লিজা বলে ওঠে, কি বলছ মেরিডিথ?
মেরিডিথ বলে, শয়নানের চেলারা তোমার ধর্মধজীদের চেয়ে অনেক ভাল।
কেন?
সবাই জানে তারা মিথ্যা কথা বলে। কিন্তু ধর্মধ্বজীদের মত সময়ে সত্য সময়ে মিথ্যা কথা বলে লোককে বিভ্রান্ত করে না।
যে যা বলে বলুক, এখন জনকে নিয়ে কি করি বল?
কিছুই কর না, সময়বিশেষে সেইটেই শ্রেষ্ঠ পন্থা।
সাময়িক ভাবে মেরিডিথের পরামর্শ লিজা মেনে নিয়েছিল, কিন্তু আবার দিন কয়েক পরেই জনের কাছে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিল।
তাতেও কোন ফলোদয় হয় নি।
জন রেশমীকে খুঁজে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছিল। তার ধারণা হয়েছিল যে রেশমী হয় মারা গিয়েছে নয় এমন স্থানে যেতে বাধ্য হয়েছে যেখান থেকে ফিরে আসা সম্ভব নয়। জন বুঝল যে, সে এখন কলকাতার শ্বেতাঙ্গ সমাজের উপহাসের পাত্র; বুঝল যে, এমন কৃপার পাত্র হয়ে তার কলকাতায় থাকা সম্ভব নয়। কি করা যায়, ভাবতে ভাবতে তার চোখে পরিত্রাণের একটা উপায় পড়ল। আর্থার ওয়েলেসলির হস্তক্ষেপে মহীশূর যুদ্ধ শেষ হয়ে গিয়েছিল বটে কিন্তু পেশবার সঙ্গে শীঘ্রই যুদ্ধ বেধে উঠবে এমন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। যুদ্ধ সত্যই বেধে উঠলে ননকমিশন্ড অফিসার হিসাবে যোগদান করা যায় কি না সেই চেষ্টায় সে নিযুক্ত হল। তার মনে হল যুদ্ধ উপলক্ষে কিছুদিন অন্যত্র ঘুরে এলে গ্লানি দুর হতে পারে। আর যুদ্ধে যদি মৃত্যু হয় তবে তো সব আপদ চুকে যায়। তখন তার মনে জীবনের চেয়ে মৃত্যু বাঞ্ছনীয়।
সেদিন সরকারী অফিস থেকে সবে তদ্বির করে সে ফিরেছে, তার প্রার্থনা পূরণ হওয়া অসম্ভব নয় আশ্বাস পাওয়ায় তার মন অনেকটা সুস্থ, এমন সময়ে গঙ্গারামকে নিয়ে কাদির আলী এসে সেলাম করে দাঁড়াল।
