জন একদিন বলেছিল, রেশমী, তুমি আমার জন্যে সব ত্যাগ করতে চললে?
রেশমী বলেছিল, কি আছে আমার যে ত্যাগ করছি?
পৈতৃক ধর্ম।
আমার ধর্ম তুমি।
আমি! বিস্ময়ে বলে জন।
প্রত্যেক লোকে নূতন করে নিজের ধর্মকে লাভ করে, আমি লাভ করেছি তোমাকে।
কিন্তু পৈতৃক ধর্ম বলে কিছুই নেই?
রেশমী বলে, পৈতৃক ধর্মের চেয়ে স্বধর্ম বড়।
এত কথা রেশমীর জানবার নয়, কিন্তু মনের মধ্যে প্রেমের গীতা অবারিত হয়ে গেলে নিরক্ষরেও প্রজ্ঞা লাভ করে।
রেশমী বলে, ধর্মের চেয়ে প্রেম বড়।
বলে, প্রেমের জন্যই ধর্ম। আমি যদি এক লাফে ধর্মকে ডিঙিয়ে প্রেমকে পেয়ে থাকি, সে তো মস্ত লাভ। তার কথায় বিস্মিত জন বলে, রেশমী, তুমি এমন সব গভীর তত্ব জানলে কি করে? তোমাদের দেশের লোকের কাছে দুরূহ দার্শনিক তত্ত্ব অত্যন্ত সহজ।
রেশমী বলে, তা নয় জন, হৃদয়ে প্রেম প্রবেশ করলে আপনি সব সহজ হয়ে যায়। যার ও অভিজ্ঞতা ঘটে না, তারই জন্যে প্রয়োজন দর্শনের। চক্ষুষ্মান আপনি দেখতে পায়, অন্ধকে দেখিয়ে দিতে হয়।
এসব কথার উত্তর জনের মাথায় আসে না, সে চুপ করে থাকে।
তখন রেশমী বলে, তুমি আমার জন্যে যা ত্যাগ করতে উদ্যত—
জন বাধা দিয়ে বলে, আমি কি ত্যাগ করলাম?
আমাকে বিয়ে করলে আত্মীয়স্বজন তোমাকে ত্যাগ করবে, হয়তো সমাজেও তোমার স্থান হবে না।
কিন্তু তার বদলে আমি কি পাব ভেবে দেখেছ?
কি এমন পাবে?
জন মুখটা আগিয়ে নিয়ে যায়। রেশমী একেবারে অনুমান করে নি তা নয়, কৌতুকবিলাসে পিছিয়ে যায় সে।
সেদিনকার সেই ব্যর্থ চুম্বন নলের হংসদূতের মত দুই শুভ্র তপ্ত কোমল পক্ষপুটে আচ্ছন্ন করে, শম্প-মৃদু গ্রীবাটি রাখে রেশমীর গ্রীবায়। রেশমীর সমস্ত দেহ রী রী ঝিম ঝিম করতে থাকে, বেদনাময় আনন্দের নীহারিকায় সে আচ্ছন্ন হয়ে যায়। ব্যর্থ চুম্বন দুর্ভাগ্যের মত নিদারুণ।
সে সঙ্কল্প করে একটু সময় পেলেই জনকে চিঠি লিখে রাখবে। মদনমোহনের ছবি আঁকবার জন্য টুশকিকে বলে সে কাগজ কালি আনিয়ে নিয়েছিল।
অনেক রাতে ভগ্ননিদ্রা রেশমী শুনতে পায় নারীকণ্ঠের সেই পুরাতন আর্তনি; ভাবে, আঃ এর কি-আর শেষ হবে না! নারীকণ্ঠ মিলিয়ে যাওয়ার পরে প্রতিবেশীদের বাড়ি থেকে ওঠে চাপা গুঞ্জন—কোন পোড়ারমুখী এল পাড়ায়, সব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিল। ‘দেখা পেলে চুলের মুঠি ধরে নিয়ে হাজির করে দিই মোতি রায়ের বাগানবাড়িতে, পাড়ায় শান্তি ফিরে আসে!’ ইত্যাদি।
হঠাৎ রেশমীর মনে হল, ঘরে ঘরে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে এখন কি তার জনের কাছে ফিরে যাওয়ার অধিকার আছে? তখনই তার আবার মনে হয়—এ দুস্কৃতির দায়িত্ব মোতি রায়ের—সে কেন এ দায় বহন করে নিজের সুখ-সৌভাগ্য বিসর্জন দিতে যাবে? জীবনে সুখসৌভাগ্য কত বিরল, আজ যদি তা জনের সঙ্গে হাত বাড়িয়ে দিয়ে থাকে, তবে তা প্রত্যাখ্যান করা কি উচিত হবে? আর মোতি রায়ের এ রকম ব্যবহার তো নূতন নয়, আগেও হয়েছে, পরেও হবে—তার কি দোষ? রেশমী সঞ্চয় করে, না, আর বিলম্ব নয়, কাল সকালে গঙ্গারাম এলে জনকে চিঠি লিখে জানিয়ে দেবে তাকে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে। তখনই ঐ নারীকণ্ঠের স্মৃতি মনে পড়ে। সে কেমন দোমনা হয়ে যায়। অবশেষে পড়ে ঘুমিয়ে।
ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখে রেশমী। সে আর জন পাশাপাশি শয্যায় শুয়ে আছে, সুখসুপ্তিপ্রফুল্ল জনের মুখ। সে মাথা উঁচু করে জনের মুখ চুম্বন করতে যাবে এমন সময় দেখে যে মশারিতে আগুন লেগে গিয়েছে। মুহূর্তকাল স্তম্ভিত থেকে জনকে ধাক্কা দেয়, জন, ওঠ ওঠ, আগুন! জন ওঠে না, নড়ে না। সে তড়াক করে শয্যা পরিত্যাগ করে নামে, জনের হাত ধরে টানাটানি করে, কিন্তু জন নিশ্চল। তার সম্মুখে শয্যাসু জন পুড়ে ছাই হয়ে যায়। কে লাগাল আগুন? ঘরে তো দীপ ছিল না। বাইরে থেকে তাবে কেউ এল কি? দরজা খোলা কেন? হঠাৎ দরজায় চোখ পড়ে, সেখানে কে একজন যেন দাঁড়িয়ে। এগিয়ে গিয়ে দেখে যে-মদনমোহন।
আগুন লাগল কেন?
তুমি কত ঘরে আগুন লাগিয়েছ!
শোন শোন–
আর কোন কথা না বলে রহস্যময় হাসি হেসে অন্তর্হিত হয়ে যায় মদনমোহন।
ঘুম ভেঙে যায় রেশমীর। এ কি দুঃস্বপ্ন! তখনই মনে হয়, এ কি স্বপ্ন না স্বপ্নময় ইঙ্গিত? শয্যায় উঠে বসে রেশমী। মদনমোহনের উপরে কেমন একটা বিদ্বেষ অনুভব করে সে। কিন্তু যে দেবতা অদৃশ্য, অর্থাৎ মনের মধ্যে, তার প্রতি বিদ্বেষ ফিরে এসে ঘা দেয় অন্তরে। নিজের চোখে নিজেকে ঘৃণিত বলে মনে হয়। কিন্তু কেন, কি তার দোষ? চিন্তার সূত্র তাকে বলে দেয় জনের কাছে ফিরে যাওয়া বোধ করি মদনমোহনের অভিপ্রেত নয়। জনকে চিঠি লিখে সম্মতি জানাবার সঙ্কল্প তার শিথিল হয়ে আসে।
সকালবেলায় টুশকি বাজারে বেরিয়ে গেলে জনকে চিঠি লিখতে বসে। রেশমীর সংক্ষিপ্ত চিঠি, শেষ করতে সময় লাগল না। সে লিখল–
“জন,
তুমি আমাকে ভুলে যেয়ো। এতদিনে আমি মদনমোহনকে পেয়েছি। এখন সে ই আমার সুখ, শান্তি, স্বামী। অন্য কোন লোকের সঙ্গে আর কোন সম্বন্ধ সম্ভব নয়। তুমি বিয়ে করে সুখী হও এই প্রার্থনা করব। অনেক অনেক ধন্যবাদ। রেশমী।”
চিঠি শেষ হওয়ামাত্র গঙ্গারাম এসে উপস্থিত। পাছে শেষ মুহূর্তে নূতন সঙ্কল্প বদলে যায়, তাই রেশমী তখনই চিঠিখানা তার হাতে দিয়ে তাকে বিদায় করে দিল। জন সাহেবের বকশিশ হস্তগত হয়েছে ভেবে একগাল হাসি হেসে গঙ্গারাম ছুটল অফিসের দিকে। আর রেশমী ঘরে প্রবেশ করে গলায় আঁচল দিয়ে প্রণাম করতে গিয়ে কান্নার ভারে ভেঙে লুটিয়ে পড়ল মেঝের উপর।
