কিশোরী বধু গুরুজনদের প্রণাম করে, খই আর কড়িবৃষ্টির মধ্যে অবিচলিত পদে অগ্রসর হয়ে চিতায় উঠল। নবোদ্যমে বেজে উঠল শখ, কাঁসর, ঢাক। চিতায় অগ্নি পৃষ্ট হল। একবার আগুনের হকার মধ্যে দেখা গেল তার ঈষৎ আনত মুখ। সেদিকে আর তাকাবার সাহস হল না রেশমীর, সে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে থাকল, জলে অগ্নিময় সেতু বিস্তারিত।
তার পর কখন যে টুশকি তার হাত ধরে টেনে বাড়িতে নিয়ে এসেছে তার মনে পড়ে না। শয্যার শুয়ে শুয়ে তার স্বপ্নের কথা মনে পড়ল, মনে হল মদনমোহন স্বপ্নের পথ বুঝি বাস্তবে নির্দেশ করে দিলেন। সে ভাবল ঐ তো তার পথ। তার পর মনে পড়ল পাড়ার মেয়েদের দুর্দৈব। তখন মনে হল তার সম্মুখে দুটো পথ আছে—এক মোতি রায়ের মত লোকের বাগানবাড়িতে আর এক ঐ চিতাগ্নিতে। মনে হল এক-তরফ তার বেছে নিতে হবে। চিতাগ্নি যদি চিরকালের জন্য নিভে গিয়ে থাকে তবে তো ঐ বাগানবাড়ির পথটাই মাত্র উন্মুক্ত। এইরকম এলোমেলো কত কি ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়ল।
জীবনে সুখ সৌভাগ্য একবার মাত্র আসে। জীবনে সুখের পুনরাবৃত্তি ঘটে না। রেশমী সেই অসম্ভবের আশায় উদ্যত।
পরদিন নীরবে আপনমনে সে কাটিয়ে দিল। বিকালবেলায় আয়নার সম্মুখে দাঁড়িয়ে সে চমকে উঠল। চিতাগ্নির শিখা কি তাকে স্পর্শ করেছে, এমন বিবর্ণ শুষ্ক কেন তার মুখ?
মদনমোহন দর্শন করতে গিয়ে মনে মনে সে কেবলই বলতে লাগল, ঠাকুর, ঠাকুর, হয় শক্তি দাও নয় পথ দেখিয়ে দাও, নইলে মাথা কুটে মরব তোমার পায়ের কাছে।
সেই বুড়িটি তাকে হাত ধরে কাছে বল, বলল, কি ভাবছ মা?
রেশমী জল-ভরা চোখে অসহায়ভাবে তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে। কি উত্তর দেবে?
বুড়ি বলল, বুঝেছি মা, তুমি অল্প বয়সে অনেক দুঃখ পেয়েছ। দেবে, দেবে, ঠাকুর শাস্তি দেবে, কেবল খুব জোর করে চেপে ধরা চাই।
তার পরে স্নেহের হাসি ঝরিয়ে বলল, ও আমার দুষ্টর শিরোমণি কিনা। কিন্তু এমন দয়ালও আর নেই।
তার কথার সমর্থনে রেশমীর দুই চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল।
.
৪.০৮ হংসত
জনের মুন্সী কাদির আলী জনকে বৃথা সান্ত্বনা দেয়নি। রেশমীকে খুঁজে বের করবার উদ্দেশ্যে অফিসের দারোয়ান, চাপরাসী, ছোকরাদের সে নিযুক্ত করেছিল। সকলেই রেশমীকে চিনত, রেশমী অফিসে দু-তিন দিন কাটিয়েছিল। কাদির আলী তাদের বলে দিয়েছিল, রেশমী বিবির সন্ধান এনে দিতে পারলে জন সাহেবের কাছে ইনাম মিলবে। বকশিশের লোভে তারা সবাই অবসর সময়ে এদিকে ওদিকে ঘুরে বেড়াত। অবশেষে একদিন গঙ্গারাম বলে এক ছোকরা মদনমোহনতলায় টুশকির বাড়িতে রেশমীর দেখা পেল।
সে একগাল হাসি হেসে প্রকাণ্ড এক সেলাম করে দাঁড়াল।
রেশমী তাকে চিনতে পেরে বলল, গঙ্গারাম যে!
গঙ্গারাম বলল, হাঁ মাঈজি।
গঙ্গারাম খুব ভদ্র ও বিনীত ভাবে কথাবার্তা বলতে শুরু করল রেশমীর সঙ্গে। কাদির আলীর কাছে জন সাহেবের সঙ্গে তার সম্বন্ধটা ইশারায় জেনেছিল সে।
রেশমী বলল, হঠাৎ যে? এদিকে কোথায় এসেছিলে?
কোথায় আর আসব, আপনাকে খুঁজতে আমরা চারিদিকে সব বেরিয়েছি।
আমাকে খুঁজতে!
কেমন যেন বিস্ময়বোধ করে রেশমী। তার পরে তার মনে পড়ে এখন সকলেই তার সন্ধান করছে, এদিকে মোতি রায়, ওদিকে জন। বিস্ময়ের সঙ্গে যুক্ত হয় একটু গৌরবের ভাব।
সে বলে, আমাকে কেন খুঁজছ?
কি যে বলছেন মাঈজী, আপনার জন্যে সাহেব যে বাউরা হয়ে গেল।
কে, জন সাহেব?
আর কে, বলে গঙ্গারাম।
রেশমীর মনে শুকনো পাতার তলে ফুল ফোঁটা শুরু হয়ে যায়। মনের উতলা ভাব দমন করে উদাসীনভাবে শুধায়, সাহেবের হুকুম কি?
আপনার দেখা পেলে পালকি করে নিয়ে যেতে।
রেশমী লঘুভাবে বলে, পালকি এনেছিস নাকি?
আপনার হুকুম হলেই নিয়ে আসি।
রেশমী বলে, এখন তো যেতে পারব না।
গঙ্গারামের মুখ গম্ভীর হয়, ইনাম বুঝি ফসকে যায়। তবু সে আর একবার চেষ্টা করে-তবে কখন পালকি নিয়ে আসব?
তাকে বিদায় করে দেবার আশায় রেশমী বলে, সে কথা পরে জানাব।
গঙ্গারামের বিস্ময়ের অন্ত থাকে না। তারপরে ভাবে, খুব সব সাহেব ও বিবির মধ্যে প্রণয়-কলহ চলছে। এমন হয়ে থাকে বলে সে শুনেছে। তার মনে পড়ে হরিরামের মাকে বিয়ে করবার আগে সে কতবার তার সঙ্গে ঝগড়া করেছে, গাল দিয়ে বিদায় করে দিয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিয়ে না করে তো পারে নি। নিজের অভিজ্ঞতার সাকে তার মনটা হাল্কা হয় বুঝতে পারে ইনামটা ফসকে যাবে না। তবে এক্ষেত্রে কিছু যেন বাড়াবাড়ি। ভাবে, বড় ঘরের বড় কথা।
সে বলে, তবে একখানা চিঠি লিখে দিন।
না, চিঠিও দেব না।
গঙ্গারাম মাটিতে মিশে যায়। তার দীন ভাব লক্ষ্য করে রেশমী বলে, কাল ঠিক এই সময়ে এসো, চিঠি লিখে রেখে দেব।
অগত্যা গঙ্গারাম আর একটা দীর্ঘ সেলাম করে প্রস্থান করে।
এই সময়টা টুশকি বাড়ি থাকে না, বাজারে যায়; ভাগ্যে গঙ্গারাম সেই সময়ে এসেছিল।
বহুপূর্বে দৃষ্ট স্বপ্নের মত জনের কথা রেশমীর মনে পড়ে যায়। কদিনের ব্যবধানে সে স্মৃতি আজ কত যুগ দূরে গিয়ে পড়েছে। মানুষ একই সময়ে হাজার কালের মধ্যে বাস করছে, কোনটা সাপের মত কুণ্ডলীকৃত একটুকু, কোনটা সাপের মত লম্বিত এতখানি! কাল যে নাগ!
গঙ্গারাম চলে যাওয়ার পরে মনের অবস্থা বিচার করবার জন্যে রেশমী গিয়ে নিভৃতে বসল, তখনও টুশকি ফেরেনি। জন তাকে ভোলে নি, তাকে না পেয়ে ‘বাউরা’ হয়ে গিয়েছে, তাকে খুঁজতে চারদিকে লোক পাঠিয়েছে, সে আঙুল তুললে এখনই জন এসে পায়ে লুটিয়ে পড়ে, চিন্তা করে আনন্দমিশ্রিত গৌরব অনুভব করল। তার মনে পড়ল দ্রৌপদীর ছদ্মবেশে বিরাট-রাজগৃহে অবস্থানের ঘটনা। সে যেন দ্রৌপদী, এদিকে ওদিকে কীচকের অভাব নেই, ওদিকে তার রক্ষাকর্তাও আছে। সে নিরুপায় নয়, নিঃসহায় নয়। আঃ কি সান্ত্বনা, কি আনন্দ! এই কদিনে জনের স্মৃতি দূরে গিয়ে পড়ে ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল, হঠাৎ আবার এক ঝাপটায় তা কাছে চলে এল। স্মৃতির আর এক দিগন্তে সে তাকিয়ে দেখতে পেল প্রত্যক্ষের তীর কত দুরায়িত! কে এই টুশকি? কে ঐ মদনমোহন? আর কেই বা মোতি রায়? কোথায় ছিল এরা কদিন আগে? কেরী আর রাম বসুই তো রক্ষা করেছে তাকে নিশ্চিত মৃত্যু থেকে, ভরণপোষণ করে শিক্ষা দিয়েছে, নইলে আজ তার কি গতি হত! আর রোজ এলমার! নিদাঘের গোলাপের মত শুকিয়ে গেল সে। আর জন! বালকের মত অসহায়, যৌবনে দীপ্যমান, শিশুর মত পরনির্ভর, প্রেমে করুণ। তার প্রতিটি কথা প্রতিটি ভঙ্গি স্মৃতির রঙে উজ্জ্বলতর হয়ে চোখে পড়তে লাগল। কথা বলার সময়ে তার ঠোঁটের দুই কোণে দুটি খাঁজ পড়ত, নীলাভ সূর্যের কিরণ কুড়িয়ে নিয়ে ঝলমল করে উঠত তার চোখ, আর রক্তাভ ওষ্ঠাধরে চুম্বনের যে ফুল প্রস্ফুটিত তার সৌগন্ধ ও কণ্টক তাকে উদ্ভ্রান্ত করে তুলল। এমন কি সেই কণ্টকটাও!
