রেশমী লক্ষ্য করত, এক বুড়ি প্রতিদিন নিয়মিত এক কোণে বসে থাকে, আসে সকলের আগে, যায় সকলের পরে, কারও সঙ্গে কোন কথা বলে না, নিঃশব্দে আসে, নিঃশব্দে চলে যায়। একদিন সে তার কাছে গিয়ে বলল, বুড়ি মা, তুমি কি ভাব?
বুড়ি এমন প্রশ্ন যেন জীবনে শোনে নি এমনিভাবে তার মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, তুমি কাদের মেয়ে গা?
কি প্রশ্নের কি উত্তর! অন্য স্থান হলে রেশমী হেসে ফেলত—যদিচ আগের মত কথায় কথায় হাসির মুদ্রাদোষ এখন আর নেই।
রেশমী বলল, আমি কায়েদের মেয়ে।
বুড়ি সংক্ষেপে বলল, তাই বল।
রেশমী আবার ভাবে, কি প্রশ্নের কি উত্তর।
এবারে রেশমী ঘুরিয়ে প্রশ্ন করল, বুড়ি মা, আমার মনে হচ্ছে মদনমোহন তোমাকে দয়া করেছেন।
দয়া না করে উপায় আছে?
কৌতুক অনুভব করে রেশমী বলে-বাপ্ রে, এ যে দেখছি জুলুম!
জুলুম নয়। আমি সব সমর্পণ করলাম আর তিনি দয়া করবেন না এমন কি হতে পারে?
রেশমী বলে, সমর্পণ করা কি মুখের কথা? তোমার ঘর গেরস্থালি আছে না?
সেই কথাই তো বলছিলাম। ঘর গেরস্থালি তিনি আর রাখলেন কই?
কেন?
ওলাউঠোয় এক রাতে আমার ঘরের সবগুলো বাতি নিভে গেল। পড়লাম এসে ঠাকুরের পায়ের তলায়, বললাম, এক সার বাতি নিভিয়ে দিয়েছ, আর এক সার জ্বালিয়ে দাও, নইলে রইলাম এই পড়ে।
তার পর?
তার পর আর কি! ও ছেলে আমার দুষ্ট্রর শিরোমণি, জুলুম না করলে ওকে ধরতে পারা যায়? মা যশোদাকে কত কষ্টই না দিয়েছে ও? শোন নি সে-সব কথা?
এই সব অভিজ্ঞতার টুকরো কথা শুনতে শুনতে দিনে দিনে ধীরে ধীরে ক্রমে মদনমোহন কেমন যেন সত্য হয়ে ওঠে রেশমীর মনে। সে পরিবর্তনের সূত্র অনুসরণ তার সাধ্য নয়। শুধু এইটুকু বুঝল যে পুতুল হয়ে উঠল মানুষ, মানুষ হয়ে উঠল আত্মীয়। যখন সে মদনমোহনের বাড়ি থেকে ফিরে আসে, মনের কোণে জেগে থাকে অন্ধকার আকাশের কোণে শুক্লা তৃতীয়ার চন্দ্রকলার মত তার মধুর হাসিটুকু। হাসি নাকি এমনি মধুর হয়।
এখন তার এমন হয়েছে যে ঘরের কাজ করতে করতেও সেই হাসি, শ্রীঅঙ্গের সেই ভঙ্গি, আড়বাঁশির সেই বঙ্কিম ইঙ্গিত দেখতে পায়, গুন গুন করে গান ধরে, “ঢল ঢল কাঁচা অঙ্গের লাবণী অবনী বহিয়ে যায়।”
পাশের ঘর থেকে টুশকি হাসতে হাসতে বলে, কি সৌরভী, তোমাকে যে মদন মোহন পেয়ে বসল!
রেশমী বলে, না দিদি, তোমাদের মদনমোহনের বাহদুরি আছে।
কেমন?
রেশমীর মুখে প্রায় এসে গিয়েছিল যে, নইলে আমার মত পাত্রীর হাতে পড়া মেয়েকে–
সর্বনাশ! কথাটা ঘুরিয়ে নিয়ে বলে, নইলে আমার মত পাষাণ মেয়ের প্রাণে—
সৌরভী, তুমি পাষাণ মেয়ে, এই কথা আমাকে বোঝাতে চাও!
তাছাড়া আর কি?
তা হবে, পাষাণেও তো ঝরনা আছে।
তার পর বলে, বোন, সবটা মন মদনমোহনকে দিও না।
একটুখানি হাতে রাখব কার ভরসায়?
আর একজন যে আসবে। সে-ও অবশ্য মদনমোহন, কিন্তু ভাই মনটা যেন একটু ফরসা হয়।
রেশমী অনেকদিন পরে কৌতুকের অবকাশ পায়, বলে, হাঁ, ধোপর ইস্তিরি করা কাপড়ের মত, কি বল?
মন্দ কি?
কিন্তু কালো রঙটাও তো মন্দ নয়।
টুশকী বলে, দেবতার ভাল, মানুষে একটুখানি ফরসা চায়।
অত তুমি চাও, কি বল টুশকি দি?
চাই তো বটে, কিন্তু পাই কই?
রেশমী আর বেশি খোঁচায় না, কি জানি আবার কোন চোখের জল উৎস হতে বের হবে! এই কদিনের অভিজ্ঞতায় সে বুঝেছে চোখের জলের সমুদ্রের উপরে পালা সর পড়েছে, আর আমরা নির্ভয়ে বিচরণ করছি তারই উপরে। একটুখানি অসতর্ক আঘাতেই নীচের রুদ্ধ জল ছুটে বেরিয়ে আসে। সংসার ধীরপদ-প্রত্যাশী।
বাস্তবিক টুশকির কথাই সত্যি। প্রথমে অজ্ঞাতসারে, তার পরে জ্ঞাতসারে রেশমী এখন মদনমোহনময়। জনের জন্য যে প্রেম সে তুলে রেখে দিয়েছিল, ঘটনার রূঢ় হস্তক্ষেপে কলসী উজাড় হয়ে পড়ে গেল তা মদনমোহনের পায়ে।
রেশমী, আমার বাঁশি লুকিয়ে রেখেছ কেন, দাও।
বাঃ, আমি তোমার বাঁশি সুকোতে গেলাম কেন?
ফের চালাকি! সে জন্মের অভ্যাস এ জন্মেও ভোল নি দেখছি!
কোন্ জন্মের? শুধায় রেশমী।
মদনমোহন বলে, সে জন্মে ছিলে রাধা, এ জন্মে হয়েছ রেশমী! আমার কিছু অজান আছে নাকি।
আচ্ছা, দেব তোমার বাঁশি। আগে তোমার কুঞ্জের পথটা দেখিয়ে দেবে!
এই কথা! তাহলে দেবে আমার বাঁশি?
নিশ্চয়।
তাহলে দেব পথনির্দেশ; দাও বাঁশি।
ও চালাকি চলছে না, আগে পথ দেখাও।
ঐ দেখ আমার কুঞ্জের পথ।
শোরগোলে একসঙ্গে রেশমী ও টুশকির ঘুম ভেঙে গেল। দুজনে শুনতে পায় অদূরে গঙ্গাতীরে ঢাকের বাজনার সঙ্গে অনেক নরনারীর কণ্ঠ। স্বপ্নের বিবরণ ভুলে গিয়ে রেশমী শুধায়, এত রাতে ও কি হচ্ছে দিদি?
টুশকি জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখে বলে, কোন পুণ্যবতী স্বর্গে চলল।
মরেছে বুঝি?
না বোন, পতির চিতায় উঠতে চলল।
বিস্ময়ে রেশমী বলে ওঠে, সহমরণ!
তাই তো মনে হচ্ছে।
চল দেখে আসি।
দুজনে বেরিয়ে গঙ্গাতীরে যায়।
গঙ্গাতীরে জলের ধারে সজ্জিত চিতায় নববস্ত্রপরিহিত যুবকের দেহ শায়িত। রোরুদ্যমান আত্মীয়স্বজনের বহমধ্যে রক্টাম্বরা মাল্যভূষিতা কিশোরী বধু দয়মান। ইতস্তত দর্শকের ভিড়। রেশমী আর টুশকি গিয়ে একান্তে দাঁড়াল।
রেশমীর সেদিনের কথা মনে পড়ল, যেদিন মৃত্যুভয়ে চিতা থেকে পালিযেছিল। কিন্তু আজ ঐ কিশোরীর মুখে ভয়ের কোন চিহ্ন দেখতে পেল না সে। রেশমী ভাব যুবক স্বামীকে ছেড়ে তার বেঁচে থাকা নিরর্থক মনে করেই সে অকুতোভয়; হয়তো যুবক স্বামী হলে সে-ও এমনি অকুতোভয় হত; কিন্তু ক্ষণেকমাত্র পরিচিত বৃদ্ধের জন্য কেন যাবে সে মরতে। মরবারও একটা সার্থকতা চাই তো!
