রাত্রিবেলা ঘুম ভেঙে হঠাৎ জেগে ওঠে রেশমী, ওগো তোমরা আমাকে বাঁচাও ধনি তার নিদ্রাকে বিদীর্ণ করে। সেদিনকার শ্ৰত এই আর্তরব গানের ধুয়ার মত ফিরে ফিরে যেন বাজতে থাকে; দিনের শান্তি, রাত্রির নিদ্রা দুই-ই তার গিয়েছে।
আজকাল টুশকি মাঝে মাঝে তাকে জিজ্ঞাসা করে, সৌরভী, মুখ শুকনো কেন? খুব ভয় পেয়েছ বুঝি?
রেশমী বলে, না, ভয় পাব কেন!
আমিও তো তাই বলি, বাড়ি থেকে না বের হলে ভয় কিসের! তাছাড়া তুমি যে এখানে আছ তা জানছেই বা কে!
রেশমী ভাবে, ভয় কি শুধু বাইরে রাস্তায়? রাস্তার শব্দ যে তার কানে এসে ঢুকছে তাকে তো থামানো যায় না?
তার পরে তার আরও মনে পড়ে, সেই মেয়েটির আর্তকণ্ঠ মিলিয়ে গেলে অনুচ্চ স্বরে পাড়ার গুঞ্জনও তো কানে এসেছিল, সে সবও তো ঠেকানো যায় নি। সে এখনও কানে শুনতে পায় পাড়ার অভিযোগ। কোন্ ঘর-জ্বালানী পাড়ায় এসে বিপদ ঘটাল। ‘একবার দেখতে পেলে তাকে চুলের খুঁটি ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে মোতি রায়ের বাগানবাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসি। আরে তুমিও যেমন, দেখ গিয়ে এতক্ষণে সে কার বাগানবাড়িতে লীলাখেলা করছে। ছুটে পালিয়ে সতীপনা দেখালেন, এদিকে পাড়ার সর্বনাশ!
কথাগুলোর স্মৃতি ঘুরে ঘুরে বারে বারে হল বিধিয়ে যায় রেশমীর মনে। রাধারানীও এইভাবে কথা বলে। সে বোঝে চারিদিক থেকে অভিযোগের আঙুল তার দিকেই উথিত। এক-একবার তার বিস্ময় বোধ হয়—সব দোষই কি তার? ঐ মোতি রায় লোকটার দোষ তো কেউ দেয় না। সে ভাবে, বিচিত্র বিচার সংসারের।
সে কেমন করে জানবে যে, দুর্বলের ঘাড়ে দায়িত্ব চাপিয়ে নিজেকে দায়মুক্ত অনুভব করাই সমাজের নিয়ম। সমাজ দুর্বল, ব্যক্তি প্রবল।
এক ফালি চাঁদের আলো এসে পড়েছে নিদ্রিত টুশকির মুখে। কি সুন্দর ঐ অনুদ্বিগ্ন মুখখানা, তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে রেশমী। তার পরে কখন আবার মনে মনে মদনমোহনকে প্রণাম করে শুয়ে পড়ে—এবারে ঘুম আসতে দেরি হয় না।
রেশমীর সন্ধ্যাবেলার সান্ত্বনা মদনমোহনের আরতিদর্শন, ভোরবেলার সান্ত্বনা যেমন গঙ্গায়ান।
প্রথম প্রথম সে সময় কাটানোর উদ্দেশ্যে টুশকির সঙ্গে যেত আরতিদর্শনে। ধূপ দীপ শঙ্খ ঘণ্টা, জনতার ভক্তিগদগদ ভাব কেমন যেন অবাস্তব মনে হত, তামাশা দেখবার চোখে সব দেখত সে। বাল্যকালে গায়ে থাকতে নিয়মিত ঠাকুর দর্শন করত বটে কিন্তু বয়সের মোড় ঘোরবার সময় এল অবস্থান্তর, পড়ল গিয়ে খ্রীষ্টানদের সঙ্গে, চাপা পড়ে গেল সেদিনকার স্মৃতি। তার পরের কটা বছর কাটল তার দেবতাহীন জীবন। পাত্রীদের কথা শুনতে শুনতে ‘পুতুল-পূজো’ সম্বন্ধে একটা—কি বলব-অভক্তি ঠিক নয়, উদাসীনতার ভাব এসেছিল তার মনে। তার মনটা ছিল ফাঁকা অবস্থায়, দেবদেবী অপসারিত হয়েছে, খ্রীষ্টও প্রতিষ্ঠিত হয় নি, এমন সময়ে পদার্পণ করল জন। জন তার জীবনে প্রথম পুরুষ। এমন সময় আবার অবস্থান্তর ঘটল, দেবদেবী এসে পড়ল কাছে, কোথায় গিয়ে পড়ল জন।
পিছিয়ে কেন মা, এগিয়ে যাও না।
রেশমী পিছনে ফিরে দেখে যে বক্তা বর্ষীয়সী বিধবা মহিলা। রেশমীর ধারণা হল যে মহিলাটি এগিয়ে যেতে চায়, বলল, আপনি এগিয়ে যান। বলে সে নিজে পিছোবার উপক্রম করল।
মহিলাটি তাকে বাধা দিয়ে বলল, এগিয়ে যেতেই তো চাই, পারি কই?
আমি সরহি আপনি এগিয়ে যান।
মহিলাটি করুণ হাসি হেসে বলল, সম্মুখে এগোলেই কি এগোনো যায়?
বিস্মিত রেশমী শুধায়, তবে?
ভক্তি চাই। আমার মনে ভক্তি কই।
তবে আসেন কেন?
যদি মদনমোহন দয়া করেন।
এর আর উত্তর কি? রেশমী চুপ করে থাকে।
পরদিন সেই মহিলাকে দেখে রেশমী সরাসরি প্রশ্ন করে, এখানে এলেই কি মদনমোহন দয়া করেন?
তা কেমন করে হবে মা! বেশ্যামাগীরাও তো আসে!
তবে কি মদনমোহন বেছে বেছে দয়া করেন?
আত্মসমর্পণ করলেই তিনি দয়া করেন।
রেশমীর কথায় মহিলা বোধ করি কিঞ্চিৎ বিস্ময়বোধ করে; শুধায়, তুমি কে মা?
রেশমী সংক্ষেপে বলে, আমি দুঃখিনী।
তবে তোমাকে দয়া করবেন মদনমোহন।
কেমন করে জানলেন?
দুঃখিনীর প্রতিই যে তাঁর টান, আমার মদনমোহন যে দুঃখীর দেবতা।
এবারে রেশমী বলে, আমার মনে হয় আপনিও দুঃখিনী।
কোন উত্তর দেয় না মহিলা। রেশমী দেখে তার চোখ জলে ভরে উঠেছে।
রেশমী দেখে যে জনতার পিছনের দিকটায় বুড়ি বিধবাদের ভিড়। যতক্ষণ আবতি চলে তারা একমনে জপ করতে থাকে। এদের দেখে আর রেশমী ভাবে ভাঙা নৌকার বহর ভিড়েছে সংসারের শেষ বন্দরে। তার মনে হয়, যে কারিগর এদের গড়েছিল সে এবারে এদের ভেঙে চেলা কাঠে পরিণত করবে। আঘাত পড়তে শুরু করেছে, ওরা দয়ার ভিখারী। তার মনে হয় সে-ও বুঝি অল্প বয়সেই শেষ বন্দরে এসে ভিড়েছে।
ক্রমে সে মদনমোহনের প্রতি টান অনুভব করতে লাগল, কেমন যেন একটা নেশার মত। আগে টুশকি তাকে তাগিদ করত, চল সৌরভী, আরতির সময় হল! এখন সে তাগদি দেয়, দিদি, যাবে না? আরতি যে শুরু হয়ে গেল?
টুশকি বলে, দাঁড়াও হাতের কাজটা সেরে নিই।
রেশমী বলে, ও এসে হবে, চল এখন। মদনমোহনের মূর্তিতে আগে কোন মাধুর্য দেখতে পেত না রেশমী—এখন সে মূর্তি মধুর মনে হয়। পাত্রীদের কাছে পুতুল-পুজোর সম্বন্ধে অনেক নিন্দা শ্লেষ সে শুনেছে। তার ধারণা হয়েছিল পুতুল পুজোর অসারতা সে বুঝেছে। বুঝুক আর নাই বুঝুক খ্রীষ্টান হওয়ার জন্য উদ্যত হয়েছিল। আজ সে কথা মনে করে সে কেমন বিস্ময়বোধ করে। সেদিন স্বপ্নেও ভাবে নি কোন পুতুলে এত জীবনরসের সন্ধান সে পাবে। তার মনে হয় সেদিনের রেশমী আর এক মানুষ। যতক্ষণ আরতি হয় একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে সে মদনমোহনের দিকে; জপতপ জানে না, মনে মনে ঐ নামটি উচ্চারণ করতে থাকে।
