একদিন স্নান সেরে উঠে টুশকি বলল, সাজিতে আমার ফুল কম ঠেকছে যেন।
রেশমী অপরাধীর মত বলল, দিদি, আমি গঙ্গায় দিয়েছি।
মনে মনে খুশি হয়ে টুশকি বলল, বেশ করেছ, কাল থেকে বেশি করে আনব।
রেশমীর লজ্জার ভাব কাটে নি, বলে, হাঃ, আমার আবার দেওয়া। মরই জানি নে!
টুশকি বলল, গঙ্গাপূজোর বুঝি মন্তর লাগে! শোন নি যে কথায় বলে গঙ্গা জলে গঙ্গাপুজো! তার পর বলল, তুমি যা মনে করে দাও না কেন, মা গঙ্গা ঠিক বুঝে নেবেন।
পরদিন থেকে ফুল বেলপাতা ভাগ করে নিয়ে দুজনে গঙ্গাজলে দিতে লাগল।
তখন থেকে গঙ্গায় ডুব দেওয়ার সময়ে রেশমীর দুই চোখে জল গড়াত, জলে জল মিশে যেত, কেউ দেখতে পেত না। এমন কত অসহায়ের চোখের জলেই তো গঙ্গার স্ফীতি, নইলে কতটুকু সম্বল নিয়ে সে রওনা হয়েছিল গোমুখী থেকে!
সেদিন স্নান করে ফেরবার সময় রেশমী হঠাৎ বলে উঠল, গঙ্গায়ান করলে শরীরটা বেশ পবিত্র লাগে দিদি।
লাগে বইকি বোন, গঙ্গা যে পতিতপাবনী কলুষনাশিনী।
সব পাপ দূর হয়ে যায়, না? শুধাল সরলা রেশমী।
হয় বইকি বোন।
আমার পাপ কি দূর করতে পারেন?
বিস্মিতা টুশকি বলে, শোন একবার কথা, গঙ্গার অসাধ্য কি? তা ছাড়া তুমি আর জীবনে এমন কি পাপ করেছ? সগর রাজার সন্তানরা কপিলের শাপে ভস্ম হয়ে গিয়েছিল, উদ্ধার করলেন তাদের জাহ্নবী।
রেশমীর মনে পড়ে চিতা-পলায়নের স্মৃতি, সে ভাবে তারও তো ভস্ম হয়ে যাওয়ার
তার পর সারাদিন বাড়িতে থাকে সে আবদ্ধ। টুশকি এখানে-ওখানে যায়, কাজকর্মে তার বের না হয়ে উপায় নেই।
রেশমী বলে, দিদি, সাবধানে চলাফেরা কর।
কেন রে?
মোতি রায়ের লোক।
না বোন, আমার ভয় নেই। বলে সে বেরিয়ে যায়।
একাকী বসে থাকে রেশমী।
মাঝে মাঝে আকাশ-ফাটানো সেই অসহায় কণ্ঠ তার স্মৃতিকে বিদ্ধ করে জাগ্রত হয়ে ওঠে—”ওগো তোমরা তাকে ব’ল, আমাকে জোর করে নিয়ে যাচ্ছে, সে যেন গিয়ে আমাকে কেড়ে নিয়ে আসে।”
এমন সঙ্কটের মধ্যেও সতীর মুখে পতির নাম উচ্চারিত হয় না।
রেশমী ভাবে নামটা জানলে তাকে খোঁজ করে জানিয়ে আসত পত্নীর অসহায় আবেদন। তার মনে হয় এ দায়িত্ব যেন বিশেষ করে তার উপরেই বর্তেছে, তারই জন্যে ঘরে ঘরে এমন বিপদ। লজ্জায় ভয়ে সে এতটুকু হয়ে যায়। যদি একেবারে শূন্যে মিলিয়ে যেতে পারত তবে ঐ আর্ত তীব্র চীৎকারের শূল-বেদনা থেকে বুঝি উদ্ধার পেত—”ওগো, তোমরা সবাই আমাকে রক্ষা কর’।
এমন সময়ে রাধারানী এসে উপস্থিত হয়।
রেশমী শুধায়, হাঁরে রাধারানী, আজকে পাড়ার খবর কি?
রাধারানী এটো বাসন মাজতে মাজতে মুখ তুলে বলে-পাড়ার খবর তো এখন একটাই।
বোঝে, তবু না বোঝবার ভান করে রেশমী বলে, কি?
আর কি দিদিমণি, পাড়ার ঝি-বউ-এর ইজ্জৎ আর রইল না।
কেন রে?
কেন আর কি! কচি বয়সের মেয়ে পেলেই টেনে নিয়ে যাচ্ছে মোতি রায়ের বাগানবাড়িতে।
হঠাৎ?
হঠাৎ নয়, এমন চিরকাল চলেছে, তবে এখন যেন বেড়েছে।
তাই তো জিজ্ঞাসা করছি, হঠাৎ বাড়তে গেল কেন?
কি করে বলব দিদিমণি, শুনছি রেশমী বলে কোন্ একটা পোড়ারমুখীর সন্ধানের জন্যেই নাকি এখন গাঁ উজাড়!
তার পরে বাসনগুলো আয়ত্তে এনে বলে, ঐ যে বলে ঠগ বাছতে গাঁ উজোড়, তা-ই হতে চলেছে।
রেশমী একবার দেখে নেয় যে টুশকি কাছে নেই, তখন আবার বলে রেশমী কে?
সজোরে মাথা-ঝকানি দিয়ে বলে, কেমন করে জানব কে? মেয়েটাকে নাকি মোতি রায়ের পাইকেরা ধরে আনছিল, মেয়েটা পালিয়েছে।
তাই বলে যাকে-তাকে ধরে নিয়ে যাবে?
যাবে না! মুখের গ্রাস পালানোয় বাবুর যে ইজ্জৎ যেতে বসেছে, কি করবে বল!
বিস্মিত রেশমী বলে, তোর কথা শুনে মনে হচ্ছে মোতি রায়ের যেন দোষ নেই?
মোতি রায়ের দোষ কি? বড়লোকে ওরকম করেই থাকে।
তবে কি দোষ যাদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে তাদের?
দোষ ঐ পোড়ারমুখী রেশমীরবলে সজোরে সে ঝামা দিয়ে কড়াইটা ঘষতে থাকে।
রেশমীর মুখ শুকিয়ে যায়, তবু বলে, তার কি দোষ?
মুখ না তুলে আপন কাজ করতে করতে রাধারানী বলে যায়, দোষ নয়? পাদ্রীদের হাত থেকে ছিনিয়ে এনেছিল, তার ধর্ম রক্ষা করেছিল যে মোতি রায়।
আর বাগানবাড়িতে নিয়ে গেলে বুঝি ধর্ম থাকত!
কপালে হাত ছোঁয়াবার ভঙ্গী করে বলে, কপাল আমার। ও সব মেয়ের বুঝি আবার ধর্ম আছে। কত হাত ঘুরেছে জিজ্ঞেস করে দেখো।
তার সম্বন্ধে লোকের ধারণার আভাস পায় রেশমী।
বাসনগুলো কুয়োর জলে ধুয়ে তুলতে তুলতে রাধারানী বলে—পাড়ার লোকে কি ঠিক করেছে জান? রেশমীকে পেলে চুলের মুঠো ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে পৌঁছে দেবে বাগানবাড়িতে।
কেন?
কেন কি? তা নইলে ঝি-বউ বাঁচাবার আর উপায় কি?
হাতের কাজ শেষ করে যাওয়ার আগে রেশমীর মুখের দিকে তাকিয়ে রাধারানী বলে-একটু সাবধানে থেকে দিদিমণি।
রেশমী কি বলবে ভেবে পায় না।
তখন রাধারানী ব্যাখ্যা করে বলে, আয়নায় একবার মুখখানা দেখ, এত রূপ তো। হঠাৎ চোখে পড়ে না, একবার মোতি রায়ের লোকের চোখে পড়লে আর রক্ষে নেই!
রেশমীর শুকনো মুখ আরও শুকিয়ে যায়, তার অন্তরাত্মা কাঁপতে থাকে। ভাবে, কাছেই আছেন মা গঙ্গা পতিতপাবনী, কলুষনাশিনী!
রাধারানী চলে যায়। রেশমী দরজা বন্ধ করে ঘরে গিয়ে ঢোকে।
যেদিন টুশকি উপস্থিত থাকে, এত কথা হয় না, ফিস ফিস করে দু-চার কথা জিজ্ঞাসা করে—একই রকম উত্তর পায়।
