ওদিকে বাগানবাড়িতে নৃতন করে রঙ আর সাজসজ্জা শুরু হয়ে গেল। মোতি রায়ের ইচ্ছা রেশমীকে পেলে জাঁকজমকের সঙ্গে নাচগানের ব্যবস্থা করবে, যাতে সবাই জানতে পারে যে, মোতি রায়ের সম্মান পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু রেশমী কোথায়?
মোতি রায়ের পাইকেরা যে মেয়েকেই ধরে আনে, চণ্ডী বলে, না, এ আমাদের মেয়ে নয়।
অবশেষে পাইকেরা গেল চণ্ডীর উপরে চটে। তারা বলল, বক্সী মশাই, অত বাছবিচারে কাজ কি? যে-কোন একটা মেয়েকে তোমাদের মেয়ে বলে স্বীকার করে নাও না। তারা বলল, তোমাদের মেয়েরও জাত বাঁচুক, আমরাও ইনাম পাই।
চণ্ডী জিভ কেটে বলল, কি সর্বনাশ! আমার মুখে মিথ্যা বের হবে না।
সংসারে অষ্টমাশ্চর্যের একটি হচ্ছে এই যে, সময়বিশেষে অত্যন্ত মিথ্যাবাদী লোকের মুখেও একটি মিথ্যা বের হতে চায় না।
পাইকেরা গিয়ে মোতি রায়কে বলল, হুজুর, বজী মশাই বড় সোজা লোক নয়।
কেন?
নিজেদের মেয়েদের জাত বাঁচাবার আশায় মেয়ে সনাক্ত করতে চাইছে না, নইলে আমাদের চেষ্টায় তুটি নেই।
মোতি রায় গর্জন করে উঠল, কি, যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা! আমার বাগানবাড়িতে গেলে জাত যাবে! লাগাও বক্সীকে পঁচিশ ঘা জুতো।
পাইকেরা সেই মহদুদ্দেশ্যে এসে দেখল বঙ্গী কখন সরে পড়েছে। তারা ভাবল, ভালই হল, এবারে যে-কোন একটা মেয়েকে সবাই হলফ করে রেশমী বলে চালিয়ে দেবে।
এদিকে টুশকি আর রেশমীর দিনের বেলাটা কোন রকমে বাড়ির মধ্যে লুকিয়ে থেকে চলে যায়, কিন্তু রাতটা আর যেতে চায় না। নিত্য নূতন নূতন উপদ্রবের কথা তাদের কানে আসে, মুখে মুখে পল্লবিত হয়ে মেয়ে-ধরার সংবাদ তাদের কাছে পৌঁছয়। রেশমী কাঁদ-কাঁদ ভাবে বলে, দিদি, আমার জন্যেই লোকের এই সর্বনাশ হচ্ছে।
টুশকি তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, না বোন, তা নয়-এমন সর্বনাশ চিরকাল চলছে, দেখতে দেখতে বুড়ো হয়ে গেলাম।
সেদিন অনেক রাত্রে নারীকণ্ঠের তরুণ আর্তস্বরে দুজনেরই ঘুম ভেঙে গেল।
রেশমী শুধাল, দিদি, ও কি?
টুশকি নিদ্রাজড়িত স্বরে বলল, আবার কি! কোন অভাগিনীকে নিয়ে চলেছে মোতি রায়ের পাইকেরা।
অবুঝ রেশমী বলে, জোর করে?
নইলে আর এমন করে কাঁদে?
কেউ সাহায্য করবে না?
কার ঘাড়ে দুটো মাথা বোন!
অসহায় কষ্ঠ পাড়ার নিদ্রা বিদীর্ণ করে সর্বশক্তিমানের দরবারে আবেদন পৌঁছে দেয়। সর্বশক্তিমানের আসন কি উপলক্ষে টলে কেউ জানে না, তিনি যে দুয়ে!
ক্ষীয়মাণ আর্তকণ্ঠকে মনে মনে অনুসরণ করে রেশমী ভাবতে থাকে, ঐ মেয়েটা তার বদলে বলিপ্রদত্ত হতে যাচ্ছে। যাওয়ার কথা তো তারই। সে ভাবে, এর কি কোন প্রতিকার নেই? কিন্তু কি প্রতিকার ভেবে পায় না। সে একবার টুশকিকে ঠেলা দেয় টুশকি ঘুমিয়ে পড়েছে। রেশমীর ঘুম আসে না সে বিনিদ্র জেগে বসে থাকে।
.
৪.০৭ পথনির্দেশ
নৌকার গতি এমন নিঃশব্দ আর মসৃণ যে আরোহী জানতেও পায় না নৌকাখানা ছাড়ল কিনা কিংবা কতদূর এল-হঠাৎ এক সময়ে সচেতন হয়ে চমকে উঠে দেখতে পায় যে তীরভূমি কতদূর গিয়ে পড়েছে—আবার সেই সঙ্গে দেখে যে অপর তীর কখন অভাবিতভাবে কত কাছে এসে পড়েছে। তেমনি অবস্থা হল রেশমীর। তার ধারণা ছিল তার অবস্থা স্থির নিশ্চল আছে কিন্তু ভিতরে ভিতরে যে পরিবর্তন ঘটছিল তা কি জানত! কিন্তু একদিন যখন এদিক-ওদিক দৃষ্টি পড়ল, বুঝল একটা দিক দূরে গিয়ে পড়েছে, অন্য একটা এসে গিয়েছে কাছে। তার চোখে পড়ল ছায়াপ্রায় পুরাতন তীর, সেখানকার লোকজন কত ছোট হয়ে গিয়েছে—জন, লিজা, রোজ এলমার, কেরী দম্পতি, সব বাষ্প পুত্তলিকা—আর অন্য তীরের টুশকি, মদনমোহন ঠাকুর সব কেমন প্রোজ্জ্বল, স্পষ্ট। সে চমকে উঠে ভাবল—এ কেমন হল! কিন্তু তখন আর নৌকার হাল তার মুঠোর মধ্যে। নেই–অস্পষ্ট অস্পষ্টতর, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্রতর হতেই লাগল, স্পষ্ট স্পষ্টতর, বৃহৎ বৃহত্তর হতেই লাগল, অসহায়ভাবে তীরান্তরের লীলা চলতেই লাগল তার জীবনে। বিমূঢ়ভাবে ঘটনাচক্রের কাছে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া তার উপায় রইল না।
বাইরের জগতের সঙ্গে তার দুটি স্থানে মাত্র যোগ ছিল। সেই অন্ধকার থাকতে ভোরবেলা গঙ্গাস্নান, আর সন্ধ্যাবেলায় মদনমোহনের আরতি-দর্শন। এই দুটি ঘটনা তার মনের উপরে পুণ্যস্পর্শের সাদা রঙ বুলিয়ে দিতে লাগল; এতদিন যে-সব ছবি সেখানে ধীরে ধীরে অঙ্কিত হয়ে উঠেছিল, সেগুলো এখন ঢেকে যাওয়ার মুখে। কথন ঢাকা পড়ে গিয়েছে মদনাবাটির জীবন; ঢাকা পড়ে যাচ্ছে কলকাতার সাহেবপাড়ার জীবন; লিজার। ঈর্ষামিশ্রিত চক্ষুদ্বয়ের একটা ওই বুঝি এখনও দেখা যায়; আর এখনও সবটা ঢাকা পড়ে নি জনের প্রেমাতুর, আর্ত অসহায় চোখ দুটো—তবে তার উপরে পাতলা একপোঁচ রঙ পড়েছে-শরতের স্বচ্ছ মেঘে চাপা পড়া চাঁদের মত তা এখনও মনোহর আর দূরত্বে। চাঁদ তো দূরের বস্তু। অবোধ শিশুর মত তাকে এক সময়ে কাছে মনে করেছিল, সে দুরের চাঁদ দুরেই আছে—রঙের পোচ ক্ৰমে ঘনতর হচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মিলিয়ে। যাবে মনে করে তার বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে। কিন্তু নিরুপায়—ঘটনাধীন মানব।
প্রথম প্রথম গঙ্গাস্নানে কিছুমাত্র বৈশিষ্ট্য অনুভব করে নি সে, তাড়াতাড়ি গোটাকয়েক ডুব দিয়ে বাড়ি ফিরত। কিন্তু কখন যে সঙ্গোপনে সুরধুনীর প্রভাব এসে পড়ল তার জীবনে সে জানতেও পারে নি। গঙ্গাস্নানে ক্রমে তার সময় বেশি লাগতে শুরু করল। আগে সে স্নান সেরে উঠে কাপড় ছেড়ে অপেক্ষা করত টুশকির জন্যে, দেখত যে টুশকি গলাজলে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে গঙ্গা-স্তব করছে। দেখত সেই ভোরবেলাতেই আরও কতজন স্তব করছে, পূজা-আহ্নিক সারছে, ফুল বেলপাতা এক গভূষ দুধ গঙ্গায় সমর্পণ করছে। তার পরে সে নিজেও গলাজলে দাঁড়িয়ে থাকত যতক্ষণ না টুশকির স্তব সমাপ্ত হয়। প্রতিদিন শুনে শুনে গলার স্তব মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল, গঙ্গাজলে দাঁড়িয়ে মনে মনে আবৃত্তি করত স্তব, জোরে উচ্চারণ করতে কেমন লজ্জা অনুভব করত, মনে হত জন বা কেরী শুনতে পাবে।
